নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ৪৯ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে দেখা গেছে, মোট ৪৯ জনের মধ্যে ৩২ জন (৬৫.৩১%) প্রার্থীর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ কোটি টাকার বেশি। অস্থাবর সম্পদের হিসেবে ২৫ জন এবং স্থাবর সম্পদের হিসেবে ১৪ জন কোটিপতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ৩৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জন (৭২.২২%) কোটিপতি। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫ জন (৫৬%) কোটিপতি। এছাড়া জাগপার একমাত্র প্রার্থীও কোটিপতি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এসব তথ্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় আর্থিক সক্ষমতার গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রার্থীদের গড় বার্ষিক আয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩৮.৭৮ শতাংশ প্রার্থীর আয় ১০ লাখ টাকার বেশি। তবে সরাসরি নির্বাচিত সাধারণ আসনের সংসদ সদস্যদের মধ্যে এই হার আরও বেশি, যা ৬৭.৯ শতাংশ। সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ সংসদের সব সদস্যের মধ্যে ৭৭.৩ শতাংশই কোটিপতি, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্পদশালীদের শক্ত অবস্থানকে নির্দেশ করে।
সম্পদের বিস্তারিত চিত্রে দেখা যায়, কোটিপতি প্রার্থীদের মোট স্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬৬ কোটি টাকা এবং অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭৮ কোটি টাকা। এ দুইয়ের সম্মিলিত পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫২ কোটি টাকা। এছাড়া অন্তত তিনজন প্রার্থীর ১০০ ভরির বেশি স্বর্ণালংকার রয়েছে। এর মধ্যে একজন প্রার্থীর নিজের নামেই ৫০২ ভরি স্বর্ণের তথ্য পাওয়া গেছে, যা ব্যক্তিগত সম্পদের ব্যাপক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
অন্যদিকে ঋণগ্রস্ততার চিত্রও উল্লেখযোগ্য। সংরক্ষিত নারী আসনের ২০.৪১ শতাংশ প্রার্থী কোনো না কোনো ধরনের ঋণের সঙ্গে যুক্ত। দলীয়ভাবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী উভয় দলের প্রার্থীদের মধ্যে ঋণগ্রস্ততার হার সমান, ২২.২২ শতাংশ। তবে সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ঋণের হার আরও বেশি, যা ৫০.৮৪ শতাংশ—সংরক্ষিত আসনের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬৩.৩ শতাংশ স্নাতকোত্তর বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রিধারী, যেখানে সাধারণ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে এই হার ৫০.৭ শতাংশ। এছাড়া ২৭ শতাংশ প্রার্থী স্নাতক, ৪.১ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক পাস, ৪.১ শতাংশ স্বশিক্ষিত এবং ২.১ শতাংশ মাধ্যমিক পাস।
পেশাগত দিক থেকে বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের মধ্যে আইনজীবীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, যা ২৬.৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্যবসা, ২২.৫ শতাংশ। এছাড়া গৃহিণী ১২.২ শতাংশ, শিক্ষক ১০.২ শতাংশ এবং সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ৮.২ শতাংশ প্রার্থী রয়েছেন।
টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থীদের সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানের এই চিত্র দেশের জনমিতিক বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নারী প্রার্থীদের সম্পদের পরিমাণ তাদের স্বামীদের তুলনায় বেশি, যা সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামো বিশ্লেষণে নতুন মাত্রা যোগ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতিবেদন শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং নারী নেতৃত্বের বাস্তব চিত্র বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ভবিষ্যতে প্রার্থী মনোনয়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এমএম