নড়াইলের কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজেই রোগি। নানা ধরনের সংকট সমস্যা নিয়ে চলছে এ স্বাস্থ্য সেবা কমপ্লেক্স। দু’টি থানার প্রায় ৩ লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র আশ্রয় স্থল এটি। চিকিৎসক সংকট থাকায় ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য সহকারিদের নিকট থেকে। উপজেলার একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৪জন চিকিৎসক। ১জন রয়েছেন মাতৃত্বজনিত কারণে ছুটিতে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ৩৫জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও ৩১টি পদই ধীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। চিকিৎসক সংকট থাকায় প্রতিদিন আউটডোরের শত শত রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন স্বাস্থ্য সহকারীরা। সরেজমিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। শুধু তাই নয় গাইনি ও এ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক না থাকায় গত এক বছর ধরে গর্ভবতী নারীদের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। প্রসুতি ও গর্ভের সন্তান নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রভাষ কুমার দাসকে শাস্তিমুলক বদলি করা হয়েছে। তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি করা হয়েছে। গত ১৬ এপ্রিল তাকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিধি বহির্ভূতভাবে একেরপর এক শৃংখলা ভঙ্গ হচ্ছে। যে কারণে শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রেই নয়, প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। কর্মচারীদের অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের পদে পদে হয়রানির হতে হচ্ছে। এর বাস্তবচিত্র দেখলে মনে হবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি নিজেই যেন বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির রোগে আক্রান্ত। নার্স বা অন্য কোন কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তা তদন্তে প্রমানিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়না । এ কারনে অনিয়ম ও দুনীতি ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে।

স্মারক নং উস্বাক/কা/নড়া/২০১৬/১৬৯৬ তাং-০৮নভেম্বর’১৬ সুত্রের আলোকে ডাঃ তুষার কুমার পোদ্দার(সভাপতি ),বিদিশা রানী রায়-নার্সিং সুপার ভাইজার (সদস্য সচিব),ডাঃ মহসীন আল-নূরী (সদস্য),তদন্ত কমিটি একটি তদন্ত প্রতিবেদন ২৬ ডিসেম্বর’১৬ তারিখে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কালিয়া নড়াইল এর নিকট জমা দেন। নার্স বিভারানী দাস ও বুলু রানীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে প্রমানিত হলেও তাদের বিরূদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তারা লিখিতভাবে অপরাধ স্বীকার করলেও (অপরাধীরা) বহাল তবিয়তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাম-রাজত্ব কায়েম করে চলেছেন।

২০০৮ সালে কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়। অথচ ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে ৩১ শয্যার । চার বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে একমাত্র এক্স-রে মেশিনটি। একবছর আগে আসা আল্ট্রাসনো যন্ত্রটিও শুরু থেকেই অচল বলে রোগীদের অভিযোগ।

১১টি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদের মধ্যে সবকটি পদ শুন্য রয়েছে। চিকিৎসক-সংকটে জরুরি বিভাগ ও বর্হিবিভাগে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ১৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১৪টি। এর একটিতে একজন চিকিৎসক আছেন, তিনিও রয়েছেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে।

কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সুত্রে জানা যায়,স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বর্তমানে ৪ জন চিকিৎসক কাগজ কলমে থাকলেও আছেন মাত্র ৩ জন। এ ৩ জন চিকিৎসক পালাক্রমে ২৪ ঘন্টা করে জরুরী বিভাগে নিয়োজিত থাকেন। যে কারণে স্বাস্থ্য সহকারিরদের নিকট থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীর । অপর দিকে গাইনী বিভাগে চিকিৎসক না থাকায় গত একবছর যাবৎ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেটিতে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। কেউ আসলেও তাকে চিকিৎসক না থাকার ওজুহাতে খুলনাসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন বলে জানা যায়। দন্ত বিভাগের সব কিছু থাকা সত্বেও সংশ্লিষ্টদের অবহেলার কারণে দন্ত বিভাগ নেই। দীর্ঘদিন অত্র উপজেলায় দন্ত রোগীরা দন্ত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।যার কারণে দিনদিন অত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীর সংখ্যা কমে আসছে। দন্ত বিভাগের চেয়ারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি যত্নের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একজন দন্ত টেকনিশিয়ান থাকলেও তিনি অন্যত্র বসে মাতৃত্বকালীন মহিলাদের দাফতরিক কাজ কর্ম করেন।

এ উপজেলায় ৫০শয্যার একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, একটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং ১৩টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। এগুলোতে ৩৫ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৩জন ।

চিকিৎসক-সংকটে সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অত্র উপজেলার রোগীরা।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্হিবিভাগের কর্মরত ফার্মাসিস্ট আশিস বাগচী জানান, বর্হি বিভাগে প্রতিদিন ১৮০-২৫০ জন রোগী হয়। এর মধ্যে তিন ভাগের দুই ভাগই নারী। মঙ্গলবার (১৮এপ্রিল) ১১০ জন নারী এবং ৬১জন পুরুষ এবং ১৩জন পুরাতন রোগী সর্বমোট ১৮৪ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

চিকিৎসক সংকটের কারণে ৩ জনকে একদিন পরপর ২৪ ঘন্টা জরুরী বিভাগে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই আউটডোরের রোগীসহ অন্য রোগীদের সঠিক সেবা দিতে পারছেন না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা বাকা গ্রামের হুম মোল্যা ও বাঐসোনা গ্রামের জাহাঙ্গীর মোল্যা জানান, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক নেই তাই তারা রোগী নিয়ে খুলনা বা অন্যত্র যাবেন। সরকারি এ্যম্বুলেন্সটি নড়বড়ে যার কারণে অন্য ব্যবস্থার কথা ভাবছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মচারি জানান,হঠাৎ করেই কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চিকিৎসকরা উধাও হয়ে গেছে। তিনজন চিকিৎসকের পক্ষে রোগীদের সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিধায় রোগীরা অন্যত্র চলে যেত বাধ্য হচ্ছেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার গোপাল চন্দ্র জানান, অ্যাম্বুলেন্সটির বয়স ১৫ বছর। তাই নড়বড়ে অবস্থা।

কালিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শাহেদুর রহমান সাগর (চলতি দায়িত্ব)বলেন,‘গাইনী বিভাগের কোন চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা দেয়াসহ সিজারিয়ান করা সম্ভব হচ্ছেনা। চিকিৎসক সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সহকারিদের কাজে লাগানো হচ্ছে।’

নড়াইলের সিভিল সার্জন আমিন আহম্মেদ খান বলেন,‘চিকিৎসক-সংকট ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় অস্ত্রোপচারসহ জটিল রোগিদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’#

রিন্টু/জারিফ