ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানীতে ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে ভাসমান মানুষের সংখ্যা। রমজান মাসে দান-খয়রাত ও জাকাতের বিষয় থাকায় ঈদে রাজধানীতে এ ধরনের মানুষের সংখ্যা বেশি বেড়েছে।

কথা বলে জানা গেছে, ঈদের আগের দিনগুলোতে উপার্জন ভালো হওয়ায় এ সময় দেশের নানা প্রান্ত থেকে রাজধানীতে এসে তারা ভিড় করে। প্রতিদিন গড়ে এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ উপার্জন তাদের।

নাড়ির টানে রাজধানী ছেড়ে যখন মানুষ গ্রামে ফিরছে ঠিক সে সময় এসব মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে ভিড় জমাচ্ছে রাজধানীতে।

রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, শপিং মল, মসজিদ, রাস্তার মোড়ে গত কয়েক দিনে বিপুলসংখ্যক ভিক্ষুক ও ভাসমান শিশু দেখা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে তাদের উপস্থিতি অন্য সময়ের তুলনায় অন্তত কয়েকগুণ বেড়েছে।

দেশের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলো থেকে তারা দলে দলে ঢাকায় আসতে আসছে। এবার ঈদেও এ সংখ্যা নেহাৎ কম নয়।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানীতে প্রায় ৫০ হাজার ভিক্ষুক বর্তমান। তবে রমজান ও ঈদ উপলক্ষে এ হার বেড়ে যায় আরো কয়েকগুণ।

রাজধানীতে বর্তমানে এ সংখ্যা অন্তত দেড় লাখ। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে তারা রাজধানীতে ভিড় করছে।

রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভিক্ষুকের সঙ্গে কথা হল, নাম রইস উদ্দিন। বয়স ৭০-এর কাছাকাছি। তিনি জানান, তার গ্রামের বাড়ি বরিশাল।

ভিক্ষা করেই জীবন নির্বাহ করেন। বয়সের ভারে কাজ করতে পারেন না। এমনিতে তিনি বরিশালেই ভিক্ষা করেন। প্রতিবছর ঈদের আগে তিনি ঢাকায় আসেন। বাড়িতে ফিরে যান ঈদের পর। এ সময় বেশি উপার্জন হয় বলেই তিনি ঢাকায় আসেন।

নিয়মিত এসব ভিক্ষুকের পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে থেকে খণ্ডকালীন কিছু ভাসমান মানুষ ঢাকায় এসে ভিক্ষাবৃত্তি করে ঈদের আগে। আবার ঈদের পর তারা ফিরে যায় গ্রামে।

বর্তমানে ঢাকায় বাইরে থেকে এসে যারা স্বল্প সময়ের জন্য ভিক্ষাবৃত্তি করছে তাদের বেশিরভাগের বাড়িই রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলোতে।

এ ভিক্ষাবৃত্তিকে কেন্দ্র করে আবার রাজধানীতে একটি গ্রুপ সক্রিয়। গ্রুপটি ভিক্ষাবাণিজ্য পরিচালনা করে বিভিন্ন বস্তির শিশুকে দৈনিক ৫০ থেকে ২০০ টাকার বিনিময়ে ভিক্ষুকের কাছে ভাড়া দেয় । আর বড়রা পায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। আবার অনেকে নিজেই ভিক্ষায় নামে কোলের শিশুসন্তানকে নিয়ে।

তাদের আয়ের একটি বড় অংশ যাচ্ছে চক্রের পকেটে। তারাই মূলত এক একটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পঙ্গু নয় এমন মানুষকে জোর করে পঙ্গু বানিয়ে অঙ্গ বিকৃতি ঘটিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানো।

রাজধানীর আশপাশের টঙ্গী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, কুমিল্লা, নরসিংদী ছাড়াও বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, ফেনী, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড় থেকেও ভিক্ষার আশায় ভিড় করছে রাজধানীতে।

এরা যেহেতু ভাসমান ভিক্ষুক, তাই তাদের রাতে থাকার জায়গাও নেই। তারা বাস টার্মিনাল, মার্কেট, ফুটপাত, ওভারব্রিজ ইত্যাদি জায়গায় থাকে। সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তি চলে।

এসব লোক রাষ্ট্রীয় সব মৌলিক অধিকার শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। উন্মুক্ত এই বসবাস, রান্নাবান্না, মল-মূত্রে যেমন দূষিত হচ্ছে পরিবেশ, তেমনি দুর্ভোগে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

বর্তমানে দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসিত করতে হলে প্রত্যেক জেলায় নির্দিষ্টসংখ্যক পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করতে না পারলে দেশে অপরাধ ও অপরাধীদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।

এক রিপোর্টে দেখা যায়, ৮০ ভাগ ভবঘুরে পুনর্বাসনের জন্য নিজ জেলায় যেতে চায় এবং ৯৩ ভাগ ভিক্ষুক সরকারি সাহায্য পেলে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দেবেন বলে জানিয়েছে।

এমএ/এসএইচ