বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে (বিসিসি) বৈষম্যের শিকার সংরক্ষিত কাউন্সিলররা। তাদের ওয়ার্ড বেশি ভোটারও বেশি। কিন্তু উন্নয়ন বরাদ্দ কম। আর ক্ষমতা নেই বললেই চলে। এ কারণে ৫ বছরের বেশিরভাগ সময় এলাকাবাসীর সামাজিক কর্মকাণ্ডেই বেশি সম্পৃক্ত থাকতে হয় তাদের। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট নন এলাকাবাসী।

বিগত দিনে তেমন কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারায় ভোটারদের তোপের মুখে পড়ছেন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা। নির্বাচিত হলে সমঅধিকার আদায়ে প্রয়োজনে আন্দোলন করার ঘোষণা দিয়েছেন নারী প্রার্থীরা। আর উন্নয়ন কাজের দুর্নীতি রোধে নারী-পুরুষ কাউন্সিলের সমন্বয়ের দাবি সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক)।

বিসিসির ২৮, ২৯ ও ৩০নং ওয়ার্ড থেকে পর পর তিনবার সংরক্ষিত কাউন্সিলর নির্বাচিত হন বিএনপি নেত্রী রাশিদা বেগম। প্রতিবার নির্বাচনকালীন সময় ৩টি ওয়ার্ডবাসীদের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা একবারো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এবারো তিনি সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত ৩টি নির্বাচনে বরাদ্দ না পাওয়ার কথা তুলে ধরলেও তা শুনতে নারাজ ভোটাররা। তাদের দাবি নির্বাচন এলে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করি। ঠিক সেইভাবে আপনি নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করবেন এটাই নিয়ম।

রাশিদাসহ গতবারের নির্বাচিত ৯ সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থী জানান, নগরীর ৩টি ওয়ার্ড নিয়ে আমাদের এলাকা। এলাকাবাসী চায় প্রতিটি ওয়ার্ডের সমউন্নয়ন। কিন্তু আমাদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচিত হওয়ার পর একটি ওয়ার্ড দিয়ে নির্বাচিত সাধারণ কাউন্সিলরের জন্য যে উন্নয়ন বরাদ্দ থাকে তার ৩ ভাগের ১ ভাগ দেয়া হয় একজন সংরক্ষিত কাউন্সিলরকে। যা দিয়ে একটি ওয়ার্ডের চাহিদামাফিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

সেখানে ৩টি ওয়ার্ডের উন্নয়ন কীভাবে করব। এমনকি সামাজিক নিরাপত্তার একটি কার্ডও আমরা দিতে পারি না। দিতে পারেন না ওয়ারিশ ও নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট। সাধারণ কাউন্সিলর ছাড়া করতে পারি না সালিশীও।

প্রথম পরিষদের নির্বাচন পরবর্তী আমরা যারা সংরক্ষিত কাউন্সিলর ছিলাম তারা একজোট হয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে সামান্য কিছু সুযোগ-সুবিধা পেলেও তা উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়েনি। এ কারণে নির্বাচনকালীন সময় ৩টি ওয়ার্ডবাসীর কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করতে পারছি না। এ কারণে ভোটাররা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হলেও সিটি কর্পোরেশনের পরিস্থিতি তুলে ধরায় তারা কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবে সবার কাছে তা তুলে ধরা সম্ভব হয় না।

তবে ভোটারদের আমরা বোঝাতে চেষ্টা করি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চাহিদামাফিক করতে না পারলেও এলাকার মেয়েদের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সাধারণ কাউন্সিলরের চেয়ে আমাদের বেশি কাছে পায় তারা। যে কোনো সময় মোবাইল করলে আমরা তাদের কাছে ছুটে যাই। এ বিষয়টি তারা গুরুত্বসহকারে দেখছেন।

তাছাড়া যে সমস্যাগুলো পুরুষ কাউন্সিলরের সঙ্গে বলতে পারে না তা আমাদের মাধ্যমেই সমাধান পাচ্ছেন এলাকাবাসী। এখন উন্নয়নের চেয়েও সামাজিক কর্মকাণ্ডে আমাদের অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি চাহিদামাফিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট চাইছি।

তবে পূর্বে নির্বাচিত সংরক্ষিত কাউন্সিলররা ভোটারদের তোপের মুখে পড়লেও একেবারে নতুন প্রার্থীরা এ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। তারা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভোটারদের আশ্বস্ত করছেন নির্বাচিত হলে তাদের চাহিদামাফিক উন্নয়ন করবেন। তবে যেসব ভোটার সিটি কর্পোরেশনে সংরক্ষিত কাউন্সিলরের বরাদ্দের বিষয়টি জানেন তারা সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে উন্নয়ন করবেন তার উত্তর চাইছেন।

এ সময় প্রার্থীর যোগ্যতার প্রশ্ন তুলছেন। নতুন প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে দাবি জানাচ্ছেন আমাদের একবার নির্বাচিত করুন আমরা আমাদের যোগ্যতা দিয়ে বরাদ্দ আনব। তার পরও না পারলে ১০ সংরক্ষিত কাউন্সিলরকে একত্রিত করে আন্দোলন গড়ে তুলব। এর মাধ্যমে আমরা এলাকাবাসীর কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার চেষ্টা করব।

১৩, ১৪ ও ১৫নং ওয়ার্ডের দুইবার নির্বাচিত সংরক্ষিত কাউন্সিলর এবং বর্তমানে কাউন্সিলর প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেত্রী কামরুন্নাহার রোজী বলেন, সাধারণ কাউন্সিলররা মাত্র একটি ওয়ার্ড নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আর আমাদের ৩টি ওয়ার্ড নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। নির্বাচিত হতে বহু কষ্ট করতে হয়। কিন্তু সে অনুপাতে কিছ্্ুই পাই না। এজন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে পুরুষের পাশাপাশি একজন করে মহিলা প্রার্থী দেয়ার দাবি জানান। একইসঙ্গে পুরুষ ও মহিলা কাউন্সিলরদের সমান অধিকার দেয়ার কথা বলেন এ কাউন্সিলর প্রার্থী।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, আমরা সবসময় পুরুষ-মহিলা সমঅধিকারের কথা বলে আসছি। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সময় বেশি কষ্ট করতে হয় সংরক্ষিত কাউন্সিলরদের। আর বরাদ্দ পায় সাধারণ কাউন্সিলররা। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরদারিতে এনে সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলরের মধ্যে সমন্বয় করা জরুরি। এতে করে সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন কাজের দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে।