নোয়াখালী মুক্ত দিবস আজ । ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর এই দিনে বৃহত্তর নোয়াখালী সম্পূর্ণ ভাবে হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। দীর্ঘ ৪৪ বছর শেষ হলেও নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে হানাদারদের নির্মমতার স্বাক্ষী বধ্যভূমি অদ্যাবধি সংরক্ষণ হয়নি।

এনিয়ে নোয়াখালী মুক্ত দিবস এলে বধ্যভূমি সংরক্ষনের কথা সর্বস্তরের মানুষের মনে পড়ে। বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য কমিটি গঠিত হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সাংসদ এ বিষয়ে তালিকা নিয়ে মন্ত্রনালয়ে পাঠালেও অদ্যাবধি তার কোন খোঁজ খবর মেলেনি।

জানা যায়, সুবেদার লুৎফর রহমান ও সুবেদার সামছুল হকের নেতৃত্বে ৪ এপ্রিল লাকসামের উত্তরে বাঘমারায় প্রথম সংঘর্ষ হয়। এরপর ১০ এপ্রিল লাকসামে সম্মুখ যুদ্ধে মাত্র ৭০জন মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে পরিচালিত যুদ্ধে ২৬জন হানাদার সৈন্য নিহত ও ৬০ জন আহত হয়।

২০ এপ্রিল নাথের পেটুয়াতে, ২১ এপ্রিল সোনাইমুড়ি রেল স্টেশনের আউটার সিগনালের কাছে, ১ মে বগাদিয়ায় নায়েক সিরাজের নেতৃত্বে সম্মুখযুদ্ধে ১৫-২০ জন পাকসেনা নিহত হয়। সে যুদ্ধে ২জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

৯ মে সুবেদার ওয়ালি উল্ল্যার নেতৃত্বে পুণরায় বগাদিয়ায় যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে নায়েক সুবেদার ওয়ালি উল্ল্যার কপালে গুলি লাগে এবং তিনি আহত হন। ১০ মে বাংলা বাজারের পুর্ব দিকে পাক সেনাদের সাথে যুদ্ধ হয়।

১১ মে সুবেদার ওয়ালি উল্ল্যাহ এবং নায়েক আবুল হোসেন, লক্ষ্মীপুরের হাবিলদার মতিনের নেতৃত্বে মীরগঞ্জে খান সেনাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে কয়েক জন পাক সেনা নিহত হয় এবং অপর খান সেনারা পালিয়ে যায়।

এখানে খান সেনাদের ফেলে যাওয়া বহু অস্ত্র শস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। ১৩ মে রামগঞ্জের নিকট, ১৪ মে বিপুলাসার রেল স্টেশনে, ১৫ মে বগাদিয়ায় পুণরায় যুদ্ধ হয়।

২৬ মে দালাল বাজারে সুবেদার লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে নায়েক আবুল হোসেন, নায়েক সুবেদার ইসহাক ও সুবেদার ওয়ালি উল্ল্যাহ অসম সাহসিকতার পরিচয় দেন। ২৮ মে সুবেদার ওয়ালি উল্ল্যাহ মাইন দ্বারা সাহেবজাদার পুলটি ধ্বংস করে। এতে লাকসাম-নোয়াখালীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

বিলোনিয়াসহ নোয়াখালীকে ২নং সেক্টরের অধীনে আনা হয় এবং ৫টি জোনে ভাগ করা হয়। ২নং সেক্টরের প্রধান ছিলেন মেজর খালেদ মোশারেফ (এপ্রিল- সেপ্টেম্বর) এবং মেজর এটিএম হায়দার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) এ বাহিনী ‘কে’ ফোর্স নামে পরিচিত ছিল।

জোনগুলোর নামকরণ করা হয় যথাক্রমে এ, বি, সি, ডি, ই এবং হাতিয়াকে আলাদাভাবে রাখা হয়। জেলা সদরের পুর্বাঞ্চলের ডি জোনের কমান্ডার ছিলেন রফিক উল্ল্যাহ।

মুজিব বাহিনীর কামান্ডার হন আবুল কাসেম। এ মুক্তিযোদ্ধাদের অধীনে কোম্পানীগঞ্জ, চাপরাশিরহাট, মিয়ারহাট, মৃধারহাট, কালামুন্সী প্রভৃতি এলাকা ছিল। জেলা সদরের পশ্চিমে সি জোনের কমান্ডার ছিলেন মোহাম্মদ উল্ল্যাহ।

এ জোনের অধীনে ছিল মাইজদী, রাজগঞ্জ, চন্দ্রগঞ্জ, ভবানীগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, খলিফার হাট, বাঁধেরহাট, ওদারহাট ও বাংলাবাজার।

ইতিমধ্যে বৃহত্তর নোয়াখালীর বিএলএফ এর অধিনায়ক মাহমুদুর রহমান বেলায়েত (সাবেক এম.পি. চাটখিল উপজেলা) এবং সহ-অধিনায়ক অ্যাডভোকেট মমিন উল্ল্যাহ বিএলএফ কে সুসংগঠিত করে হানাদার বাহিনীর উপর তীব্র আক্রমণ রচনা করেন।

প্রথমাবস্থায় সদর পূর্বাঞ্চল, কোম্পানীগঞ্জ ও সোনাগাজী এলাকায় আবদুর রেজ্জাকের কমান্ডে মোস্তফা কামাল, নিজাম উদ্দিন ফারুকসহ বিএলএফ এর একটি দল বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সফলতা অর্জন করেন।

এ সকল যুদ্ধে বিএলএফএর বীর সদস্য ছালেহ আহম্মেদ (যাঁর নামে চৌমুহনী সরকারি কলেজের নামকরণ করা হয়), আবদুর রব, বাবু, মোঃ ফারুক, মোঃ ইসমাইল, আবু নাসেরসহ আরো অনেকে শহীদ হন।

এসময় তৎকালীন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক অহিদুর রহমান অদুদ সুধারাম থানা এবং ওবায়দুল কাদের কোম্পানীগঞ্জ থানা বিএএলএফ এর কমান্ডার নিযুক্ত হন। তারা যৌথভাবে কবিরহাট, চাপরাশিরহাট, বসুরহাট ও তালমোহাম্মদের হাটের যুদ্ধসহ সদর এবং কোম্পানীগঞ্জে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

তাল মোহাম্মদের হাটের যুদ্ধে সদর বিএলএফ কমান্ডার অহিদুর রহমান অদুদ শহীদ হলে এনাম আহসানকে সদর পূর্ব ও ফজলুল হক বাদলকে সদর পশ্চিম বিএলএফ এর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

নোয়াখালী জেলার তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার মেজর হায়দার ও বিএলএফ প্রধান মাহমুদুর রহমান বেলায়েতের নেতৃত্বে মুক্তি বাহিনী ৩ নভেম্বর রাতে নোয়াখালী অঞ্চল মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১ আমাদের সি জোনের গুপ্ত চরের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধারা জানতে পারে পাক্ হানাদার বাহিনী জেলা শহর মাইজদীতে খুবই দ্রুতত মুভমেন্ট করছে।

তাৎক্ষনিক সি জোনের রাজনৈতিক প্রধান আলী আহম্মদ চৌধুরীসহ কমান্ডাররা এক জরুরী বৈঠকে পাক বাহিনী ও রাজাকারদের উপর আক্রমন করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে।

পরিকল্পনা অনুযায়ি নোয়াখালী জেলার তৎকালীন মহকুমা শহর ফেনী ও লক্ষীপুরে আক্রমন শুরু হয়। ৪ ডিসেম্বর মহকুমা শহর গুলো মুক্ত হওয়ার পর জেলা শহর মাইজদীকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধারা।

ওই দিন সন্ধ্যায় পাকিস্তানী বাহিনী জেলা শহর ছেড়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে চলে যাওয়ার পথে বিপুলা শহর ও নাথের পেটুয়া নামক স্থানে প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। সেখানে ব্যাপক যুদ্ধের পর পাকিস্তানী বাহিনী আত্মসমর্পন করে।

৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা রাত ২টার মধ্যে নোয়াখালী মাইজদী শহর মুক্ত করার জন্য নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নিয়ে নির্দেশ মোতাবেক কাজ করে শুরু করে।

ওই দিন সন্ধ্যায় তৎকালিন নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মনজুরুল করিম এর কাছে পরদিন নোয়াখালী আক্রমন ও পাক বাহিনী, রাজাকার ক্যাম্পে আক্রমন সংবাদ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট খায়ের আহম্মদ, রফিক উল্যাহ্ মিয়া যায়।

নিদের্শ মোতাবেক ডিসি পুলিশ বাহিনীকে ৭ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্ম সর্মপনের বিষয়ে নির্দেশ দেয়। লাইনের সমস্থ পুলিশ বাহিনী সকালেই আত্মসর্মপন করে।

৬ডিসেম্বর নোয়াখালী মুক্ত দিবসে বিএলএফ কমান্ডার মাহমুদুর রহমান বেলায়েত এবং ডিজোনের কমান্ডার রফিক উল্যাহ্র তাদের বাহিনীসহ এমএফ, বিএলএফ, এফএফ সবাই একত্রে নোয়াখালী জেলা শহরের বিভিন্ন জায়গায় আক্রমন চালায়।

এসময় সকাল ১০টার মধ্যে পিটিআই ছাড়া মাইজদী ভোকেশনাল, নাহার মঞ্জিল, কোর্ট ষ্টেশন, রৌশন বাণী সিনেমা হল, দত্তেরহাট, কোল্ড ষ্টোরিজসহ রাজাকার ক্যাম্প সবাই আত্মসর্মপন করে।

এদিকে গ্রামাঞ্চলের ক্যাম্পগুলো থেকে শহর এলাকার রাজাকার এসে জড়ো হতে থাকে। তারা মুলত পিটিআই কে শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে গড়ে তোলে।

সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধাদের ১২টি গ্রুপ একত্রিত হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজাকার ও পাক বাহিনীর সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় ঘাঁটি হেড কোয়াটার পিটিআই মধ্যে দিঘীর উত্তর পাড়ে হোস্টেলে আক্রমণ চালায়।

এতে সকলে আত্মসর্মপন করে। এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বিল্ডিং বিধ্বংসী বোমা ছিল না বলে তারা ফেনী থেকে ২য় মোটার নিয়ে আসে। কিন্তু পিটিআই ক্যাম্প আক্রমন করতে গিয়ে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।

দু’দিন তুমুল যুদ্ধ শেষে ৭ডিসেম্বর নোয়াখালী জেলার শেষ শত্রু ঘাঁটি পিটিআই ক্যাম্পের পতন ঘটে।

পিটিআই মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে নোয়াখালী হানাদার মুক্ত করেন। মাইজদী শহরের হাজার হাজার উৎপল্ল জনতা আনন্দ মিছিল করতে থাকে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের শহরে উঠে আসার সংবাদে জনগন বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত শহরের বিভিন্ন সড়কে বিজয় মিছিল শুরু করে।

একটি মিছিল বের হয় সরকারি আবাসিক থেকে হাসপাতাল সড়ক হয়ে পৌর ভবনের সামনে আসলে পিটিআই ক্যাম্প থেকে রাজাকাররা মিছিলের উপর ব্রাশ ফায়ার করে।

সেখানে শহীদ হয় নোয়াখালী কলেজের মেধাবী ছাত্র স্বপন, নজরুল, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল হাশেমসহ ৬জন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় বসুমিয়া, নাজির, আবদুল গোফরানসহ আরো ৩জন মুক্তিযোদ্ধা। আহত হয় আরো ৮জন।

নোয়াখালী মুক্ত হলেও আজ শহীদ মুক্তি গণ হত্যার নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের বধ্যভূমি সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়নি।

বধ্যভূমি সংরক্ষণের বিষয়ে নোয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার মোজাম্মেল হক মিলন জানান,‘ মুক্তিযুদ্ধের ৯মাসে নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে রাজাকার পাক বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে অত্যাচার করে হত্যা করে।

বেগমগঞ্জের গোপালপুর বধ্যভূমি, সোনাপুর,শ্রীপুর ও মহব্বতপুর বধ্যভূমি, বেগমগঞ্জ কালাপোল বধ্যভূমি, চৌমুহনী দীঘির পাড় বধ্যভূমি কালীবাবুর গ্যারেজ বধ্যভূমি, সদর হাসপাতাল বধ্যভূমি, বেগমগঞ্জের আবীরপাড়া বধ্যভূমি, রশীদপুর, নাওতলা, সোনাইমুড়ি, বেগমগঞ্জের বাট্টাগ্রাম বধ্যভূমিতে কয়েক হাজার লোককে হত্যা করে মাটি চাপা দেয়া।

সেনাবাহিনীর একটি দল নোয়াখালীর এসকল বধ্যভূমি দেখে গিয়েছেন। এগুলো সংরক্ষণ করার জন্য কমিটিও করেছিল। পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।

এছাড়া জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়ের চাহিদা অনুযায়ি নোয়াখালীর বধ্যভূমির তালিকা পাঠালেও আজও সংরক্ষনে এগিয়ে আসেনি। দীর্ঘদিনেও বধ্যভূমি সংরক্ষণ না হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

মুক্তি যুদ্ধকালিন ‘সি জোন’ কমান্ডার মো. মোশারেফ হোসেন জানান,‘ যে জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি সে লক্ষ্য আজও অর্জিত হয়নি। আজ মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে লজ্জা লাগে।

তিনি মৃত্যুর পূর্বে মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধিদের বিচার দেখে যেতে চান। অভিলম্বে নোয়াখালীতে শহীদের বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও দু:স্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তার আহবান জানান’।

মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহস ও বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার ১৫জানুয়ারি ১৯৭৩সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ৬৭৬জন মুক্তিযোদ্ধাকে খেতাব দেয়া হয়। তার মধ্যে নোয়াখালী জেলার ৩৭জন। একজন বীরশ্রেষ্ঠ, চারজন বীর উত্তম, ১৩জন বীর বিক্রম ও ১৯জন বীর প্রতীকও রয়েছে।

ইতিহাসে এদিনকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে মাইজদী পিটিআই এর সম্মুখে স্থাপিত হয়েছে নোয়াখালী মুক্ত দিবসের স্মৃতি স্মারক একটি মুক্ত মঞ্চ তৈরি করা হয়।

এমকে