রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের ১১টি আবাসিক হলে প্রায় চার শতাধিক সিট অবৈধভাবে নিজেদের দখলে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। দলীয় কর্মী সঙ্কটে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা অধিকাংশ কক্ষ এখন শূন্য পড়ে আছে। তবে কয়েকটি কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের শক্তি বৃদ্ধি করতে বেশকিছু বহিরাগত নেতাকর্মী অবস্থান করে বলে জানা গেছে।

এরপরেও থেমে নেই ছাত্রলীগের সিট বাণিজ্য। হল গুলোতে নতুন করে শুরু হয়েছে সিট বাণিজ্য। এতে করে চরম দূর্ভোগে পড়তে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় হল প্রাধ্যক্ষ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এসব ব্যাপারে অভিযোগ করলেও অপারগতা প্রকাশ করছে সংশ্লিষ্ঠ কর্তপক্ষ।

বৈধভাবে বরাদ্দ না নিয়ে সিট দখলে রাখার কারণে প্রতিমাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকার বেশি সিট ভাড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হল প্রশাসন। এদিকে প্রশাসন থেকে হলে সিট বরাদ্দ দিতে গিয়েও ছাত্রলীগের চাহিদা মতো কক্ষ দিতে হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সব চেয়ে বেশি সিট নিজেদের দখলে রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান হলে। ওই হলে চার সিটের অন্তত ১৫টি কক্ষ তারা অবৈধভাবে নিজেদের দখলে রেখেছেন। বর্তমানে ওই হলের ২১৬ নং কক্ষ এবং ২১৯ থেকে ২৩২ পর্যন্ত প্রতিটি কক্ষ তারা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। এছাড়াও আরও কয়েকটি কক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রনে রয়েছে। 

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা ফজলুল হক হলে বর্তমানে ছাত্রলীগের অন্তত ৪০টি সিট নিজেদের দখলে রয়েছে। ওই হলে এক সিটের ৯টি কক্ষ রয়েছে ছাত্রলীগের দখলে। কক্ষগুলো হলো-৫, ৭, ২০০, ৩০১, ৩০২, ৩০৩, ৩০৪, ৩০৫, ৩০৬। এছাড়াও চাঁর সিটের আরও ৭টি কক্ষ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ছাত্রলীগ। কক্ষগুলো হলো-৮, ৯, ২১২, ২১৩, ২১৪, ২১৫, ২১৬ নম্বর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলে ছাত্রলীগ অন্তত ৩৫টি সিট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। হলের তিন সিটের ১১টি কক্ষসহ আরও একটি কক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রণে বলে জানা গেছে। কক্ষ গুলো হলো-২০১, ২০২, ২০৪, ২০৭, ২০৯, ২৫৪, ২৫৫, ২৬৫, ২৬৭, ২৫৮ও ২৬০ নম্বর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আমীর আলী হলে তিন সিটের ৮টি কক্ষ তাদের দখলে। কক্ষগুলো হলো-২৫১, ২৫২, ২৫৩, ২৫৪, ২৫৫, ২৫৬, ২৫৭ ও ২৫৮ নম্বর। এছাড়াও হলে আরও বেশ কয়েকটি কক্ষ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আব্দুল লতিফ হলে দুই সিটের ১০টি কক্ষ নিজেদের দখলে রেখেছে ছাত্রলীগ। কক্ষগুলো হলো-২০২, ২০৪, ২০৬, ২০৮, ২১০, ২১২, ২১৪, ২১৬, ২০১৮ ও ২২০ নম্বর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের দুই সিটের ১১টি কক্ষ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। হলের ২২০ থেকে ২৩০ নম্বর কক্ষগুলোসহ আর দুটি কক্ষ এখন তাদের কব্জায়।

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ হলে ৪০টি, শহীদ হবিবুর রহমান হলে ৩৫টি, শহীদ শামসুজ্জোহা হলে ২৫টি, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হলে ২৫টি এবং মতিহার হলে অন্তত ১৫টিসহ মোট চার শতাধিক সিট বর্তমানে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে।

হল প্রশাসন থেকে কোনো বরাদ্দ না নেয়ায় প্রতি মাসে সিট ভাড়াও দিতে হচ্ছে না ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এতে করে প্রতিমাসে রাবির ১১টি হলে অন্তত ৪০ হাজার টাকারও বেশি সিট ভাড়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হল প্রশাসন।
ছাত্রলীগের সিট বাণিজ্য

এদিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নতুন করে শুরু করেছে সিট বানিজ্য। আবাসিক হলের বিভিন্ন কক্ষে অনাবাসিক (হলে যাদের সিট নেই) ছাত্রদেরকে তুলে তাদের নিটক থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রতিমাসে প্রত্যেক অনাবাসিক ছাত্রদের কাছ থেকে দুই থেকে তিনশত টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও অনেক আবাসিক শিক্ষার্থীর নিকট থেকে প্রতিমাসে মোটা অংকের চাঁদাও নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ছাত্রলীগের দখলে সিট আছে কর্মী নেই

ছাত্রলীগের কর্মী সংকটের কারণে তাদের দখলে থাকা অধিকাংশ সিট ফাঁকা পড়ে আছে। কয়েটি হলে আবার বহিরাগত ছাত্রলীগ ক্যাডাররাও অবস্থান করছে। তারা হল প্রশাসনরে থেকে কোনো প্রকার সিট বরাদ্দ না নিয়েই অবৈধভাবে হলে থাকছেন।
এছাড়াও ছাত্রলীগের সিটগুলোতে একাধিক শিক্ষার্থীকে তাদের দলে কাজ করার কথা বলে অবৈধভাবে হলে রাখছেন। এছাড়া বিভিন্ন হলে তাদের নিয়ন্ত্রীত একাধিক কক্ষ বর্তমানে তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা গেছে। তবে হলে যেসব ছাত্রলীগের নেতাকর্মী আছে তাদের মধ্যে কিছু আছে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের শক্তি বৃদ্ধি করতে হলে অবস্থান করছে।

হলে অসহায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা

বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন জানান, এ বছরের শুরুর দিকে জিয়াউর রমান হলে ভর্তির পর আমাকে ১১৮ নম্বর কক্ষে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই কক্ষে গিয়ে কোনো সিট ফাঁকা না পাওয়ায় আর হলে থাকার সুযোগ পাইনি। কিন্তু হলে না থাকলেও আমাকে নিয়মিত হল ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে।

নূর হোসেন সরকার নামের আর এক শিক্ষার্থী জানায়, আমার এক বন্ধু শাহ্ মখদুম হলে ভর্তি হলেও তাকে কোনো কক্ষ নম্বর দেয়া হয় নি। সে অনেক খুঁজেও কোনো কক্ষ না পেয়ে বিষয়টি হল প্রাধ্যক্ষকে বলেন। কিন্তু তিনি একাধিকবার আশ্বাস দেয়ার পরও হলে তার সিট পাওয়া যায় নি। এভাবেই অনেক শিক্ষার্থী হলে সিট না পাওয়ার বিষয়ে নিজেদের অসহায়ের কথা তুলে ধরেন।

আবার অনেক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের যে কক্ষে সিট বরাদ্দ দেয়া হয় সে সেখানে গিয়ে শুনি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আগেই গিয়ে ওই কক্ষের অন্য বাসিন্দাদের বলে এসেছে ফাঁকা সিটে যেনো তারা কাউকে না উঠায়। সেখানে তাদের পরিচিত ছেলে তোলা হবে। অভিযোগ রয়েছে, টাকার মাধ্যমে হলে সিট না হলেও ছাত্রলীগ তাদের হলে জায়গা করে দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ‘ছাত্রলীগ চায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা যাতে আবাসিকতা নিয়ে হলে ভালো ভাবে থাকতে পারে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরও বৈধভাবেই হলে থাকা দরকার। তবে এই বিপুল পরিমান সিট নিজেদের দখলে রাখার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কাউন্সিলের আহ্বায়ক ও শাহ মখদুম হল প্রাধ্যক্ষ ইমতিয়াহ আহমেদ জানান, সিট দখলের নিয়োমটি অনেক আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসছে। হলের কক্ষগুলোকে উদ্ধার করার জন্য সকল হল প্রাধ্যক্ষ, আবাসিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এক সাথে এগিয়ে আসতে হবে জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘এতো পরিমান সিট কোনো ছাত্রসংগঠনের দখলে তা আমার জানা ছিল না। যদি তারা অবৈধভাবে সেখানে থেকে থাকে এর বিরুদ্ধে হল প্রশাসনকে বলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা,এমএইচ, ৫ জুলাই (টাইমনিউজবিডি.কম)//এসএইচ