শুক্রবার ভোর ৫টা। তখনো ভোরের আলো ফোটেনি। শহরের পৌরসভার পাশে নূরানী জর্দা কারখানার সামনে হাজারো মানুষের ভীড়। অনেক আশা নিয়ে শহরের ও আশপাশের উপজেলার দরিদ্র পিড়িত মানুষগুলো এসেছে যাকাতের কাপড় নিতে। কে জানতো তখন একটা যাকাতের কাপড় নিতে এসে ফিরতে হবে লাশ হয়ে? কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুরু হলো লাশের মিছিল।
ঘটনাস্থলে গিয়ে পাওয়া যায় ঘটনার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ময়মনসিংহের তারাকান্দা থানার অইরাগাই গ্রাম থেকে আসা আম্বিয়া বেগমকে। এইবারই নতুন নয় গত ৪ বছর ধরে তিনি যাকাত নিচ্ছেন নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরির মালিক শামীম তালুকদারের কাছ থেকে।
কিন্তু কখনো এবারের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। শুক্রবার ভোরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে শতাধিক নারী-পুরুষের মধ্যে তাকেও লাঠি পেটায় দারোয়ান ও কর্মচারীরা। দারোয়ানের পিটুনিতে পায়ে খানিকটা আঘাতও পান তিনি। হাত দিয়ে পায়ের সেই আঘাতের চিহ্ন দেখাচ্ছিলেন আম্বিয়া বেগম।
তার ভাষ্যমতে, ‘৪ বছর ধইরা এই বাসা থাইক্যা কাপড় নিতাছি। ইবারের (এবার) মতো অতো গণ্ডগোল আর কোনো দিন অইছে না। বড় গেটে ঢুকার লেইগ্যা চেষ্টা করছিলাম। এ লেইগ্যা দারুয়ানের কয়েকটা লাডির বাড়ি খাইয়া আর ভিড়ের মধ্যে গেছি না। পরে গেইট থেইক্কা দূরাফি (দূরে) আইয়া পড়ছিলাম’।
ঘটনাস্থলে আলাপকালে আম্বিয়া বলেন, ‘ফজরের আজানের পরই জর্দ্দা (জর্দা) ফ্যাক্টরির ছুডু (ছোট) গেইট খুইল্যা দেয়। এক সাথে অনেক মানুষ পিড়াপিড়ি কইরা ঢুহে। আতকা মাইরা (হঠাৎ) মালিকের লোকজন লাডি (লাঠি) দিয়া এমুন পিডানি শুরু করে তখন মানুষ একজন আরেকজনের উপরে গিয়া পড়ে। আর তহুনি পাড়াইয়া মানুষ মানুষরে মাইরালছে। পরে যহন চিক্কার হুইন্ন্যা মালিক বড় গেইট খুলে অতক্ষণে সব শেষ অইয়া গেছে।’
সাধারণ যাকাতের কাপড়ের জন্য অহেতুক এত মানুষের প্রাণহানি কোন ভাবেই সইতে পারছেন না ময়মনসিংহবাসী। যাকাতদাতা নূরানী জর্দা কারখানার মালিক মো. শামীম তালুকদারকেই এ ঘটনায় দায়ি করছেন সবাই। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা ও যাকাত প্রার্থীদের হুড়োহুড়িকেও দায়ী করেন অনেকে।
এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আরো কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, প্রায় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ভিড় করেছিলেন যাকাতের কাপড়ের জন্য। গেট খুলতেই হুড়োহুড়ি করে ভেতরে ঢোকার সময়ই কমপক্ষে শতাধিক মানুষ পদপিষ্ট হন। আগে যদি যাকাতদাতা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহন করতো তাহলে এ মর্মান্তিক দূর্ঘটনা কখনই ঘটতো না।
এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে গিয়ে দেখা গেলো আরও হৃদয় বিদারক দৃশ্য। বারান্দায় সারি সারি লাশ। লাশকে সামনে নিয়ে স্বজনদের আহাজারি। আহাজারিতে ভারী হয়ে যাচ্ছিলো ময়মনসিংহের আকাশ-বাতাস। লাশ সনাক্ত হওয়ার পর স্তব্ধ শরীরে একে একে নিয়ে যাচ্ছেন লাশ কাঁধে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, যাকাতের কাপড় দেয়ার জন্য এক সপ্তাহ ধরে কার্ড বিলি করেন কারখানার মালিক শামীমের লোকজন। শহরের বিহারি ক্যাম্প ও থানাঘাটসহ শহরের বিভিন্ন বস্তির গরিব ও দুস্থদের মাঝে এ কার্ড বিতরণ করা হয়। যাকাতের কাপড় বিতরণের জন্য কারখানা ও বাসার সামনে শুক্রবার দিন ধার্য করা হলে এ সংবাদটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকেই ফুলবাড়ীয়া, ঈশ্বরগঞ্জ, মুক্তাগাছা, তারাকান্দাসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে কয়েকশ' নারী-পুরুষ ভিড় করেন কারখানার সামনের গেট ও সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। সেহরির পর শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কয়েক হাজার লোক জড়ো হয় সেখানে।
প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতের স্বজন ও আহতরা জানান, হঠাৎ করে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে খুলে দেয়া হয় কারখানায় প্রবেশের ছোট গেটটি। গেটের সামনে বসেছিলেন কমপক্ষে ৩ থেকে ৪শ' মানুষ। বেশিরভাগই ছিলেন বৃদ্ধ পুরুষ, নারী ও শিশু। আর তাদের পেছনে ছিলেন হাজারেরও অধিক মানুষ। হঠাৎ করেই ছোট গেটটি খুললে শুরু হয় ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কি। এতে সামনে বসে থাকা কমপক্ষে শতাধিক মানুষ পদদলিত হন। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ১৫ জন। আহত হন কয়েকশ' মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছরই জাকজমক ভাবেই যাকাত দেন নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরির মালিক। এমন মর্মান্তিক র্দূঘটনার বিষয়ে তারা বলেন, এত বড় একটা কাজে মালিকের অবশ্যই সচেতন হওয়া দরকার ছিল। তারা যখন দেখলো এত মানুষ জড়ো হয়েছে তখন অবশ্যই প্রশাসনের যাকাত বিতরণে সাহায্য নেয়া দরকার ছিল মালিকের। মালিকের অসচেতনতা, অব্যবস্থাপনা, নূন্যতম নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কারণেই এতগুলো প্রাণ ঝরলো।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, কারখানার মালিক শামীমের অসচেতনতাই এ ট্র্যাজেডি’র অন্যতম প্রধান কারণ। আমরা জানতে পেরেছি তিনি যদি ছোট গেটের বদলে বড় গেটটি খুলে দিতেন তবে অনাকাঙ্খিত এ ঘটনা ঘটতো না।
তিনি আরও জানান, কার্ড বিলি করে যাকাত দেয়ার এ খবর পুলিশ প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের জানাননি মালিক। পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ ব্যাপারে ফ্যাক্টরীর মালিক শামীম তালুকদার বলেন, আমরা ৬শ'র মতো যাকাতের শাড়ী বিতরণের জন্য কার্ড দিয়েছি। বাকীরা শুনে এসেছেন। কিন্তু এতো লোক সমাগম হবে তা ভাবতে পারিনি। আর আমাদের কর্মচারীরা কাউকে পিটায়নি। প্রধান ফটকে জটলা কমাতে এরা যাকাত নিতে আসাদের দূরে থাকতে বলেন।
পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, যাকাতে এতো লোম সমাগম হবে অথচ পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হয়নি। এটা ঠিক হয়নি তাদের।
এদিকে নিহতদের পরিবারে চলছে এখন শোকের মাতম। কেউ মা, কেউ স্ত্রী অথবা সন্তানকে হারিয়ে নির্বাক স্বজনরা। প্রতিটি বাড়ীতে চলছে স্বজন হারোনোদের আহাজারি।
ওএইচ/ এআর





