সুন্দরবনের শ্যালা নদীতে তেলভর্তি জাহাজডুবিতে যে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তার দায় এড়াতে পারে না বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। কারণ তারাই বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে পৃথিবীর এই একমাত্র ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর দিয়ে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের অনুমিত দিয়েছে।
সমুদ্রবন্দর মংলার সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পণ্য পরিবহনকারী নৌযানগুলোর চলাচলের বৈধ পথ মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যানেলটি (সংক্ষিপ্ত নৌপথ) নাব্যতা সঙ্কটে পড়ায় ২০১১ সালের নভেম্বর থেকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল শুরু হয়।
বিআইডব্লিউটিএ বন ও বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন- ২০১২ এর ৩০নং ধারা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫ সংশোধন)-২০১০ লঙ্ঘন করে অনুমতি দেয়। ফলে সন্ন্যাসী-রায়েন্দা-বগী-শরণখোলা-দুধমুখী-হরিণটানা-আন্ধারমানিক-মুগমারী-চাঁদপাই-জয়মণিরগোল হয়ে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে মংলা বন্দর অভিমুখে নৌ চলাচল শুরু হয়।
অথচ এই নৌপথের দুই পাশ হরিণটানা, বগী, চাঁদপাই, জয়মণিরগোল এলাকাটি হরিণ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম বিচরণক্ষেত্র। এই এলাকা পৃথিবীর সবচেয়ে কম জায়গায় সবচেয়ে বেশি রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিচরণের জন্য বিখ্যাত। এই পথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড়শ জাহাজ ও কার্গো যাতায়াত করায় সেখান থেকে বন্যপ্রাণী অন্যত্র চলে যেতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেন।
সুন্দরবনের ভৌগলিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় নিয়ে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটি তখনই এর তীব্র প্রতিবাদ করে। তেল-গ্যাস, বিদ্যুৎ-বন্দর ও খনিজ সম্পদ রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আশীষ কুমার দে ২০১১ সালের ১২ ডিসেম্বর একপত্রে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ খনন প্রকল্পের মাধ্যমে মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথ সচল ও সুন্দরবনের অভ্যন্তরে নৌ চলাচল বন্ধের জন্য বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা খন্দকারকে অনুরোধ জানান। ওই চিঠির অনুলিপি নৌমন্ত্রী, পরিববেশ ও বনমন্ত্রী, নৌসচিব, পরিবেশসচিব, প্রধান বন সংরক্ষক ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককেও দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক আশীষ কুমার দে ২০১২ সালের ১৩ মে নৌমন্ত্রী বরাবর পুনরায় চিঠি লেখেন এবং একই অনুরোধ জানিয়ে লেখা চিঠির অনুলিপি অন্যদের পাঠান।
কিন্তু পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন বিভাগ এ বিষয়ে তৎপর হলেও নৌমন্ত্রীর চরম উদাসীনতা এবং বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা খন্দকারের সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা, দায়িত্বহীনতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও খামখেয়ালিপনার কারণে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌ চলাচল বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
অথচ তেলবাহী জাহাজডুবিতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের তিন দিন পরেও শাসুদ্দোহা খন্দকারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।
ত্রুটিপূর্ণ নৌযানের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয়া
নিমজ্জিত জাহাজ ওটি সাউদার্ন ২০০৩ সালে নির্মিত হলেও এর অবকাঠামো সাড়ে তিন লক্ষাধিক লিটার জ্বালানি বহনের মতো মজবুত নয় বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এছাড়া নির্মাণের পর থেকে দ্বিতীয়বার ডকিং (ডকইয়ার্ডে সংস্কার) না করানোর ফলে জাহাজটিতে ছোট-খাটো অনেক ত্রুটি দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মো. মুঈনউদ্দিন জুলফিকার গত ২৭ ফেব্রুয়ারি নৌযানটির অনুকূলে ফিটনেস সনদ দিয়ে চলাচলের সুযোগ করে দেন। তবে নৌযানটির ত্রুটি সম্পর্কে কথা বলার জন্য মালিকপক্ষের সঙ্গে মোবাইলে ফোনে চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এই দুর্ঘটনার ১৫ দিন আগে ২৪ নভেম্বর একই নদীতে দুর্ঘটনাকবলিত হয় সুন্দরবনের পর্যটক পরিবহনের কাজে ভাড়ায় চালিত যাত্রীবাহী নৌযান এমভি শাহীদূত। ওই লঞ্চটিরও ফিটনেস দিয়েছিলেন সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মো. মুঈনউদ্দিন জুলফিকার। মারাত্মক ত্রুটিপূর্ণ নৌযানটি ফিটনেস দেয়ার চার দিনের মাথায় তলা ফেটে সেটি নদীতে নিমজ্জিত হয়। গত ১৮ দিনেও নৌযানটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
সূত্র: বাংলামেইল
জেএ





