'ভোর ৫টায় নদীতে গিয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত মাত্র ৫টি মাছ পেয়েছি। ঘাটে এসে ওই মাছ বিক্রি করে পেয়েছি মাত্র ১৮শ' টাকা। সারাদিন জাল বেয়ে তেলসহ অনান্য খরচ হয় দেড় হাজার টাকা। ৪ জনকে ভাগ ৫০০ টাকা ভাগ করে দিয়ে মাত্র দেড়শো টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এ টাকা দিয়ে কিভাবে চাল-ডাল কিনবো আর কিভাবে এনজি’ওর ঋন পরিশোধ করবো। '
নদীতে ইলিশ সংকট নিয়ে এ কথাগুলোই বলছিলেন ভোলা সদরের মিল বাজার এলাকার তিরিশ বছর বয়সী জেলে বিল্লাল মাঝি। শুধু বিল্লাল মাঝি নন, তার মত একই অবস্থা নিজাম, রহিম ও ইব্রাহিমেরসহ আরো অনেকের এখন। কারণ ইলিশ মৌসুমে নদীতে ইলিশ শূন্যতা দেখা দেয়ায় দুশ্চিন্তগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন তারা।
ভরা মৌসুমেও ইলিশ মিলছে না ভোলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীতে। সারাদিন জাল নৌকা ও ট্রলার নিয়ে খালি হাতে ফিরছেন জেলেরা। এতে জেলে পরিবারে দেখা দিয়েছে দুর্দিন।
অন্যদিকে ইলিশ সংকটের মধ্যে আসন্ন ঈদ কিভাবে কাটাবেন সে চিন্তায় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন তারা। এ অবস্থায় জেলে পূন:বাসনের কোন ব্যবস্থাও নেই। ফলে অভাব অনাটনের মধ্যে কাটছে তাদের দিন।
তবে মৎস্য বিভাগ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে ইলিশের সিজন পরিবর্তন হওয়ায় নদীতে ইলিশ পেতে বিলম্ব হচ্ছে।
ভোলার উপকূলীয় মৎস্য অবতরন কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে জেলে ও মৎস্য জীবীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রকৃতিকগত ভাবে জৈষ্ঠ্য থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও ভোলার জলসীমায় পাওয়া যাচ্ছে না ইলিশ। জাল আর নৌকা নিয়ে নদীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ইলিশ পাওয়ার আশায় ঘুরে বেড়ালেও পাচ্ছেন না তারা কাঙ্খিত পরিমাণ মাছ।
এতে কিভাবে সংসার চালাবেন আর দাদনের ঋর পরিশোধ করবেন সে চিন্তায় অস্থির জেলেরা। ইলিশ সংকটের মধ্যে আবার ঈদ ঘনিয়ে আসায় ঈদের কেনাকাটা আর পরিবার পরিজনকে দু’মুঠো ভালো খাবার তুলে দেয়ার চিন্তার ছাপ তাদের চোখে-মুখে।
মৎস্যঘাট ঘুরে দেখা গেছে, ইলিশ মৌসুমকে কেন্দ্র করে জেলেদের মধ্যে ইলিশ ধরার ব্যাপক প্রস্তুতি। জাল ও নৌকা নিয়ে নেমে পড়ছেন জেলেরা। কিন্তু নদীতে গিয়েই মলিন হয়ে যাচ্ছে মুখ। কারণ যে পরিমান মাছ পাওয়ার কথা সে পরিমাণ মাছ নেই নদীতে।
১৯ বছর বয়স থেকে নদীতে মাছ শিকার করে আসছেন জেলে মো: আলমগীর হোসেন (৪১)। তার বাবাও ছিলেন ছেলে। পরিবারে ন্ত্রী-সন্তানসহ ৫ সদস্য। ইলিশ মৌসুমকে কেন্দ্র করে কৃষি ব্যাংক ও এনজিও ব্রাক থেকে ৩০ হজার টাকা ঋণ নিয়ে জাল ও নৌকা তৈরী করেছেন।
আলমগীর জানান, গত ৭ দিন ধরে নদীতে যাচ্ছি, কিন্তু তেমন মাছ পাচ্ছি না। তাই গত ২ দিন ধরে নদীদে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। নদীতে গেলেই খরচ, জাল বেয়ে সে খরচ উঠছে না।
ধনিয়া ইউনিয়নের আমির হোসেন (৪৫)। ৩০ বছর ধরে নদীতে মাছ শিকার করে আসছেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ৮ সদস্যের পরিবার তার। তিনিও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
আমির হোসেন জানান, জৈষ্ঠ্য মাসের শুরু থেকে ইলিশ পাওয়া কথা কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও নদীতে ইলিশ মিলছে না। বিগত মৌসুমে এমন সময় নদীতে ঝাকে ঝাকে ইলিশ ধরা পড়ে ছিলো। এ বছরও মাছের আশায় ঋন নিয়েছি, কিন্তু ইলিশ না পাওয়াতে চোখ-মুখে অন্ধকার দেখছি।
ভরা মৌসুমে ইলিশ পাওয়া আশায় ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে নিয়ে আলমগীর, আমির ও বিল্লালের মত একই অবস্থা আনোয়ার, শেখ পরিদ, ফারুক ও হারুনের।
তারা জানালেন, আাগামী সপ্তাহের মধ্যে মাছ না পাওয়া গেলে পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে কাটাতে হবে। কিন্তু ঋণ পরিশোধের তো কোন উপায় থাকবে না।
জেলে রহিম ও ইব্রাহিম জানান, সামনে ঈদ আসছে, পরিবারকে দু’মুখো বালো খাবার তুলে দিবো, সন্তানদের কিনে দিবো নতুন জামা। কিন্তু মাছের যে অবস্থা এতে ঈদ আনন্দ যে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে সংসার চালাবো।
এদিকে, ইলিশ সংকটের কারনে ভরা মৌসুমেও জমে উঠেনি ভোলার ৭টি উপজেলার ৭৮টি মাছের আড়ৎগুলো। ফলে মৎস্যপেশার উপর নির্ভরশীল লক্ষাধিক জেলে ও ২ শতাধিক মৎস্য আড়াৎদারদের দুরবস্থা। চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। আড়ৎদাররা জানার, বিগত মৌসুমে এ সময়ে জমজমাট ছিলো ঘাটগুলো। জেলে ও মৎস্যজীবীদের হাকডাকে মুখরিত ঘাটগুলো যেন জিমিয়ে পড়েছে।
সদরের তুলাতলী ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, অলস সময় কাটাচ্ছেন আড়ৎদার ও পাইকাররা। নদীতে মাছ নেই, তাই কেনা বেচাও জমে উঠেনি।
ঢালচরের মৎস্য আড়ৎদার মাহাবুবুর রহমান জানান, একদিকে যেমন মাছের সংকট অন্যদিকে ঢাকার পাইকারী বাজারে মাছের বাজারমূল্য অনেক কম। প্রতি পন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দরে। গত মৌসুমে একই মাছ বিক্রি হয়েছিলো ৩০ থেকে ৪০ হাজা টাকা দরে।
ভোলার বড় বড় মৎস্যঘাটগুলোর মধ্যে ভবানীপুর, বিশ্বরোড, হাকিমুদ্দি, চৌমুহনী, বেতুয়া, জনতা বাজার, কাটারখাল, কুকরী-মুকরী, ঢালচর, চড়ার মাথাসহ বেশ কিছু ঘাটে খবর নিয়ে দেখা গেছে ইলিশ সংকটের কারণে অনেক আড়ৎ জমে উঠেনি। বোর সময় পার করছেন জেলেরা। ওই সব জেলে পরিবারে চলছে চরম দুর্দিন।
জেলা মৎস্য অফিসের দেয়া তথ্য মতে, মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে ভোলার জলসীমা। ১৩-১৪ অর্থ বছরে সমগ্র মৌসুমে জেলা থেকে ৯০ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপান হয়েছে। যা বাজারে বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে ১৪-১৫ অর্থ বছরে ৮২ হাজার মেটিক টন। চলতি মৌসুমে জুন পর্যন্ত মাত্র ৫ হাজার মেট্রক টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী মাছের উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে আসছে। জেলায় নিবন্ধনকৃত জেলে রয়েছে ৮৮ হাজার।
এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকতা প্রীতিষ কুমার মল্লিক ও সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ হালদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে ইলিশের মৌসম পরিবর্তন হয়েছে। যারফলে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হিসেবে নদীর উচ্চতা কমে যাওয়া, নদী ভরাট, ডুবোচর, বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় ও ঝাটকা শিকারসহ বিভিন্ন মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতি কারণ।
তারা আরো জানান, আগে জৈষ্ট থেকে ইলশ মৌসুম শুরু হয়ে আশ্বিন মাস পর্যন্ত মাছের বিচরণ ছিলো। ঠিক এ সময়ই নদীতে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যেতো। কিন্তু এখন মৌসুম চেইঞ্জ হয়ে অগ্রায়ন পর্যন্ত চলে এসেছে। তাই এ বছর বিলম্ব হলেও মাছ ধরা পড়বে। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে ইলিশ ধরা পড়বে। কারণ এ বছর আমাদের ঝাটা অভিযান সফল হয়েছে।
ঈদে জেলে পূনবাসনের বিষয়ে মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ঈদের জেলে পূন:বাসনের কোন ব্যবস্থান না থাকলও ইলিশ নিশেধাজ্ঞা সময়ে জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল বিতরনের কাজ চলছে।
সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ হালদার বলেন, জেলেদের কথা বিবেচনা করেই আগামী মৌসুম থেকে ইলিশ ট্রাস্ট ফান্ড তৈরী করছে সরকার। এ ট্রাষ্টের আওতায় জেলেদের বিনা সুধে ঋন ও বিপদে আপদে জেলেদের সহযোগীতা করা হবে। ফান্ড চলু হলেই দাদনের ফাদে বন্দি জেলেদের সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে।
এমএইচ/ এআর





