২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক সিদ্দীকী নাজমুল আলম স্বাক্ষরিত আট সদস্য বিশিষ্ট নেত্রকোনা জেলা ছাত্রলীগের কমিটির অনুমোদন হয়।
এতে অমিকে সভাপতি, জনিকে সম্পাদকসহ মঈনুল আমীন তালুকদার রিগান ও সুমন খানকে সহ-সভাপতি, নিপুন সরকার বাপ্পা ও আব্দুল ওয়াদুদ মামুনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তোফায়েল আহমেদ ও রবিউল আওয়াল শাওন সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।
এরপর ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে ২০৭ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ এবং সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন।
পাঁচ বছর পেরিয়ে ছয় বছরে পা দিয়েছে নেত্রকোনা জেলা ছাত্রলীগ। এর মধ্যে বিয়ে করে পরিবার নিয়ে ব্যস্ত নেত্রকোনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক সহ কমপক্ষে ১৬ জন নেতা। তাদের মধ্যে সহ-সভাপতি আপেল মাহমুদ, মোঃ রুবেল মিয়া, মোঃ শাহীন মিয়া, দেওয়ান আব্দুল সাত্তার, সাজ্জাদ আহমেদ সিদ্দিকী, ইমরান খান, মোঃ মোবারক হোসেন, প্রলয় সাহা, জুনায়েদ মৃধা, মেহেদী হাসান ফারাস রাজন, সত্যজিত দাস সৈকত; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিপুন সরকার বাপ্পা, মোঃ রেজাউর রহমান ফয়সাল এবং উপ-গণযোগাযোগ উন্নয়ন সম্পাদক মোমেন ঈবনে সাঈদ স্টেলিন। এদের মধ্যে উপ-গণযোগাযোগ উন্নয়ন সম্পাদক মোমেন ঈবনে সাঈদ স্টেলিন কমিটি ঘোষণার পূর্বেই বিবাহিত ছিলেন।
নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগের মোট ১৩ টি ইউনিটের ১০টি উপজেলার মধ্যে শুধুমাত্র আটপাড়া উপজেলা কমিটির পুর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বিগত ৫ বছরের অধিক সময়ে বাকি ১২টি ইউনিটে কমিটি দিতে পারেনি নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগ। কমিটিতে জেলায় যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়নি বলেই করুণ এই পরিণতি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠনটির। এমনটি মন্তব্য সংগঠনটির সকল স্তরের নেতাকর্মীদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগ নেতা জানায়, সভাপতি ও সম্পাদক এখন পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সংগঠনে সময় দিতে পারছে না। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজন’ই বিবাহিত এবং সন্তানের পিতা। সময় এসেছে নতুন নেতৃত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার। জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন এমন অবহেলার পাত্র হয়ে পড়ে রয়েছে। যা আমাদের জন্য দুঃখজনক এবং লজ্জাজনক।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জেলা ছাত্রলীগের অন্য নেতা জানায়, পদায়নে থাকা জেলার সভাপতি মোঃ ফরজুর মোর্শেদ খান অমি ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান জনি ইউনিটগুলোর কমিটি দিতে না পারলেও এরইমধ্যে দুই দফায় পাল্টে যাবার পর এবার নেতৃত্ব দিচ্ছেন তৃতীয় দফায় নির্বাচিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।
যার ফলে নেত্রকোণা জেলায় নেতাদের নিয়ে তৃণমূলের কর্মীদের মাঝে সমালোচনার সৃষ্টি হচ্ছে। সংগঠনে বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচিত এই নেতাদের ছাত্রনেতা বলা হলেও প্রত্যেকেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পাড়ি দিচ্ছেন সংসার জীবন।
ভাবখানা এমন ঠেকেছে যে, নিজের পদ আছে এবার ভেসে যাক সংগঠন; তাতে আমাদের কি? জাতীয় দিবস থেকে শুরু করে দলীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি নেই নেত্রকোণা ছাত্রলীগের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা।
২০১৭ সালে পুর্ণাঙ্গ কমিটিতে অনুপ্রবেশকারীসহ ঢুকে পড়ে বিবাহিত, মাদকাসক্ত, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস আর রাজাকার পরিবারের সদস্যরা! ঘটতে থাকে জেলায় পদধারী ওইসব নেতাদের মাধ্যমে ধর্ষণসহ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি ও প্রতারণার মতো ঘৃন্যতম যত ঘটনা। এ ধরণের বিভিন্ন অপরাধে মামলার আসামিসহ গ্রেফতারও হন একাধিক নেতা।
২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের জেলা সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে জেলা শহরে কয়েক দফা আনন্দ মিছিল করে নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশিত নেতা-কর্মীরা। তবে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের সাথে কেন্দ্রের নেতাদের দূরত্ব থাকায় সম্মেলন এভাবেই বলবৎ থাকে।
এদিকে, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি-সম্পাদক(সোভন-রাব্বানী)’কে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পরের দিন নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ফয়জুল মোর্শেদ খান অমি তার ব্যক্তিগত ফেইসবুকে বলেন, “আপা’র ছাত্রলীগের ব্যবহারে নিজেকে জামাত-বিম্পির ছাত্রলীগ মনে হইছে এতো দিন! ফোনে বা সামনা-সামনি এই এক/দেড় বছরে উনাদের সাথে কথা বলা বা দেখা করার সৌভাগ্য হয়নি আমার।”
অন্যদিকে, অমির এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে জেলা ছাত্রলীগের আরেক নেতা বলেন, নেত্রীকে নিয়ে এত বড় কথা বলার সাহস অমি পায় কোথায়? অমির কারণে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জাতীয় শোকের মাসকে কেন্দ্র করে ৩১ আগস্ট আয়োজিত জেলা আ’লীগের অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদককে বক্তব্য দেওয়ার জন্য পাওয়া যায়নি। ছাত্রলীগ কি দিয়ে ঢাকবে এ লজ্জা!
অমি-জনি’র প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী মনোয়ার হোসেন সুজন তার ব্যক্তিগত ফেসবুকে বলেন, নেত্রকোনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক পরিবার সন্তানাদি নিয়ে খুব সুখে শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করছেন। আমরাও চাই আপনারা পারিবারিক ভাবে খুব সুখে শান্তিতে থাকেন। কিন্তু, আপনাদের হাতে তো নেত্রকোনা জেলা ছাত্রলীগের প্রতিটি কর্মীর ভবিষ্যত নির্ভর করছে। তাদের জন্য কি করেছেন?
এদিকে জেলা ছাত্রলীগের প্রধান দুই নেতার কর্মকান্ডে ক্ষোভে ফুঁসছেন তৃণমূলের নেতাকর্মী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সংগঠন ছেড়ে বিভিন্ন পেশায় প্রবেশ করেছেন। যারা আছেন, তারা অপেক্ষা করছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সম্পাদকের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
এদিকে, সংগঠনকে বিকলাঙ্গ করা এই দুই নেতা জেলার দশ উপজেলায় কমিটি গঠনের নামে ও ছাত্রনেতাদের পদ দেয়ার আশা দিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে জানা যায় অপকর্মের শিকার হন কেন্দুয়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আওয়াল।
তাকে নেতা বানানোর কথা বলে জেলা ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ একজন হাতিয়ে নিয়েছে দুই লাখ টাকা বলেও অভিযোগ করেছে বিভিন্ন মহলে। জেলা ছাত্রলীগের আরেক নেতা কৃষি বিষয়ক উপ-সম্পাদক কৌশিক সরকার অপু। তিনি গণধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি। নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিক পরিচয়ে প্রতারণা ও চাঁদাবাজি মামলার আসামি।
সংগঠনের উপ-দপ্তর সম্পাদক শেখ শাহান বাবু'র মারপিটের শিকার হয়েছেন নেত্রকোণা সরকারী কলেজের একজন সহযোগী অধ্যাপক ক্লাস রুমের ভিতরে। যে ঘটনায় উত্তাল হয়ে পড়ে নেত্রকোণা জেলা। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে শহরের স্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
এই বিষয়ে কথা বলতে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সম্পাদককে কল দিলে তারা ফোনকল রিসিভ করেনি।
নতুন পদ প্রত্যাশী নেতা-কর্মীরা টাইম নিউজ বাংলাদেশকে জানায়, এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তোলন করে পূণরায় সচল করতে নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগের নতুন কমিটির বিকল্প নেই। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সম্পাদক খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে যোগ্য, দক্ষ্য ও রাজনৈতিক সচেতন ছাত্রনেতৃত্বের হাতে নেত্রকোণা জেলা ছাত্রলীগের দায়িত্ব তুলে দিবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।
বর্তমানে সভাপতি পদপ্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে-
মঈনুল আমীন তালুকদার রিগান,দেওয়ান কামরুল হাসান আকাশ, রবিউল আওয়াল শাওন, মাহফুজুল ইসলাম লিংকন, আশিকুর ফারাস দুদুল,শফিকুল ইসলাম মুন্সী,শুভ চৌধুরী, শরীফুল হক, সোবায়েল আহম্মদ খান, মৃনাল কান্তি ভট্টাচার্য।
এছাড়া সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হিসাবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে-
কৌশিক রায়, শেখ আবির আহমেদ হিমেল, রাকিব আহমেদ, সুলতান মাহমুদ মিলন, মাহমুদ হাসান সুচল, জুয়েল আহম্মদ খান।
হাসান/এএস





