শুক্রবার সাভারের ব্র্যাক সিডিএমে ইউজিসির বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী উপাচার্য সংলাপের প্রথম দিনে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন মন্ত্রী।
আমির খসরু বলেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কিংবা নতুন বিভাগ ও বিষয় চালুর ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার খাত, শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চশিক্ষার বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের কেবল ডিগ্রি অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো নয়, তাদের কর্মজীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলাই উচ্চশিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তবে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার মান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করাও জরুরি।
গবেষণা হোক শিল্পের সমস্যার সমাধানে
বাজারমুখী অর্থনীতিতে শিক্ষার অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের গবেষণা সক্ষমতা ও উদ্ভাবনের বিষয়টি শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তুলে ধরতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনব্যবস্থাকে টেকসই করা সম্ভব নয়।
দেশের শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, একই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অর্থায়ন এবং গবেষণার ফল বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারে ভূমিকা রাখতে হবে। গবেষণা যেন শুধু প্রকাশনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে ব্যবহার হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষতার ঘাটতিই বড় চ্যালেঞ্জ
উচ্চশিক্ষার অন্যতম বড় সংকট হিসেবে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ব্যবধানের বিষয়টি তুলে ধরেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি বলেন, দেশে উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও শিক্ষার মান, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের উপযোগী স্নাতক তৈরির ক্ষেত্রে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তার ভাষ্য, একদিকে নিয়োগদাতারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন জনবল পাচ্ছেন না, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ব্যবধান কমাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি ও মূল্যায়নব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান জানান, উচ্চশিক্ষার টেকসই রূপান্তরের জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করছে ইউজিসি। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মূল্যবোধ ও বৈশ্বিক দক্ষতায় গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য শিক্ষাক্রমে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের বিষয়গুলো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী স্নাতক তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি যোগাযোগ, প্রযুক্তি, ভাষা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা হওয়ার দক্ষতা বাড়াতে কর্মসংস্থানমুখী স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালুর পরামর্শ দেন।
শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ, সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার পরিসর বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে শিল্পখাতের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা, ইন্টার্নশিপ এবং হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
দুই দিনব্যাপী এ সংলাপে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, সুশাসন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, ডিজিটাল রূপান্তর, আন্তর্জাতিকীকরণ, শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করছেন। প্রথম দিনে চারটি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
এমএম