দাঁড়াও পথিক বর যথার্থ বাঙালি যদি তুমি হও। ক্ষণিক দাঁড়িয়ে যাও, এই সমাধিস্থলে। এখানে ঘুমিয়ে আছে, বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। এ দেশের মুক্তিদাতা, বাংলার নয়নের মণি।

গোপালগঞ্জ পৌরভবন থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে টুংগীপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি কমপ্লেক্সে ঢুকতেই চোখ আটকে যাবে সবার। পাথরের গায়ে লেখা এ লাইনগুলো দেখে থমকে দাঁড়াবেন যে কেউই।

কিন্তু এ পথিক যেন কেবল পথচারিই নয়। এ পথিক সারা বাংলার কোটি কোটি মানুষ। যারা আজন্ম ঋণী এই মানুষটির কাছে। যে ঋণ এ জাতির পরম আরাধ্য স্বাধীনতার জন্য।
কৃতজ্ঞ জাতি ভোলেনি তাদের পরাধীনতা মুক্তির মহান নেতাকে। তাইতো সারা বছরই দেশের প্রতিটি অঞ্চল থেকে জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে যায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। আসেন বিদেশ থেকেও।

দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর পৈত্রিক বাড়িটির তত্ত্বাবধানে থাকা বৈকুণ্ঠ বিশ্বাস বলেন, সারা বছরই এখানে হাজার হাজার মানুষের ভিড় থাকে। আগস্ট মাস এবং শীতের সময় সমাধিস্থল পরিদর্শনে আসা মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রবেশ করতে হয়। 

সাদা পাথরে নির্মিত গোলাকার এক গম্বুজ বিশিষ্ট সমাধি সৌধের চারপাশের দেয়ালে রয়েছে জাফরি কাটা। এই জাফরি দিয়ে সূর্যের আলো এসে উদ্ভাসিত করে বঙ্গবন্ধুর কবর। সমাধির চারপাশ ঘিরে রাখা আছে কয়েক কপি পবিত্র কোরআন এবং ইসলামী বই। কবর জিয়ারত করতে আসা অনেকেই কুরআন পাঠ করেন। মুল কমপ্লেক্সের উত্তর পাশে তৈরি করা হয়েছে একটি বেদি। শ্রদ্ধা জানাতে আসা সকলেই এই বেদীতেই পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন।

কমপ্লেক্স মসজিদের ইমাম আলহাজ্ব মাওলানা মোহাম্মাদ নওয়াব আলী বাংলানিউজকে বলেন, মাজারে নিয়মিত কুরআন এবং ফাতেহা পাঠ করা হয়। পবিত্র রমজান মাস এবং আগস্ট মাসে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পরই বঙ্গবন্ধু এবং তার বাবা-মায়ের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।

এছাড়া দূরদূরান্ত থেকে এসেও অনেকে মাজার জিয়ারত করেন। ২০০১ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি সমাধি কমপ্লেক্স মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানান।

বঙ্গবন্ধুর পৈত্রিক বাড়ির উঠানেই সমাহিত করা হয় তাকে। বঙ্গবন্ধুর নিজেরই প্রতিষ্ঠিত তিনতালা পাকা বাড়িটি এখন ফাঁকাই পড়ে থাকে। কখনও কখনও বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ অবস্থান করলে এই বাড়িতেই রাত্রি যাপন করেন বলে জানালেন বৈকুণ্ঠ বিশ্বাস।

গত ৪৫ বছর ধরে এ বাড়িটি দেখভাল করেন শেখ পরিবারের বিশ্বস্ত বৈকুণ্ঠ বিশ্বাস। বাড়িটির সামনে রয়েছে একটি বড়ই গাছ এবং পূর্ব পাশে একটি নারিকেল গাছ। বৈকুণ্ঠ জানান, এ গাছ দু’টি এই বাড়ি নির্মাণের সময় লাগানো হয়। এদের সঙ্গে এই বাড়ির অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে গাছ দু’টি কাটা হয়নি।

বাড়িটির বারান্দায় চোখ পড়তেই দেখা গেল বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের স্মৃতি বিজরিত আলোকচিত্রগুলো টাঙানো রয়েছে। শেখ হাসিনা ছাড়াও সেখানে রয়েছে শেখ রেহানা, শেখ কামাল, সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজি জামাল, শেখ রাসেল, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনি, আরজু মনি প্রভৃতির ছবি।

মূল মাজারের বাইরের পূর্ব পাশেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে দুই তলা বিশিষ্ট একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। বিভিন্ন ধরনের হাজারও বইয়ের তাকগুলো সাজিয়ে রাখা নিচতলায়। ছিমছাম এবং গোছানো এই লাইব্রেরিটি দেখলেই আপনার ইচ্ছে হবে কিছুক্ষণ বসে থাকার। বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে লেখা বেশিরভাগ বইয়ের সংগ্রহই এইখানে আছে।

মূল সংগ্রহশালা দোতলায়। এ সংগ্রহশালায় ছবির সংখ্যাই বেশি। বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য জীবনের বিভিন্ন মুহূর্ত ফ্রেমে বন্দী করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এছাড়াও আছে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর বর্বরতার নানা খণ্ডচিত্র। এছাড়া বড় করে টাঙানো রয়েছে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষনের ছবিটি।

সংগ্রহশালায় আছে সেই কফিনটি যেটিতে করে নৃশংসভাবে হত্যার পর বঙ্গবন্ধু’র নিরব নিথর দেহ বহন করে আনা হয়েছিল টুঙ্গিপাড়ায়।

লাইব্রেরিয়ান যোগেন্দ্রনাথ বাড়ৈ জানান, প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত লাইব্রেরিটি খোলা থাকে। স্থানীয়রাই এখানকার নিয়মিত পাঠক। তবে দর্শনার্থীরাও অনেকে মাঝেমধ্যে পড়াশুনা করেন।

বিভিন্ন বইয়ের জোগান সম্পর্কে বলেন, এখানকার বেশির ভাগ বই সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া। তবে অনেক বিদ্যোৎসাহী লোকজনও কিছু কিছু বই দিয়ে থাকেন।

ইআর