রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতি মহোৎসবের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তে চাপের মুখে হিমশিম খাচ্ছে দুর্নীতি দমন কশিশন (দুদক)। হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় চলতি সপ্তাহেই ২ ডজন সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা এবং অর্ধশত ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাছে দুদকের তলবি নোটিশ যাচ্ছে ।
জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিদের্শনা মোতাবেক দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক টিম দীর্ঘ অনুসন্ধান ও তদন্তে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ লোপাটের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
সেই সঙ্গে আরও বেরিয়ে আসছে ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, পরিচালনা পর্ষদ, ব্যাংক কর্মকর্তা,সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতাদের নাম। কিন্তু রাজনৈতিক এবং সরকারের প্রভাবশালীদের চাপের কারণে দুদক প্রকৃত অপরাধীদের অনেকই ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
গত কয় বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সোনালী ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির মহোৎসব হয়েছে। হলমার্ক গ্রুপ নয়,নাম জানা অজানা অনেক ছোট- বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্যাড সর্বস্ব শতাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ মঞ্জুরের ঘটনায় সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত এমন অভিযোগও উঠেছে।
সোনালীর ব্যাংকের ১০ পরিচালক: ভাগ্যবান সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ১০ সদস্য। এরমধ্যে রয়েছেন; সাবেক চেয়ারম্যান কাজী বাহারুল ইসলাম, সুভাষ সিংহ রায়, মো. আনোয়ার শহিদ, এএসএম নাইম, কেএম জামান রোমেল, কাশেম হুমায়ন, সদস্য সত্যেন্দ্র চন্দ্র, জান্নাত আরা হেনরি, শহীদ উল্লাহ মিয়া ও সাইমুম সরোয়ার কমল।
গত বছর সোনালী ব্যাংকের ১০ পরিচালকসহ ৩১ জন কর্মকর্তার সম্পদ বিবরণী জমা নেয়। কিন্তু দুদকের কর্মকর্তারা সোনালী ব্যাংকের অস্বাভাবিক ক্ষমতাধর ওই ১০ পরিচালকের অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা জ্ঞাত আয় বর্হিভূত কোনো সম্পদ খুজেঁ পাননি। অথচ অভিযোগ উঠেছে, সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং ব্যাংক কর্মকর্তারা ঋণের ক্ষেত্রে কমিশন নেয়াসহ আর্থিক সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেন।
আর এ বিষয়টি হলমার্ক গ্রুপের এমডি তানভীর আহমেদ একাধিক বার মুখ খোলেছেন। তিনি দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদেরও বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। এমনকি তানভীর আহমেদ ১৬৪ ধারায় আদালতে তার জবান বন্দিতেও পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে কমিশন নেয়ার বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। যা মিডিয়ায় বিভিন্ন শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।
জানা যায়, হলমার্ক এবং এর সহযোগি আরও ৫ প্রতিষ্ঠানের সোনালী ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যাংকের ৪১টি শাখার প্রায় ১০০ ব্যাংক কর্মকর্তাকে দুদকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু নানা তদবির আর চাপের মুখে অনেক প্রভাবশালীরা আইনের নানা ফাঁক ফোঁকড়ে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান এমন ঘটনাও রয়েছে।
পরে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ৩৮ মামলার মধ্যে ২৪ মামলার চার্জশিট দাখিল হয়। আর ১৪ মামলার লুন্ঠিত টাকা ব্যাংকে সমন্বয় করায় তাদেরকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
সোনালী ব্যাংকের ৯ শাখা: হলমার্ক গ্রুপ ও প্যারাগন গ্রুপ সোনালী ব্যাংক হোটেল রুপসী বাংলা কর্পোরেট শাখা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা, পারটেক্স গ্রুপ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ শাখা থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, প্যারাগন গ্রুপ ৩৫০ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংকের ঢাকার লোকাল অফিসে ১৬০০ কোটি টাকা, বৈদেশিক বাণিজ্য করপোরেট শাখায় ১০০ কোটি টাকা, চট্টগ্রামের লালদিঘি করপোরেট শাখায় ৯০ কোটি টাকা, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখায় ৩০০ কোটি টাকা এবং নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখায় ৩৫০ কোটি টাকা সোনালী ব্যাংক আগারগাঁ ও গুলশান শাখার ১৪১ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির নথিপত্র পেয়েছে দুদক।
দুদকের উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বাধীন টিম ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের ওই শাখাগুলোর ঋণের আবেদন, ঋণ প্রদান, ব্যাংক কর্মকর্তাদের সুপারিশ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের পরিদর্শণ প্রতিবেদন,অডিট রিপোর্ট,আমদানি, রফতানি সংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহ করেছে।
এখন ওই সব প্রতিষ্ঠানের ঋণের আবেদন, বন্ধকী জমি,ঋণ উত্তোলন, এলসির নথি পর্যালোচনা করছে দুদকে।
ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে: মতিঝিল সোনালী ব্যাংক লোকাল অফিসের গ্রাহক ‘অল টেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লি: কেএনএস ইন্ডাস্ট্রিজ লি:,ক্যাংসান ইন্ডাস্ট্রিজ লি:,থারমামেক্স টেক্সটাইল, ইকো কটন মিল্স, রহিমা ফুড কর্পোরেশন, এপেক্স উইভিং এন্ড ফিনিশিং মিল্স লি:, পদ্মা পলিকটন নীট ফেব্রিক্স লি:, কেএসএস নীট কম্পোজিট লি:,পিলুসীড টেক্সটাইল লি। সোনালী ব্যাংক বৈদেশিক শাখা: মেসার্স বেরিল এপারেল্স লি: এবং মের্সাস ইউসুফ এন্ড কোম্পানীর ।
নারায়নগঞ্জ সোনালী ব্যাংক : মেসার্স রুপসী গ্রুপের প্রতিষ্ঠান- রুপসী নীট ওয়্যার লি:, রুপসী ফেব্রিক্স লি:, রুপসী এমব্রয়ডারী, রুপসী ডিজাইন এন্ড প্রিন্টিংস ও মের্সাস সালমান নীট কম্পোজিট লি:।
আগ্রাবাদ সোনালী ব্যাংক শাখা: চট্টগ্রাম জেলার আগ্রাবাদ শাখার গ্রাহক,ইমাম ট্রেডার্স,জামমির ভেজিটেবল ওয়েল লি:,একে এন্টারপ্রাইজ, মহিউদ্দিন কর্পোরেশন, কামাল এন্টারপ্রাইজ এবং অর্কিড ফ্যাশন।
লালদীঘি সোনালী ব্যাংক: চট্টগ্রামের লালদীঘি সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার গ্রাহক; মের্সাস সিদ্দিক ট্রেডার্স, মের্সাস বেঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিজ লি:,এভারেস্ট প্রাইভেট লি:,ইউরো এ্যাপারেলস লি:,এ্যাপারেল ফেয়ার লি:,মুক্তা এ্যাপারেলস লি:,লিবরা ফ্যাশন ওয়্যার লি:,বিউমন্ড গামের্ন্টস লি:,হোসেন এ্যাপারেলস লি:, মের্সাস একমি টেক্সটাইল এন্ড গামের্ন্টস লি: ইমন এ্যাপারেলস লি:, মডেল এ্যাপারেলস লি: ইউনাইটেড ফ্যাশন লি:,ডিউড্রপস এ্যাপারেলস লি:, রোজেন্ট গামের্ন্টস লি:,কোব এ্যাসোসিয়েটস লি:,এমাইকো ফেব্রিক্স লি:,তন্নী নীট ওয়্যার লি:, মৌসুমী টাওয়েল লি:।
ঢাকা, একে, ১৩ সেপ্টম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম,এসআর





