পঞ্চম ধাপে দেশের ৭১৭ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ভোট শুরু ।এ উপলক্ষে নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে উৎসবের পাশাপাশি উৎকণ্ঠা ও আতংক বিরাজ করছে।
আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণ চলছে।
প্রথম চার ধাপের মতো এবারও ভোট কেন্দ্র দখল এবং নির্বাচনী সহিংসতার শংকা করছেন অনেক প্রার্থী ও সমর্থকরা। ভোট গ্রহণ নিয়ে বিরোধী মতের প্রার্থী ও তাদের এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনা ঘটেছে। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতরা ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।
পছন্দের প্রার্থীকে জয়ী করতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়ররা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চার ধাপের নির্বাচনে সহিংস ও কেন্দ্র দখলের ঘটনায় নির্বাচন কমিশন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় এ ধাপের নির্বাচনেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আতংকে ভুগছেন প্রার্থীরা।
তবে অন্যান্যবারের মতো এবারও কমিশন আশার বাণী শুনিয়েছে। কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, ভোটের সময় আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে আছে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির লক্ষাধিক সদস্য। তাদের পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।
এছাড়া নির্বাচনী প্রস্তুতি শেষ করে এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ভোট গ্রহণ উপলক্ষে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, সুষ্ঠু ভোটের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। আমরা চাই ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরবেন। এক্ষেত্রে কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে আইনশৃংখলা বাহিনীকে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছি।
প্রার্থীদের শংকার বিষয়ে তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শংকার কিছু নেই। নির্বাচনে অনিয়ম করলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃংখলা বাহিনীকেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চম ধাপে ৭১৭ ইউপিতে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ৩২ হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ৩২৫৪ জন, সাধারণ সদস্য পদে ২৭ হাজারের বেশি ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ৭ হাজারের বেশি প্রার্থী রয়েছে। ইতিমধ্যে ৪১ জন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ওই সব পদ বাদে বাকিগুলোতে নির্বাচন হবে। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ ১৫টি দলের প্রার্থী রয়েছে। ২টিতে আওয়ামী লীগ ও ১০০টিতে বিএনপির কোনো প্রার্থী নেই। শুক্রবার ভোট কেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনী মালামাল পৌঁছে গেছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, ইউপির ভোটে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীরা। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে লড়ছেন। গত চার ধাপে সহিংস ঘটনার বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ ও একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশংকা করা হচ্ছে।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, প্রথম চার ধাপের মতোই পঞ্চম ধাপের নির্বাচন উপলক্ষে একই ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে কমপক্ষে ২০ জন পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবে এবার আইনশৃংখলা বাহিনীকে সতর্কতামূলক অবস্থায় থাকার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
প্রথম চার ধাপের সহিংসতা ও অনিয়মের ঘটনায় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না থাকায় এ ধাপের ভোট নিয়ে প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে শংকা বিরাজ করছে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা সরেজমিন ঘুরে দেখেছেন, বিভিন্ন এলাকায় প্রতিপক্ষ প্রার্থী ও সমর্থককে হুমকি-ধমকি দিয়ে দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ও সমর্থক এবং ভোটারদের মধ্যে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে এ শংকা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের এলাকায় সহিংসতার আশংকা করা হচ্ছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, বিপুলসংখ্যক চেয়ারম্যান ও সদস্য (মেম্বার) প্রার্থী তাদের শংকার কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) চিঠি দিয়েছেন। এতে ভোটের দিন তারা বাড়তি নিরাপত্তা চেয়েছেন।
এছাড়া কোথাও কোথাও খোদ সরকারি দলের প্রার্থীরা হামলার শিকার হয়েছেন। বিষয়টি জানিয়ে সুষ্ঠু ভোটের ব্যবস্থা করতে ইসিতে চিঠি দিয়েছেন নেত্রকোনা পূর্বধলার ১২নং বৈরাঢী ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুহাম্মদ আনিসুজ্জামান তালুকদার। একইভাবে আরও অনেকেই ইসিতে চিঠি দিয়েছেন। কমিশন জানিয়েছে, সুষ্ঠু ভোট গ্রহণে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আইনশৃংখলা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মাঠে রয়েছেন।
মাঠে লক্ষাধিক আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য : ইসি সূত্রে জানা গেছে, চতুর্থ ধাপের ইউপি নির্বাচনে আইনশৃংখলা বাহিনীর লক্ষাধিক সদস্য মাঠে রয়েছেন। প্রতিটি ইউপিতে পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বয়ে একটি মোবাইল ফোর্স এবং তিনটি ইউপির জন্য একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রতিটি উপজেলায় র্যাবের দুটি মোবাইল ও একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং বিজিবির দুটি মোবাইল টিম ও একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকছে। এসব সদস্যকে দৃশ্যমানভাবে চলাচল করতে বলা হয়েছে। যাতে নির্বাচনী বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে পারে এমন ব্যক্তিদের জন্য আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারেন। আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনী এলাকায় ভোট গ্রহণের পরের দিন রোববার পর্যন্ত অবস্থান করবেন। এছাড়া আচরণবিধি তদারকিতে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন।
যান চলাচল ও মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ : এদিকে পঞ্চম ধাপের ভোট গ্রহণ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে যানবাহন চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে কমিশনের অনুমোদিত আইনশৃংখলা বাহিনী, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষকসহ অন্যান্য গাড়ি চলাচল করতে পারবে। হাইওয়ে এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকছে না।
পঞ্চম ধাপের ভোটের তথ্য : পঞ্চম ধাপে ৭১৭ ইউপিতে ভোট হবে। এতে চেয়ারম্যান প্রার্থী ৩ হাজার ২৫৪ জন। সাধারণ সদস্য পদে ২৭ হাজারের বেশি ও সংরক্ষিত সদস্য পদে ৭ হাজারের বেশি প্রার্থী। চেয়ারম্যান পদে ১৫টি রাজনৈতিক দলের ১ হাজার ৭২৭ জন ও স্বতন্ত্র ১ হাজার ৫২২ জন। দুটিতে আ’লীগের কোনো প্রার্থী নেই। বিএনপির প্রার্থী নেই ১০০ ইউপিতে। দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছে ৭১৫টিতে ও বিএনপির ৬২৯টিতে।
এছাড়া জাতীয় পার্টি ১৭৭টি, জাসদ ২১টি, বিকল্পধারা ২টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ১৩টি, ইসলামী আন্দোলন ১২২টি, জেপি ২টি, ইসলামী ফ্রন্ট ১১টি, এলডিপি ৬টি, সিপিবি ৫টি, জেএসডি ১টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ৬টি, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ৭টি এবং অপর একটি দলের ১ ইউপিতে প্রার্থী রয়েছে।
চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ৪২ জন ইতিমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তফসিল ঘোষণার পর নানা কারণে এ পর্যন্ত ১৪টি ইউপির ভোট স্থগিত করা হয়েছে। এতে ভোটার ১ কোটি ১০ লাখের বেশি। ভোট কেন্দ্র সাত হাজারের বেশি। নির্বাচনে এক লাখের বেশি ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন।
এমবি





