মিয়ানমার থেকে ফেরত আনা ১৫৫ জন অবৈধ অভিবাসীর মধ্যে ১৪৬ জনকে নিজ জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৯ জন অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় রেড ক্রিসেন্টের জিম্মায় স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, মানবপাচারে জড়িত ১৪ জেলার ৭০ দালালের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অপরদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানালেন, আগামী ৩০ জুলাই মিয়ানমার থেকে আরো ১৫৯ বাংলাদেশিকে ফেরত আনা হচ্ছে।

করুণ কাহিনীর সাক্ষী হওয়া মিয়ানমার থেকে ফেরত আসা ১৫৫ জন বাংলাদেশি নিজ ঘরে ফিরছে। সাগর পথে মালয়েশিয়া যাত্রা দিতে গিয়ে ভাসমান থাকার পর গত ২৯ মে মিয়ানমারে উদ্ধার হয়েছিল এরা। ২২ জুলাই মিয়ানমারের ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে এদের দেশে ফেরত আনা হয়।

এসব মানুষের রয়েছে করুণ অভিজ্ঞতা। চোখের সামনে মানুষ মারা যাওয়া, সাগরে লাশ ভাসিয়ে দেয়ার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে। এরা প্রকাশ করেছে দালালের নাম।

সিরাজগঞ্জের হামিদুর রহমান বলেন, ঢাকায় কাজ করতাম। পরে দালাল সাইফুল ও আজিজের মাধ্যমে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করি। মূল দালাল হচ্ছে চকরিয়ার আজিজ, যিনি মালয়েশিয়ায় থাকে এবং টেকনাফের সাইফুল বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন সংগ্রহ করে টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মানুষ পাচার করে।

সিরাজগঞ্জের রফিক, রহমান ও জসিম বলেন, আমাদের তিন জনকে কক্সবাজার নিয়ে আসে করিম দালাল। তার বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে। টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে আমাদেরকে মাছের ট্রলারে তুলে দেয়। পরে সাগরে শুধু মারধর আর কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। দীর্ঘ ২ মাস সাগরে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করেছি। আমরা দালালের ফাঁসি দাবি করছি।

পাবনার রহিম উদ্দিন বলেন, টেকনাফে ছোট নৌকায় করে নিয়ে গিয়ে বড় ট্রলারে তুলে। ওখানে দেখি প্রায় ৪শ’ জন মালয়েশিয়াগামী। পরে আরো ৫শ’ জনকে এ বড় ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। মোট ৯শ’ জন যাত্রীকে ট্রলারে ২ মাস কষ্ট করতে হয়েছে।

মাদারীপুরের সালামত উল্লাহ বলেন, মিয়ানমারের দালালরা আমাদের শুধু মারধর করত। খাবার দিতো না। আমাদের ৩ শতাধিক যাত্রীকে সাগরে ফেলে মিয়ানমারের দালালরা পালিয়ে যায়। একমাস সাগরে ভাসার পর মিয়ানমারের নৌ-বাহিনী আমাদের আটক করে নিয়ে যায়।

এদিকে দীর্ঘ ৬ মাস পর এসব মানুষের বাড়ি ফেরার অনুভুতি ছিল উচ্ছ্বাসের। দালালদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি তাদের।

পাবনার সিরাজ বলেন, বাড়ি ফিরতে পারছি এটাই আনন্দের। তবে আর কোনোদিন দালালের খপ্পরে পড়বো না। এই দালালের খপ্পরে পড়ে প্রায় মরতে বসেছিলাম।

মাদারীপুরের রইচ বলেন, এখন বাড়ি যেতে পারছি, খুব আনন্দ লাগছে। দীর্ঘ ৬ মাস পর মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করতে পারবো খুবই ভাল লাগছে। তবে, দালালদের কঠোর শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

এদিকে গত ২২ জুলাই মিয়ানমার থেকে ফেরত আনার পর এদের রাখা হয়েছিল কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। সেখানে যাচাই-বাছাই শেষে গত বৃহস্পতিবার ৯ শিশুকে রেডক্রিসেন্টের জিম্মায় অভিভাবকের কাছে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের নিজ জিম্মায় ৪টি বাসে করে শুক্রবার দুপুর ১২টায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ১৪ জেলার ৭০ দালালের নাম পাওয়া গেছে। এদের বিরুদ্ধে মামলার কথা জানালেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমেদ।

তিনি জানান, ১৫৫ জন বাংলাদেশিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ১৪ জেলার প্রায় ৭০ জন দালালের নাম পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিটি জেলায় মামলা দায়ের করা হবে। পুলিশ প্রশাসন দালালদের ধরতে কাজ করে যাচ্ছে।

১৫৫ জন বাংলাদেশিকে বাড়ি পৌঁছানোর সার্বিক ব্যবস্থা করছে আর্ন্তজাতিক অভিবাসন সংস্থা। সংস্থাটির ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার আসিফ মুনীর জানান, বৃহস্পতিবার রাতে আদালতের নির্দেশে অপ্রাপ্ত বয়স্ক ৯ জনকে রেড ক্রিসেন্টের জিম্মায় স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ১৪৬ জনকে ৪টি বাসে করে নিজ জিম্মায় নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়াও তাদের খাওয়া দাওয়া করার জন্য নগদ অর্থ সহায়তাও আইওএম’র পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, আগামি ৩০ জুলাই ১৫৯ জনের আরো একটি দল মিয়ানমার থেকে ফেরত আনা হবে। এ ব্যাপারে সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২১ মে মিয়ানমারের জলসীমা থেকে সাগরে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ২০৮ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করে মিয়ানমার। এদের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে প্রথম দফায় বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্ত ১৫০ জনকে ৮ জুন এবং দ্বিতীয় দফায় ৩৭ জনকে ১৯ জুন ফেরত আনা হয়। এর মধ্যে ২৯ মে মিয়ানমারের জলসীমা থেকে দেশটির নৌ-বাহিনী আরো ৭২৭ জন অভিবাসী প্রত্যাশীদের উদ্ধার করে।


এমআর