বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহ'র ১২৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়া অসংখ্য লালন ভক্ত-অনুসারীর পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এবং লালন একাডেমির তত্বাবধানে ফকির লালন শাহের গান, বাউলমেলা, অলোচনা সভা ও সাধু সংঘের মধ্য দিয়ে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় তিনদিনব্যাপী চলছে এ স্মরণ উৎসব।

kushtia Lalon Akra - Copy

ভক্ত-অনুসারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচদিনের এই অনুষ্ঠান সংকুচিত করে তিনদিন করা হলেও লালনভক্ত-অনুসারীদের হৃদয়ে যেন ১০ দিনের চেয়েও বেশি অনাবিল আনন্দ দিচ্ছে এবারের লালন স্মরণোৎসব।

উৎসবের পরিধি কমানো হলেও ভক্ত-অনুসারীদের আত্মিক অনুভূতিতে বিন্দুমাত্র কমতি নেই। লালনের ভাব-দর্শনসহ তাঁর মানবসেবার বৈশিষ্ট্যগুলো হৃদয়ে ধারণ করেই তার ভক্ত-অনুসারীরা প্রতিবছরের মতো এবারও এসেছেন আখড়াবাড়িতে।

সাঁইজির মাজারের খাদেম মহম্মদ আলী শাহ বলেন, ১২৯৭ বাংলা সনের ১ কার্তিক, ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর এই আধ্যাত্মিক বাউল সাধক লালন শাহ’র ওফাত হয়।

dসেই থেকে এই তিরোধান দিবসকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর ভক্তরা সাঁইজিকে স্মরণ করতে সমবেত হন। অন্যান্য বারের মত এবছরও আখড়াবাড়ি দেশ-বিদেশ থেকে আগত লক্ষ প্রাণের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে।

তিনি জানান, এই উৎসবে বাউল সাধক, ভক্ত আশেকানদের আখড়াবাড়িতে আসতে যেমন কোনো আমন্ত্রণপত্র লাগে না, তেমনি প্রথার বাইরেও তারা কিছু করেন না।

আত্মার টানে যেভাবে দূর দূরান্ত থেকে এসে মিলিত হয় ঠিক একইভাবে সাধনভজন শেষ করে সাঁইজির মাজার ছেড়ে এসব সাধুরা ফিরে যাবেন নিজ নিজ আশ্রমে।

ইতোমধ্যে উৎসবে দূর-দূরান্ত থেকে লালন ভক্তরা এসেছে। লালন আখড়াবাড়িতে আসা বাউল-সাধুরা একাডেমি ভবনের নিচতলাসহ মূল মঞ্চের আশেপাশে অবস্থান নিয়েছেন।

৪-৫ জনের ছোট ছোট দলে তারা ভাগ হয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে লালনের গানে সুর তুলছেন। জায়গা না পেয়ে অনেক সাধু আশ্রয় নিচ্ছেন মরা কালী নদীর তীরে। গান বাজনায় ভাবময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে মাজারসহ আশপাশের এলাকায়।

লালন ভক্ত ও সাধক ফকির হৃদয় শাহ বলেন, লালন সাধুদের সব কিছুর মূলে গুরু। গুরুকে ভজে তারা পরমাত্মার সন্ধান করেন। সেকারণেই গুরুকে সামনে রেখে নিজস্ব ঘরানায় গোল হয়ে আসন নেন ভক্তরা।

তিনি আরো বলেন, পূর্ণিমাকে ঘিরে দোল পূর্ণিমার অনুষ্ঠান হলেও এবারের প্রয়াণ দিবসেও আকস্মিকভাবেই পূর্ণিমার আবির্ভাব ঘটেছে। তাই লালন ভক্ত-অনুসারীদের হৃদয়ে এ যেন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে।

আত্মিক প্রশান্তি নিয়ে তাঁরা লালন আখড়াবাড়িতে এসে বেশ খুশি। লালন মাজারে বেড়াতে আসা দর্শনার্থী নাজমা সুলতানা জানান, লালন আখড়ায় এসে অন্যবারের চেয়ে বেশ খুশি লাগছে। এবার লালন স্মরণোৎসবকে আরো প্রাণবন্ত করেছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে আসা বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত মারিও পালমা। তাঁরা খুশি এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পেরে।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার কালী নদীর তীরেই লালন স্মরণোৎসব উপলক্ষে বসেছে লালন মেলা। রাতে লালন মঞ্চে চলছে সাঁইজির জীবনকর্ম নিয়ে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. জহির রায়হান জানান, স্মরণোৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মরমি সাধক লালনের জীবনকর্ম, জাতহীন মানব দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনার আদর্শিক বিষয় নিয়েই চলে আসছে প্রতিবছর এ স্মরণোৎসব। বাংলা ১২৯৭-র পয়লা কার্তিক ইংরেজি ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ সালে কুষ্টিয়া শহরতলির ছেঁউড়িয়ার লালন সমাধি প্রাঙ্গণে মরমি সাধক ফকির লালন শাহর শেষ শয্যা রচিত হয়। এর পর থেকেই প্রতিবছর তাঁর তিরোধান দিবস পালিত হয়ে আসছে।

এসএম/ সবুজ