সিরাজগঞ্জের ভাঙন কবলিত চৌহালী উপজেলা ত্রাণ অফিস দূর্নীতির আখড়ায় পরিনত হয়েছে। উপজেলার গ্রামীন অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার, রক্ষনাবেক্ষন, গরিব দুঃস্থ্যদের কর্মসংস্থান ও প্রত্যন্ত এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন প্রকল্পগুলো কাগজ কলমে আছে, বাস্তবে অনেক প্রকল্পের কোন অস্তিত্ব নেই।

গত ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে টিআর’ কাবিখা, কাবিটার ২৬৬টি প্রকল্পে ৪৬১ টন চাল এবং নগদ এক কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। গত জুন মাসে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত সমুদয় চাল ও টাকা উত্তোলন করে সিংহভাগই ভাগবাটোয়ারা করে নেয়া হয়েছে। ফলে সরকারের নেয়া এসব উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সুফল থেকে ভাঙন কবলিত চৌহালীবাসী বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

চৌহালী উপজেলা ত্রাণ অফিসের প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১৫-১৬ইং অর্থ বছরে সরকার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, গরিব দুঃস্থ্যদের কর্মসংস্থান ও প্রত্যন্ত এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ পৌছে দেয়ার উদ্দ্যেশ্যে কাবিখা প্রথম পর্যায়ে ১১টি প্রকল্পের জন্য ১৪১ দশমিক ৭৭৬৫ টন চাল, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৮টি প্রকল্পের জন্য ৭০ দশমিক ৮৮৮ টন চাল, এমপি’র বরাদ্দকৃত ২য় কিস্তির ৪টি প্রকল্পের জন্য ৩৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা, কাবিটা সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প দ্বিতীয় পর্যায় ৮টি প্রকল্পের জন্য ২০ লাখ ৬৯ হাজার টাকা, টিআর প্রথম পর্যায় ৬৭টি প্রকল্পের জন্য ১২৮ দশমিক ২২৮৮ টন চাল, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৭টি প্রকল্পের জন্য ১৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা, সোলারের ৫৬টি প্রকল্পের জন্য ১৮ লাখ ৭১ হাজার টাকা, এমপি’র বরাদ্দকৃত প্রথম পর্যায়ে ৩৯টি প্রকল্পের জন্য ১২০ টন চাল, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫৬টি প্রকল্পের জন্য নগদ ৩৪ লাখ ৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। বরাদ্দকৃত প্রায় এক কোট ৪৭ লাখ টাকা মূল্যের ৪৬১ টন চাল এবং নগদ এক কোটি ২৫ লাখ টাকা ৩০ জুনের মধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে।

অভিযোগে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকল্পের ডিও লিটারে স্বাক্ষরের পর তা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার হাত হয়ে চাল ব্যবসায়ীদের কাছে চলে গেছে। সরকার প্রতিটন যে চাল ৩২ হাজার টাকায় ক্রয় করে, সেই চালই টিআর কাবিখা প্রকল্পের ডিও বিক্রিতে প্রতি টনের দাম দেয়া হয়েছে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রতি টনে সরকারি হিসেবে ১৭ হাজার টাকা করে কম দেয়া হয়েছে। এভাবেই চাল ব্যবসায়ীরা ডিও কেনা-বেচায় ৮০ লাখ টাকা কমিশন হাতিয়ে নিয়েছে। এই কমিশন বানিজ্যে থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ভাগ পেয়ে থাকেন।

এছাড়া যেসব প্রকল্প কাগজ-কলমে আছে, বাস্তবে নেই সেই সব প্রকল্পগুলো অফিসিয়ালি বাস্তবায়ন দেখিয়ে বরাদ্দের অর্ধেক ভাগ নেন। ফলে চৌহালীর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, গরিব দুঃস্থ্যদের কর্মসংস্থান ও প্রত্যন্ত এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ পৌছে দেয়ার উদ্দ্যেশ্যে ভেস্তে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌহালী কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকে উপজেলা ত্রাণ অফিস দূর্নীতর আখড়ায় পরিনত করেছেন। অফিসে সব সময় দালাল বেষ্টিত হয়ে থাকেন। এর প্রতিবাদ করলে দালালদের মাধ্যমে মস্তান লেলিয়ে দেয়া হয়। ফলে ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পান না। চৌহালী উপজেলা দূর্গম এলাকায় হওয়ায় উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের উন্নয়ন মূলক কাজে কোন তদারকি নেই।

এ কারণে এই উপজেলায় ভূয়া প্রকল্পের ছড়াছড়ি। উপজেলায় ত্রাণ বিভাগের অধীনে বিগত তিন বছরে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে, তার শতকরা ৯০ ভাগই ভূয়া। সংশ্লিষ্ট উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা সরেজমিন তদন্ত করলেই দূর্নীতি ও অনিয়মের এই ভয়াবহ চিত্র স্বচখে দেখতে পাবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

খাষকাউলিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম গনি মোল্লা (০১৭১৪-৮০৭৩৭৫) অভিযোগে করেন, মিয়াপাড়া কবরস্থান সংস্কারে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা, খাসকাউলিয়া মধ্যজোতপাড়া বাদশার বাড়ীর সামনের খাল ভারাট করে রাস্তা নির্মাণে তিন লাখ ৭৬ হাজা ৭৮৯ টাকা, জনতা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে মাটি ভরাটে তিন লাখ টাকা, চরনাকালিয়া তালুকদারে বাড়ীর জামে মসজিদ হতে শাহাদতের বাড়ী পর্যন্ত রাস্তা নির্মানে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এই প্রকল্পগুলোর কাজ না করে টাকা আত্মসাত করা হয়েছে।

এছাড়া চৌহালী ডিগ্রী কলেজ দক্ষিণ গেট ৮৮ হাজার ২৫২ টাকা একই কলেজের পশ্চিম গেট ৮৮ হাজার ২৫২ টাকা, জোতপাড়া বাজারের পশ্চিমের মোড় ৮৮ হাজার ২৫২ টাকা, একই বাজারের উত্তরের মোড়ে ৮৮ হাজার ২৫২ বরাদ্দ দেয়া হয়, কি কাজের জন্য এই টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল তা তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ ভূয়া প্রকল্প দেখিয়ে টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। এ ধরনের অস্তিত্বহীন আরো অনেক প্রকল্প রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, চৌহালী উপজেলার খানকা শরীফের সভাপতি ও সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাও. আশরাফ আলী গত অর্থ বছরে তার প্রতিষ্ঠানের নামে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের কথা শুনে আৎকে ওঠেন। তিনি বলেন, বিগত ২ বছরে তার প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নের জন্য কোন টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়নি। খানকা শরীফের নামে বরাদ্দ ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন এবং আত্মসাতের সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানান।

কুরকী সড়ক ও কবরস্থানের দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন কাজ হয়নি। বাঘুটিয়া ইউপি’র চরছলিমাবাদ ময়নাল সরকার কবরস্থান সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য বরাদ্দ ৬২ হাজার টাকার আত্মসাত করা হয়েছে। কিছু কিছু প্রকল্পে পুরনো সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। আবার একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দ চাল টাকা লুটপাট করা হয়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, একই অর্থ বছবে ১ম পর্যায়ে ধুলিয়াবাড়ী জামে মসজিদ উন্নয়নে চার টন চাল, ধুলিয়াবাড়ী সোলার প্যানেল স্থাপনে দুই টন চাল, ২য় পর্যায়ে ধুলিয়াবাড়ী জামে মসজিদে সোলার প্যানেল স্থাপনে ৩১ হাজার ৬০০ টাকা, মহেশপুর জামে মসজিদে সোলার প্যানেল স্থাপনে এক টন চাল, মহেশপুর জামে মসজিদে সোলার প্যানেল স্থাপনে নগদ ৩১ হাজার টাকা, খামারগ্রাম কালিমন্দিরে সোলার স্থাপনে দুই টন চাল একই মন্দিরে সোলার প্যানেল স্থাপন ও উন্নয়নে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এভাবেই একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক প্রকল্প দেখিয়ে বরাদ্দের টাকা ও চাল লুটপাট করা হয়েছে।

এছাড়া কাবিখা ১ম পর্যায়ে খাষকাউলিয়া আর আর কে দাখিল মাদরাসার মাঠে মাটি ভরাট ও সোলার প্যানেল স্থাপন ১৩ টন, দক্ষিন খাষকাউলিয়া জামে মসজিদে সোলার প্যানেল স্থাপন ও কবরস্থানে মাটি ভরাট, ১৩ টন, টিআর ১ম পর্যায়ে পূর্ব খাষকাউলিয়া জার্মান রাস্তা হইতে নদীর ঘাট পর্যন্ত রাস্তা মেরামত এক টন, খাষাকাউলিয়া মহিলা ফাজিল মাদরাসায় উন্নয়ন ও সেঅরার প্যানেল স্থাপন সাত টন, মঞ্জুর কাদের মহাবিদ্যালয় মাঠে মাটি ভরাট সাত টন, কোদালিয়া বক্কারের বাড়ী হইতে মাহফুজ মাষ্টারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ও সোলার প্যানেল স্থাপন চার টন, ২য় পর্যায়ে খাষকাউলিয়া মহিলা ফাজিল মাদরাসা উন্নয়ন এক লাখ টাকা, খাষকাউলিয়া মহিলা ফাজিল মাদরাসা সোলার সরবরাহ ও উন্নয়ন তিন টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রকল্পগুলোতে দৃশ্যমান কোন কাজই হয়নি।

অন্য প্রকল্পগুলোতেও লুটপাট হয়েছে। স্থানীয় শিক্ষক আলী আকবার বলেন, সরকার গ্রামীণ জনগোষ্ঠির উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেয়া চাল ও নগদ টাকা স্থানীয় কিছু টাউট ও পিআইও রেজাউল করিম পরস্পরের যোগসাজসে লুটপাট করায় চৌহালী উপজেলার দৃশ্যমান কোন উন্নয়ন হয়নি।

চৌহালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিমের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন গ্রহনের কথা অস্বীকার করেন। এ বিষয়ে সুনিদৃষ্ঠ তথ্য উপস্থাপন করা হলে, তালিকা না দেখে কিছু বলা যাবে না বলে জানান। চৌহালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার রেজাউল বারী প্রকল্প কাজে অনিয়ম দূর্নীতি অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলেই বিস্তারিত জানানো হবে।

এসএ