২০১৯ - ২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট তামাকবিরোধীদের হতাশ করেছে। বিশেষত বিড়ি এবং নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম প্রায় অপরিবর্তিত রাখায় এগুলাের প্রকৃতমূল্য হ্রাস পাবে এবং ব্যবহার বাড়বে।
অন্যদিকে, টানা তৃতীয় বছরের মতাে সিগারেটের সম্পূরক শুল্ক প্রায় অপরিবর্তিত রাখায় তামাক কোম্পানিগুলাে ব্যাপকভাবে লাভবান হবে।
শনিবার (২২ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হােসেন মানিক মিয়া হলে ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস এর সহায়তায় প্রজ্ঞা ( প্রগতির জন্য জ্ঞান ) ও অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স এর উদ্যোগে তামাকবিরােধী সংগঠন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহছানিয়া মিশন, এসিজি, ইপসা, বিটা, সুপ্র, এবং তামাকবিরােধী নারী জোট ( তাবিনাজ ) সম্মিলিতভাবে তামাক কর বিষয়ক বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার ( অবঃ ) আব্দুল মালিক সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড . কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, চেয়ারম্যান , পিকেএসএফ ও চেয়ারম্যান , ন্যাশনাল এন্টি টোব্যাকো প্লাটফর্ম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বাের্ড ( এনবিআর ) এর সাবেক চেয়ারম্যান ড . নাসির উদ্দিন আহমেদ।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক বি. জেনারেল (অব) আব্দুল মালেক বলেন, তামাকজাতপণ্য স্বাস্থ্যের জন্য বিশাল ক্ষতিকর। এর ফলে ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, প্রদাহজনিত নানান ধরবের রোগ হয় তামাকজাত পণ্য গ্রহণের জন্য। সরকার শুধু লোভ দেখানো কার্যকর চালাচ্ছে। তারা শুধু শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় চারশত কোটি টাকা। প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং রাজস্ব আদায় কর্মকর্তারাও এর জন্য সমভাবে দায়ী।
সংবাদ সম্মেলনে (প্রজ্ঞা) থেকে বলা হয়, সিগারেটের মূল্যস্তর সংখ্যা ৪ টিতে অপরিবর্তিত রাখায় ভােক্তার স্বর পরিবর্তনের সুযােগ অব্যাহত থাকবে এবং তামাক কোম্পানি করফাঁকির সুযোগ পাবে। এছাড়াও, অপ্রক্রিয়াজাত তামাকের রপ্তানি শুল্ক প্রত্যাহার এবং উপকরণ কর রেয়াত তামাক কোম্পানিকে ব্যাপকভাবে লাভবান করবে, সরকার হারাবে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব। তামাক চাষ উৎসাহিত হবে , খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ হমকি মুখে পড়বে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানাে হয়, তামাকবিরােধীদের পক্ষ থেকে ২০১৯ - ২০ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের ৪টি মূল্যস্তরের পরিবর্তে দুইটি মূল্যস্তর প্রচলন এবং সম্পূরক শুল্ক এডভ্যালােরেম ( মূল্যের শতকরা হার ) পদ্ধতির পাশাপাশি একটি অংশ সুনির্দিষ্ট কর ( স্পেসিফিক ট্যাক্স ) হিসেবে আরােপ করার দাবি জানানাে হলেও প্রতি বাজেট এর কোনাে প্রতিফলন নেই। সিগারেটের মূল্যস্তর সংখ্যা অপরিবর্তিত রাখায় ভােক্তা তার সামর্থ্য অনুযায়ী ব্রান্ড বেছে নিতে পারবে , ফলে সিগারেটের ব্যবহার কমবেনা।
প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের প্রতি শলাকা সিগারেটের মূল্য মাত্র ২০ পয়সা ( ৫ . ৭ % ) বৃদ্ধি করা হয়েছে , অথচ এসময়ে জনগণের মাথাপিছু আয় ( নমিনাল ) বেড়েছে ১১ . ৩২ শতাংশ । বর্তমানে সিগারেট বাজারের প্রায় ৭২ শতাংশই নিম্নস্তরের সিগারেটের দখলে রয়েছে । প্রস্তাবিত বাজেটে সিগারেটের সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি না করায় তামাক কোম্পানিগুলাে ব্যাপকভাবে লাভবান হবে এবং মূল্যস্তরভেদে তাদের আয় ৩১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা বিড়ির মূল্য দুই বছর পর মাত্র ১.৫ টাকা বৃদ্ধি করে ১৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে । এরফলে প্রতি শলাকা বিড়ির দাম বাড়বে মাত্র ৬ পয়সা। এই সামান্য মূল্যবৃদ্ধি বিড়ির ব্যবহার হ্রাসে কোনাে প্রভাব ফেলবেনা। প্রস্তাবিত বাজেটে ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যে ওজনের ভিত্তিতে খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ায় এসব পণ্যের দাম কিছুটা হলেও বাড়বে এবং কর আদায়ের জটিলতা হ্রাস পাবে। করারােপের ক্ষেত্রে ট্যারিফ ভ্যালু পদ্ধতি পরিবর্তন করায় ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য থেকে বিগত বছরের তুলনায় সরকার প্রায় ২৬ শতাংশ বাড়তি রাজস্ব আয় করবে।
সংবাদ সম্মেলনে ২০১৯ - ২০ সালের চুড়ান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) কিছু প্রস্তাব তুলে ধরে।
১। নিম্নস্তরে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ৩৭ টাকার পরিবর্তে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা।
২। নিম্নস্তরের সিগারেটের উপর বিদ্যমান ৫৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের পরিবর্তে ৬০ শতাংশ এবং মধ্যম , উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরে বিদ্যমান ৬৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্কের পরিবর্তে ৭০ শতাংশ নির্ধারণ করা। প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটে ৫ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরােপ করা; সিগারেটের মূল্যস্তর সংখ্যা চারটি থেকে কমিয়ে দুইটিতে নিয়ে আসা।
৩। বিড়ির ফিল্টার - ননফিল্টার মূল্যবিভাজন তুলে দিয়ে ২৫ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ৩৫ টাকা নির্ধারণ এবং ৪৫ % সম্পূরক শুল্ক ও ৬ টাকা নির্দষ্ট কর আরোপ করা।
৪। প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৩৫ টাকা এবং প্রতি ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা; ১০ গ্রাম জর্দা ও গুলের উপর যথাক্রমে ৫ টাকা এবং ৩ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা।
৫। অপ্রক্রিয়াজাত তামাকের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক বহাল এবং প্রক্রিয়াজাত তামাকপণ্যের ওপর পুনরায় ২৫ শতাংশ রপ্তানি শুল্ক আরােপ করা।
৬। জনস্বার্থে তামাক কোম্পানিগুলাের উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণ সুযােগ বাতিল করতে বিদ্যমান মূল্য সংযােজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন , ২০১২ এর ৪৬ ধারার অন্তর্গত উপধারা ৩ এর দফা ঙ পুনর্বহাল করা , যেখানে তামাক ও এলকোহলযুক্ত পণ্যের ক্ষেত্রে এধরনের সুযােগ গ্রহণ রহিত করা হয়েছে।
৭। সকল প্রকার ই - সিগারেট এবং হিটেড ( আইকিউওএস ) তামাকপণ্যের উৎপাদন , আমদানি এবং বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এটিএন বাংলার বার্তা সম্পাদক ও অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স - আত্মার কো - কনভেনর নাদিরী কিরণ।
এসএম/জেড





