বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক আখ্যায়িত করে বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সেন্টার। (Human Rights Support Center) তাদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এ বছরে ১৬৭ টি বিচার “বহির্ভূত হত্যাকান্ডে” আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক নিহত হয়েছে ২১৭ জন । এছাড়াও নারী নির্যাতন, অপহরন, গুম, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সহিংস ঘটনা, নির্বাচনসহ ১০ টি বিষয়ে মানবাধিকার লংঘনের সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেন তারা।
পাঠকদের জন্য এইচআরএসসি চেয়ারম্যান ব্যারিষ্টার আল-আমিন কবির স্বাক্ষরিত রিপোর্টটি তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৬ সালের “হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সেন্টার” (Human Rights Support Center) বার্ষিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিগত বছর গুলির মত ২০১৬ সালেও আইন শৃংখলা বাহিনী কর্তৃক বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, প্রশাসনের হেফাজতে নির্যাতন, আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আইনবহির্ভূত আচরণ, ধরে নিয়ে যাওয়ার পর গুম করার অভিযোগ, গণপিটুনীতে মানুষ হত্যা অব্যাহত। রাজনৈতিক সহিংসতা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকারি দলের ব্যাপক অনিয়ম, সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ, সীমান্তে বিএসএফ্ ও বিজিপি কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশী হত্যা ও নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে হামলা, বাক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ, রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হত্যার হুমকি, প্রকাশ্য দিবালোকে বিজ্ঞান মনস্ক ও মুক্তমনা ব্লগার এবং প্রকাশক হত্যা, বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়ে দেশে বিরাজমান মানবাধিকার পরিস্থিতি খুব একটা সস্তোষজনক নয়। ২০১৬ সালে “হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সেন্টার” কর্তৃক দৈনিক সংবাদপত্র এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের তথ্যের ভিত্তিতে বার্ষিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
## হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সেন্টারের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এ বছরে ১৬৭ টি বিচার “বহির্ভূত হত্যাকান্ডে” আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ২১৭ জন নিহত হয়। এছাড়াও ২০১৬ সালে কারা হেফাজতে মারা যান ২৭ জন ।
## “নারী নির্যাতনের” অংশ হিসেবে সারাদেশে পারিবারিক কলহের নির্যাতনে ৪০৯ টি ঘটনায় ২৮৯ নারী নিহত হয়েছেন, আত্মহত্যা করেছেন ৫৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৬ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৩৯ জন নারী এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৯ জনকে। যৌতুকের জন্য নির্যাতনে ২২৭টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫০ জন, আত্মহত্যা করেছেন ০৫ জন এবং আহত হয়েছেন ৭২ জন নারী। এছাড়া এসিড নিক্ষেপের ৩৫ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন নারী।
## হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সেন্টারের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে অপহরণ হয়েছে ৩৯৭ জন, অপহরণের পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ১৮৯ জনকে এবং হত্যার পর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ৭৩ জনের। এছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ৩৪ জনকে অন্তর্ধান(গুম) করা হয়েছে এবং গুম করার পর ০৯ জনকে বিচার বহির্ভূত হত্যা করা হয়েছে।
## এ বছরে ৭২৩ টি “সহিংস হামলার” ঘটনায় নিহত হয়েছে ৬৪৭ জন, আহত হয়েছে ৬৭৩ জন এবং গুলিবিদ্ধ ১১৪ জন। এছাড়াও “গণপিটুনির” ১১১ টি ঘটনায় নিহত হয়েছে ১০৪ জন। বিভিন্ন স্থান থেকে পুলিশ ৩৬১ জন পুরুষের, ১৪৭ জন মহিলার এবং ২২৯ জনের অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে।
## এ বছরে ৪২৩ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছে ১০১ জন, আহত হয়েছে ৩,৬১৩ জন এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৮২ জন, যার অধিকাংশ ঘটনায় সরকার দলীয়কোন্দল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। “সংখ্যালঘু” স¤প্রদায়ের উপর ৮১ টি হামলার ঘটনায় মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হামলাসহ নিহত হয়েছে ১১ জন, আহত হয়েছে ৬৩ জন।
## “ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)” কর্তৃক ৬৯ টি হামলার ঘটনায় শারীরিক নির্যাতন ও গুলি করে ২৮ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে, আহত করা হয়েছে ২৮ জনকে এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ৩৫ জন। এছাড়্ওা “মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি)” কর্তৃক ০৬ টি হামলার ঘটনায় আহত হয়েছে ০৭ জন এবং গ্রেফতার ১৫ জন।
## ব্যাপকভাবে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়। গত ১১ ফেব্রæয়ারি’২০১৬ নির্বাচন কমিশন ছয়টি ধাপে মোট ৪২৭৫টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করার পর প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ছয় ধাপের নির্বাচনে হত্যা, সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়া, জাল ভোট দেয়া, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলার মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। গত ২২ মার্চ নির্বাচন শুরু হয় এবং ছয়টি ধাপে এই নির্বাচন ৪ জুন শেষ হয়। প্রথম-ছয় ধাপের নির্বাচনী সহিংসতায় মোট ৮৬ জন নিহত, অন্ততপক্ষে ২৬০৫ জন আহত এবং গুলিবিদ্ধ ২৩২ জন হয়েছেন।
## আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হামলায় “সাংবাদিক” আহত হয়েছে অন্ততপক্ষে ৬০ জন, গ্রেফতার হয়েছে ১০ জন। এছাড়্ওা লাঞ্ছনার শিকার হয়েছে ১০ জন এবং হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১১ জন সাংবাদিক।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে জনগনের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে নাপারলে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাবে। তাই “হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সেন্টার” পক্ষ থেকে দেশের সকল সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও দেশি-বিদেশী মানবাধিকার সংগঠন গুলোকে আরো সোচ্চার হওয়ার আহবান জানাচ্ছি।
প্রেসবিজ্ঞপ্তি/জারিফ





