সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহাসিক নিদর্শন পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়ার সাপলেজার প্রত্নসম্পদ সাপলেজা কুঠিবাড়ি। বর্তমানে কুঠিবাড়ির ৩টি ভবন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জরুরি সংস্কার করা না হলে মূল ভবনটিও সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, আঠারো শতকের গোড়ায় জনৈক ইংরেজ জমিদার এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এ কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। সোয়া নয় একর জমির উপর নির্মিত হয় ক্যাসপারের কুঠিবাড়ি। কুঠিবাড়ির মূলভবন নির্মাণে প্রচলিত ধারার বৃটিশ স্থাপত্যরীতিতে চৌকোণাকৃতির ১৮টি খিলানের উপর দোতলা পর্যন্ত সমপ্রসারিত ছিল।
বর্তমানে কুঠিবাড়িতে সংস্কারবিহীন মূল ভবন, পুকুরের ভাঙা শানবাঁধানো ঘাট এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া তিনটি জরাজীর্ণ ভবন ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আঙ্গিনায় থাকা পুরোনো আমলের অনেক মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
কথিত আছে, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি মি. ক্যাসপার ঘটনাক্রমে মঠবাড়িয়ায় এসে সাপলেজা ভ্রমণকালে স্থানীয় ধনাঢ্য ফরাজউল্লাহ তাঁকে সম্মানিত করতে উক্ত জমি উপহার দেন। পেরিসকাসপারস এ জমির ওপর কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে এখানে ক্যাসপারের জমিদারী সম্প্রসারিত হয়।
তখন তিনি এখানে থাকার জন্য একটি দোতলা ভবন নির্মাণ করেন। এ ছাড়া নায়েব, পাইক পেয়াদাদের থাকার জন্য নির্মাণ করেন আরো একটি ভবন। দ্বিতল ভবনটির নীচের তলায় অফিস কক্ষে বসে এলাকার খাজনা আদায় ও বিচার পরিচালনা করতেন।
এডওয়ার্ড পেরিসকাসপারসের একটি বড় বোট ছিল। এ বোটে করেই তিনি শীত মৌসুমে তৎকালীন চন্দ্রদীপ (বর্তমান বরিশাল) থেকে কুঠিবাড়ি আসতেন। এলাকার খাজনা আদায় করে আবার শীত শেষে চলে যেতেন।
যেহেতু তিনি শীত মৌসুমে এখানে অবস্থান করতেন তাই ভবনটিকে গরম রাখার জন্য বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল। মূল ভবনের নীচে চারকোণে কয়লার আগুন রাখার ব্যবস্থা ছিল। তাতে পুরোবাড়ি গরম থাকতো।
প্যারি ক্যাসপারের উপস্থিতিতে প্রতিবছর পৌষ মাসের শেষভাগে কুঠিবাড়িতে পুণ্যাহ উৎসব উপলক্ষে খাজনা আদায়সহ প্রজাদের মনোরঞ্জনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এর মধ্যে যাদু প্রদর্শনী, লোকগান, যাত্রা ও নিমাই সন্ন্যাসী পালায় প্রচুর লোক সমাগম হতো। কথিত আছে, সোয়া হাত মাপের একজোড়া জুতা দিয়ে অভিযুক্ত প্রজাদের বিভিন্ন অপরাধে শাস্তি দেওয়া হতো।
১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের পর বৃটিশরা চলে গেলে ভবন ও সম্পত্তি তখনকার সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। অজ্ঞাত কারণে ভেঙে দেওয়া হয় মূল ভবনটির দোতলার সম্পূর্ণ অংশ। তখন এ অংশে রক্ষিত মূল্যবান মালামাল বেহাত হয়ে যায়।
বর্তমানে কুঠিবাড়িটি দুইশত বছরের ঐতিহ্য নিয়ে অযত্ন-অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে। মি.ক্যাসপারের বাড়িটি বর্তমানে পরিত্যক্ত হলেও তার পিতার নাম বহন করা সাপলেজা পোস্ট অফিসটি আজো শিলারগঞ্জ পোস্ট অফিস নামে পরিচিতি ধারণ করে আছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সরকার ক্যাসপার সাহেবের মূল বাড়ি সংস্কার করে দোতলা ভবনটিতে টিনের চাল দিয়ে ভূমি খাজনা আদায়ের জন্য তহসিল অফিসের কাজ চালু করে।
স্থানীয়রা জানান, সরকার কুঠিবাড়ির মালিকানা নিলেও এর রক্ষণাবেক্ষনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। সূত্র: ইত্তেফাক
এমএনজে





