প্রতিবছর ১২ বৈশাখ টাঙ্গাইলের সদর উপজেলার রসুলপুরে অনুষ্ঠিত হয় জামাই মেলা। রসুলপুরের বাছিরন নেছা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজন করা হয় মেলার। রসুলপুরসহ আশপাশের ৩০টি গ্রামের হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে মেলায়।
নামে জামাই মেলা হলেও মেলায় জামাই ক্রয়-বিক্রি করা হয় না এখানে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, তবে জামাই মেলা নাম কেন? এর উত্তর রসুলপুরের বৃদ্ধরাও জানেন না। তারা বাবা-দাদার মুখে জামাই মেলা নাম শুনে এসেছেন। তবে ধারণা করা হয়- স্থানীয় মেয়েরা তাদের বরদের নিয়ে মেলা আসে, এই কারণে ঐতিহ্যগতভাবে মেলাটি জামাই মেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
ব্রিটিশ আমলে বৈশাখী মেলা হিসেবে শুরু হলেও মেলা উপলক্ষে জামাইদের আপ্যায়ন করা হতো বলে এক সময় মেলাটি পরিচিতি পায় জামাই মেলা হিসেবে। এমনটিই বললেন সাহিত্যিক ও এই এলাকর সন্তান রাশেদ রহমান। তিনি বলেন, মেলার উৎপত্তি কবে, সেটা কেউ জানে না। যুগ যুগ ধরে মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। আগে মেলায় আশপাশের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে আসতেন। কিন্তু এখন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ী আর দর্শনার্থীরা মেলা দেখতে আসেন।
দুই দিন ব্যাপী মেলার প্রথম দিনকে বলা হয় জামাই মেলা, আর দ্বিতীয় দিন বউ মেলা। মেলাকে সামনে রেখে রসুলপুর ও এর আশপাশের বিবাহিত মেয়েরা তাদের বরকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসে। আর জামাইকে মেলা উপলক্ষে বরণ করে নেওয়ার জন্য শাশুড়িরা কয়েক মাস আগে থেকেই নেয় নানান প্রস্তুতি। মেলার সময় জামাইয়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দেয় শাশুড়িরা। সেই টাকার সঙ্গে আরও টাকা যোগ করে এলাকার জামাইরা মেলা থেকে মাটির তৈরি বড় কলসি ভরে কেনেন চিড়া, মুড়ি, মিষ্টি, জিলাপী ইত্যাদি। ঘর সাজানোর নানা তৈজসপত্রও কেনেন মেয়েরা। জামাইয়ের কেনা সেই মিষ্টি বিলি করা হয় আশপাশের বাড়িতে। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা জামাইরা এতে হয় অভিভূত।
সোহাগ নামের স্থানীয় একজন জানান, মেলার সময় রসুলপুরসহ আশপাশের গ্রামের বিবাহিত মেয়েদের স্বামীকে নিমন্ত্রণ করা হয়। সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও। মেলার সাতদিন আগে থেকে জামাইরা আসতে শুরু করে। মেলার দ্বিতীয় দিন এলাকার সব মেয়েরা মেলায় ঘুরতে আসে। তাই সেদিনকে বলা হয় বউ মেলা।
আসাদ নামের এলাকার এক জামাই জানান, মাসখানেক আগে থেকে শ্বশুর বাড়ি থেকে মেলায় আসার জন্য দাওয়াত দিচ্ছিল। না আসলে সবাই মন খারাপ করে। তাই বাধ্য হয়েই অফিস ছুটি নিয়ে ঢাকা থেকে এসেছেন। তবে এসে ভালোই লাগে। সবার সঙ্গে অনেক আনন্দ করা যায়।
মেলাকে সামনে রেখে ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য আয়োজন করা হয় নানা বিনোদন ব্যবস্থার। মেলায় থাকে কসমেটিকস, খেলনা, খাবারের দোকানের স্টল। আর মেলায় প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকে হোন্ডা খেলা। শুধু তাই নয়, ঐতিহ্যবাহী মেলায় ব্যবসা করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন ব্যবসায়ীরা।
বগুড়া থেকে মেলায় ফার্নিচার নিয়ে আসা আলম নামের এক ব্যবসায়ী জানান, গত ১৫ বছর ধরে প্রতিবছর মেলায় কাঠের তৈরি নানা রকমের আসবাবপত্র বিক্রি করতে আসেন। মেলায় বেচাকেনা ভালোই হয়। তবে খুব বেশি লাভ না হলেও এলাকার মানুষদের সঙ্গে মেলায় আনন্দ করতে পেরে ভালোই লাগে। মূল মেলা দুদিনে শেষ হয়ে গেলেও আসবাবপত্রের বেচাকেনা প্রায় মাসখানেক চলে।
বাবা-দাদার গ্রামীণ ঐহিত্য ধরে রাখতে পেরে খুশী মেলার আয়োজকেরা। পূর্বে মেলা সপ্তাহব্যাপী হলেও বর্তমানে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হওয়ায় দুই দিনে নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানান মেলার আয়োজক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাশেম।
তিনি বলেন, আগে মেলায় পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা আসলেও এখন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করতে আসে। এবারের মেলায় শতাধিক আসবাবপত্রের স্টল রয়েছে। পাশাপাশি মিষ্টি, আকরিসহ নানান খাবার দোকানের স্টল, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় গৃহস্থালী জিনিসপত্রের স্টল, ছোট বাচ্চাদের খেলনার স্টল সব মিলিয়ে এক হাজার স্টল অংশ নিয়েছে।
জেআই





