টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ঘড়িয়া গ্রামের পারুল আক্তার নামের এক গৃহবধূকে যৌতুকের দাবিতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে স্বামী নাসির উদ্দিন বাবুর বিরুদ্ধে।
পারুলের পিতা কদ্দুছ মিয়া বাদী হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। অভিযুক্ত নাসির উদ্দিন বর্তমানে পলাতক রয়েছে। কিন্তু মামলা ভিন্নখাতে নেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষ।
মামলা সূত্রে জানা যায়, কালিহাতী উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের ঘড়িয়া গ্রামের আব্দুল খালেকের ছেলে নাসির উদ্দিন বাবু(২৪) ও একই এলাকার কদ্দুছ মিয়ার দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়ে পারুল আক্তারের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে।
পারিবারিকভাবে অসম্মতি জানালে তারা দুইজনে ২০১২ সালে পালিয়ে বিয়ে করেন । পারুলকে না পেয়ে তার পিতা কদ্দুছ মিয়া ২০১২ সালের ৩১ মে কালিহাতী থানায় একটি জিডি (১১৮৭ নং) দায়ের করেন ।
পরবর্তীতে পারুলের পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন নববিবাহিতরা আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পরথেকেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয় চরম কলহ।
নাসির উদ্দিন যৌতুকের দাবিতে নিয়মিত পারুলে উপর চালাতে থাকে নিষ্ঠুর, নির্মম শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার । অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে পারুল গ্রামে চলে আসেন।
নাসির গ্রামে এসে তার স্ত্রীকে ফেরত নিতে চাইলে পারুল অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে একাধিকবার গ্রাম্য সালিশে অত্যাচার না করার শর্তে মীমাংশা করে পারুলকে নাসিরের নিকট তুলে দেয়া হয়। কিছুদিন পর পারুলকে দেখার জন্য কদ্দুছ মিয়া আশুলিয়ায় গেলে তার মেয়েকে না পেয়ে ফিরে আসেন।
তিনি আবার ২০১৫ সালের ২৮ জুলাই ভাড়া বাসায় গিয়ে নাসির উদ্দিনকে পারুলের কথা জিজ্ঞাস করলে সে জানায় পারুল বাসায় নেই। কোথায় গেছে, কবে গেছে এসব প্রশ্নের কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় কদ্দুছ মিয়া আশেপাশে বিভিন্নস্থানে পারুলের খোজখবর নেন।
কিন্তু পারুলের কোন হদিস না পেয়ে কদ্দুছ মিয়া ২০১৫ সালের ৪ আগষ্ট টাঙ্গাইল কোর্টে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় পারুলের স্বামী নাসির উদ্দিন বাবুকে (১), শাশুড়ী অজুফা খাতুনকে (২) এবং আব্দুল হালিমকে (৩) নং আসামী করা হয়।
মামলা করার পর থেকেই নাসির উদ্দিন পলাতক রয়েছে। পারুলের বাবা কদ্দুছ মিয়া বলেন, ‘ওরা আমার ম্যায়াডারে মাইরা ফালাইছে। ‘ আবার হত্যাকারীরা বাঁচার জন্য আশুলিয়া থানায় একটি নিখোজ জিডি করেছে।
এদিকে, মামালার তদন্তকারী কর্মকর্তা কালিহাতী থানার তৎকালীন এসআই ছলিম উদ্দিন প্রতিবেদনে পারুল নিখোঁজ হয়েছে তথ্য প্রদান করলে বাদী নারাজি আবেদন করেন।
অভিযোগ আছে এসআই ছলিম বাদীর নিকট মোটা অংকের ঘুষ দাবি করেছিলেন। এরপর মামলার তদন্তের দায়িত্ব আদালত ডিবির নিকট হস্তান্তর করলে ডিবির এসআই আমিনুল ইসলাম একই ধরনের প্রতিবেদন প্রদান করেন। ফলে ন্যায় বিচার না পাওয়ার আশংকা করছেন বাদী পক্ষরা।
সরেজমিনে কালিহাতীর ঘড়িয়া গ্রামে গেলে নাসির উদ্দিনের প্রতিবেশি শিক্ষিকা নাসিমা বেগম বলেন, পারুলের স্বামী, শাশুড়ি ও বোনেরা একসাথে মিলেমিশে বাড়ির গেট বন্ধ করে পারুলের উপর নির্মম মারপিট করত। আমরা প্রতিবেশিরা বাড়ির বাইরে থেকে কান্না, চিৎকারের শব্দ শুনতে পেতাম। কিন্তু খারাপ লাগলেও ভেতরে যেতে পারতাম না।
এছাড়া পারুলকে ২-৩ দিন পর্যন্ত খাবার দেয়া হতোনা। গ্রামের মাতাব্বর মোহন মেম্বার ও শহর আলী জানান যৌতুকের দাবিতে পারুলকে অত্যাচার করায় তারা একাধিকবার গ্রাম্য সালিশ করেছেন।
নাসির উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। নাসিরের মা আসামী অজুফা খাতুন হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, পারুল নিখোজ হয়েছে। আমার ছেলে কোথায় থাকে আমি জানি না। তিনি আরো বলেন’ পারুল পূর্বেও বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। তবে প্রতিবেশীরা জানান, নাসির রাতে রাতে বাড়িতে আসে এবং দ্রুত বিদেশে যাবার জন্য চেষ্টা করছে।
পারুলের মা মরিয়ম বেগম বিলাপ করে বলেন, ‘যৌতুকের জন্য অরা আমার ম্যায়ারে না খাওয়াইয়া মারতে মারতে মাইরা ফালাইছে। আমরা গরিব মানুষ তাই কি বিচার পামু না। খুনিদের ফাঁসি হইলে আমি শান্তি পামু। ’
উল্লেখ্য, নাসির উদ্দিন এরআগেও পাশের বাড়ির কলেজ পড়ুয়া আরেকটি মেয়েকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রেমের ফাদে ফেলে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করে। বিয়ের দাবিতে মেয়েটি নাসির উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে উঠলে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাড়িয়ে দেয়।
ওই মেয়ে অপমান সইতে না পেরে ২০১০ সালের ৪ এপ্রিল বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। বিষয়টি গোপনে ধামাচাপা দেয়া হয়। গ্রামবাসি লম্পট খুনি নাসির উদ্দিনের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেছেন।
এমকে





