সম্প্রতি ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এক হামলায় ১৯ ভারতীয় সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় বেশ কয়েকদিন ধরেই যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই চিরবৈরী প্রতিবেশীর মধ্যে। ভারতের সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী এবং পাকিস্তানের কাছের প্রতিবেশী হিসেবে এই দুই পারমানবিক শক্তিধর দেশের উত্তেজনার খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন।

সবশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী ১৯ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর কয়েক দফা গোলাগুলিতে এ পর্যন্ত অন্তত দুই পাকিস্তানি সেনা এবং আরো আট ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া পাকিস্তানি সেনাদের হাতে অপর এক ভারতীয় সেনা আটক হওয়ার কথাও জানা গেছে দুই দেশের তরফ থেকেই।

এদিকে, ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মীর এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রন লাইন বরাবর ভারী অস্ত্রসহ ভারত ও পাকিস্তানের সেনা মহড়া ও পরস্পরবিরোধী হুমকি ধমকির খবর প্রতিদিনই শিরোনাম হচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। নিয়মিত বিরতিতে গোলাগুলির খবরও আসছে হরহামেশা।

এমনই পটভূমিতে, রোববার (২ অক্টোবর ২০১৬)  বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  মতামত জানতে চান।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন এটা ভারত ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তারা দুই দেশ বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করুক বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।

এমনকি অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বিরূপ মন্তব্যের পরও দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে। দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক চলবে, ঝগড়াঝাঁটিও চলবে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত শক্তি। তাদের পছন্দের লোকদের বিচার হচ্ছে। তাই তারা তো কাঁদবেই।

তিনি বলেন, ‘দুটি দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকে। মতভিন্নতাও থাকতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বিচার (যুদ্ধাপরাধের) চলছে। পাকিস্তান মন্তব্য করছে, আমরা এর জবাব দিচ্ছি। দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক চলবে, ঝগড়াঝাঁটিও চলবে।’

পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাষায় বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না। যুদ্ধ হলে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও বাধা সৃষ্টি হবে। আমরা চাই দুই দেশ নিজেরাই তাদের সমস্যার সমাধান করুক।’

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর মাত্র একদিন পেরুতেই তার অবস্থানের প্রায় বিপরীতমুখী অবস্থানে গিয়ে বক্তব্য রাখলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি ঘোষণা দিলেন, ভারত আক্রান্ত হলে পাশে থাকবে বাংলাদেশ।

মঙ্গলবার (৪ অক্টোবর ২০১৬)  সচিবালয়ে গণমাধ্যম কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক’ বিষয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএসআরএফ) সংলাপ অনুষ্ঠানে মন্ত্রী বাংলাদেশের এমন অবস্থানের কথা জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান যদি ভারতে আক্রমণ চালায়, তাহলে বাংলাদেশ ভারতের পাশে থাকবে। কারণ ভারতে সফরের সময় আমি এ আশ্বাসই দিয়েছিলাম।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- প্রধানমন্ত্রী যেভাবে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে থেকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধাবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান পরিস্কার করলেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিলেন- সেটা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুনতে পাননি? অথবা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে গিয়ে সেখানে যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন সেটা কি প্রধানমন্ত্রী জানতেন না? অথবা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি প্রধানমন্ত্রীর মতামত না নিয়েই যুদ্ধের মতো ভয়াবহ ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে কোন দেশকে প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন?

এদিকে, পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাওয়াজা মুহম্মদ আসফি পরোক্ষ হুমকি দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে পরমাণু বোমাও ছুঁড়তে পারেন তারা!

এ হুমকির পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পাকিস্তান পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়লে কী হতে পারে? ভারতের কোন কোন শহর পাকিস্তানের পরমাণু বোমার টার্গেট হতে পারে? এতে বাংলাদেশের  কোন ক্ষতি হবে কি না? ক্ষতি হলে আমাদের কোন এলাকায় ক্ষতি হবে?  আমাদেরই বা করণীয় কি?

অপরদিকে, একটি পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে ভারতের প্রভাবশালী হিন্দি দৈনিক জাগরণের এক খবরে বলা হয়েছে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধ হলে তার আওতায় আসতে পারে কলকাতাও। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বেশ কিছু জেলা। বাংলাদেশের সাতক্ষিরা, যশোর, খুলনা ও চুয়াডাঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি জেলা পরমাণূ বোমায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এমন বাস্তবতায় দেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এ ধরনের ম্পর্শকাতর ইস্যুতে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে আর যেন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শোনা না যায়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের স্বার্থে সরকারের অবস্থান পরিস্কার করে এ ব্যাপারে সমন্বিত এবং সতর্ক বক্তব্যও কামনা করছেন দেশের মানুষ।

কেবি