১০ টাকা কেজির চাল বিক্রিতে ১০ ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে খাদ্য অধিদপ্তর তিন ধরনের অভিযোগের কথা স্বীকার করেছে। দেশের আটটি জেলা থেকে তারা এই তিন ধরনের অভিযোগ পেয়েছে। অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে ইউনিয়ন পরিষদের একজন চেয়ারম্যান ও একজন সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।

১০ ধরনের অনিয়ম হলো: ১. কোথাও গরিবের বদলে ধনীরা চাল পাচ্ছেন। ২. কোথাও ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে। ৩. কোথাও ৩০ কেজি চাল দেওয়া টিপসই নিয়ে ১০ থেকে ২০ কেজি দেওয়া হচ্ছে। ৪. তালিকা অনুমোদনের আগেই অনেক জায়গায় চাল বিতরণ শুরু হয়ে গেছে। ৫. অনেক এলাকায় হতদরিদ্রের নাম তালিকায় আসেনি। ৬. চাল বিতরণে অনভিজ্ঞ দলীয় নেতা-কর্মীদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৭. বেশ কয়েকটি এলাকায় উপকারভোগী তালিকায় সরকারি চাকরিজীবী, স্কুলশিক্ষক ও ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারের নাম রয়েছে। ৮. কয়েকটি জেলায় খাদ্য বিভাগ থেকে নিম্নমানের চাল দেওয়া হয়েছে। ৯. কার্ডধারী ব্যক্তিদের চাল না দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। ১০. ব্যানার টানিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে চাল বিক্রির নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

এদিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চালও বিক্রি করতে পারেনি খাদ্য অধিদপ্তর। প্রতি মাসে দেড় লাখ টন চাল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও গত সেপ্টেম্বর ও ৭ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে তারা ১ লাখ ১২ হাজার ৫১১ টন চাল বিক্রি করতে পেরেছে। তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠায় দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় এখনো চাল বিক্রি শুরুই করা যায়নি। অন্তত ২৫টি জেলা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে ১০ টাকায় চাল বিক্রিতে ১০ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের অভিযোগে কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভ প্রদর্শন ও মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের খাদ্য সরবরাহ, বণ্টন ও বিতরণ বিভাগের পরিচালক সুকুমার চন্দ্র রায় বলেন, তাঁরা এ পর্যন্ত নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, বান্দরবান, পাবনা, ফরিদপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও যশোর থেকে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে অনিয়মের ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। আসামি আওলাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পলাতক আছেন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে একই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল খালেককে। বাকি অনিয়মগুলো তদন্তাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

১০ টাকার চাল বিক্রিতে অনিয়মের মাত্রা এতটাই বেশি যে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে হুঁশিয়ারি দিতে হয়েছে। প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ টাকার চাল বিতরণে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও এই চাল বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেন, ‘গাইবান্ধা থেকে খবর পেয়েছি, ১০ বিঘা জমির মালিক হওয়া সত্ত্বেও ১০ টাকা কেজির চাল পেয়েছে। ওই ব্যক্তি ও তাকে সুপারিশকারী চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেও মামলা ও গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছি।’ তিনি বলেন, চাল বিক্রির অনিয়মে যুবলীগ-আওয়ামী লীগের যে-ই জড়িত থাকুক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

অনিয়মের লাগাম টানতে শুধু খাদ্য অধিদপ্তর নয়, মন্ত্রণালয়কেও তদারকিতে যুক্ত হতে হচ্ছে। অনিয়ম চিহ্নিত করে প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে আট সদস্যের একটি তদারকি কমিটি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যেক জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থাকেও অনিয়মের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অনিয়মের ঘটনা বেশি ঘটায় উপজেলা খাদ্য অধিদপ্তরের কার্যালয়ে অভিযোগ বাক্স খোলা হয়েছে। প্রতি বৃহস্পতিবার ওই বাক্স খুলে প্রতিটি অভিযোগের তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার ১০ টাকা কেজি দরে ৫০ লাখ পরিবারের মাঝে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে চাল বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর এবং মার্চ ও এপ্রিল—পাঁচ মাস এই চাল বিক্রি করা হবে। গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এই চাল বিতরণের জন্য সরকারকে অতিরিক্ত ২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে খরচ করতে হচ্ছে।

এমবিএইচ