ড. মোঃ আশরাফুর রহমান
অপ্রতিমের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। কিন্তু শোকের সঙ্গে যদি কিছু প্রশ্ন না জাগে, কিছু আত্মসমালোচনা না আসে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখার জন্য কিছু পরিবর্তনের উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে এই মৃত্যু থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া হবে না।
বাংলাদেশের একাধিক পত্রিকায় ২২ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আইফোন, ৫ হাজার টাকা পাওনা, বয়সে বড়দের সঙ্গে ‘অসম বন্ধুত্ব’ এবং টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিমের সঙ্গে যাদের ওঠাবসা ছিল, তারা তার সহপাঠী ছিল না এবং বয়সেও বড়। একইসঙ্গে তাদের ছবি ও টিকটক ভিডিও তৈরির তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে।
এখানে আমার প্রথম প্রশ্ন—আমরা কি শুধু সন্তান কোথায় পড়ছে তা দেখছি, নাকি সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী দেখছে, কী করছে এবং কোন পৃথিবীতে নিজেকে গড়ে তুলছে—সেটিও দেখছি?
আমার প্রথম জিজ্ঞাসা: সন্তান কার সঙ্গে মিশছে?
আমাদের সমাজে একজন সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে অভিভাবকের উদ্বেগ অত্যন্ত স্বাভাবিক। পরীক্ষার ফলাফল, কোচিং, স্কুল, বাড়ির কাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি—এসব নিয়ে আমরা নিয়মিত খোঁজ নিই। কিন্তু একটি সন্তান স্কুলের বাইরে কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, তার বন্ধুদের বয়স কত, তাদের জীবনযাপন কেমন, তারা কী ধরনের ভিডিও তৈরি করে বা দেখে—এসব বিষয়ে অনেক পরিবারই যথেষ্ট সচেতন নয়।
অথচ কৈশোর এমন একটি সময়, যখন বন্ধুত্বের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। সন্তান অনেক সময় বাবা-মায়ের চেয়ে বন্ধুর কথা বেশি শুনতে শুরু করে। তখন ‘বন্ধু’ শব্দটির আড়ালে কে আছে, সেটি জানা অভিভাবকের দায়িত্ব।
অপ্রতিমের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তদন্তকারীরা যে ‘অসম বন্ধুত্বের’ কথা বলেছেন, সেটি আমাদের বিশেষভাবে ভাবতে বাধ্য করে। একজন ১৩ বছরের শিশুর সঙ্গে তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বয়সে বড় ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতা থাকলে সেখানে অপরাধের অভিযোগ না থাকলেও অভিভাবকের স্বাভাবিক প্রশ্ন হওয়া উচিত—এই সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হলো? তারা কোথায় যায়? কী করে? কেন এই বন্ধুত্ব? এটি সন্তানকে সন্দেহ করার বিষয় নয়; বরং সন্তানকে বোঝার বিষয়।
আমার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা: আমরা সন্তানের বই দেখি, কিন্তু মুঠোফোন দেখি কি?
আজকের সন্তান একই সঙ্গে দুটি পৃথিবীতে বাস করে—একটি বাস্তব পৃথিবী এবং একটি প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী।
বাস্তব পৃথিবীতে সে স্কুলে যায়, মাঠে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে। আর প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে সে টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জারসহ নানা মাধ্যমে সময় কাটায়।
অভিভাবক হয়তো জানেন সন্তান কোন স্কুলে পড়ে, কিন্তু জানেন কি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারা বন্ধু? সে কোন ধরনের বিষয়বস্তু দেখে? কার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে? রাতের বেলায় কার সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করে? তাকে কেউ কোনো ভিডিও তৈরির জন্য প্রলুব্ধ করছে কি না? কেউ তার ছবি, পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করছে কি না?
বাংলাদেশের কিশোরদের নিয়ে পরিচালিত গবেষণাতেও অতিরিক্ত ও সমস্যাজনক ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে দৈনিক ইন্টারনেট ব্যবহারের সময় এবং কিছু আচরণগত বিষয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের সচেতন তদারকিকে একটি সুরক্ষামূলক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, সন্তানের হাতে মুঠোফোন তুলে দিয়ে শুধু বলা—“ভালোভাবে ব্যবহার করো”—যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সচেতন প্রযুক্তি-অভিভাবকত্ব।
আমার তৃতীয় জিজ্ঞাসা: অভিভাবকত্ব কি শুধু খরচ বহন করা?
একজন বাবা-মা সন্তানের জন্য স্কুলের ফি দেন, বই কিনে দেন, ভালো পোশাক দেন, মুঠোফোন কিনে দেন, কোচিং করান—এসব অবশ্যই দায়িত্বের অংশ। কিন্তু অভিভাবকত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সময় দেওয়া এবং সন্তানের ভেতরের পৃথিবীকে জানা।
সন্তান কখনো কখনো তার সমস্যার কথা সরাসরি বলে না। সে হয়তো কোনো বন্ধুর চাপের মধ্যে আছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অস্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, কেউ তাকে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে উৎসাহিত করছে—কিন্তু বাবা-মাকে বলতে ভয় পাচ্ছে।
কারণ অনেক পরিবারে সন্তান ভুল করলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় বকাঝকা, অপমান বা শাস্তি। ঠিক এই জায়গাটিতেই আমাদের পরিবর্তন করতে হবে।
সন্তানকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে সে বলতে পারে—“আমি একটি সমস্যায় পড়েছি”— এবং নিশ্চিত থাকতে পারে যে বাবা-মা প্রথমে তার কথা শুনবেন, তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিশ্ব অভিজ্ঞতা আমাদের কী শেখায়?
আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে অভিভাবকের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপীয় অঞ্চলের ২০২১–২২ সালের একটি বৃহৎ গবেষণায় ৪৪টি দেশ ও অঞ্চলের ১১, ১৩ ও ১৫ বছর বয়সী কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন খেলাধুলার আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনাতেও কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের আচরণ, সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ, সচেতন তদারকি এবং ব্যবহারের সীমা নির্ধারণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।
অভিভাবককে সন্তানের প্রযুক্তিনির্ভর জীবন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা চলবে না, আবার গুপ্তচরের মতো প্রতিটি পদক্ষেপ অনুসরণ করাও সমাধান নয়। প্রয়োজন বয়সোপযোগী সীমা, আলোচনা, বিশ্বাস, প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞান এবং ঝুঁকি শনাক্ত করার ক্ষমতা।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন প্রয়োজন?
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জ্ঞান, পরীক্ষা ও ফলাফলের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এখন সময় এসেছে জীবনবোধ, সামাজিক আচরণ, মানসিক বিকাশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিকত্বের শিক্ষাকে শিক্ষার মূল কাঠামোর অংশ করার।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে—অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি; অনলাইনে হয়রানি; অনলাইনে শিশুদের প্রলোভিত বা প্রতারিত করার কৌশল; ভুয়া পরিচয়; ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্যের নিরাপত্তা; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কীভাবে মানুষের মনোযোগ ধরে রাখে; অনলাইন জনপ্রিয়তার চাপ; টিকটক বা অন্য মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়বস্তু তৈরির পরিণতি; অনলাইন বন্ধুত্ব ও বাস্তব বন্ধুত্বের পার্থক্য; অনলাইন আর্থিক লেনদেন ও প্রতারণা; বন্ধুদের চাপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ; বিপদে পড়লে কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে।
এগুলোকে আলাদা কোনো ‘কম্পিউটার ক্লাস’ হিসেবে দেখলে চলবে না। বাংলা, ইংরেজি, সামাজিক বিজ্ঞান, নৈতিক শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি—বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিকত্বের শিক্ষা দিতে হবে।
বিদ্যালয়ে অভিভাবক–শিক্ষক–শিক্ষার্থী নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রয়োজন
প্রতিটি বিদ্যালয়ে শুধু অভিভাবক-শিক্ষক সভা করলেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়।প্রতি শিক্ষাবর্ষে অন্তত একটি শিশু নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অভিভাবক সচেতনতা কর্মসূচি আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে শিক্ষক, অভিভাবক, পুলিশ, মনোবিজ্ঞানী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং প্রয়োজনে শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ অংশ নেবেন।
বিদ্যালয়ের দায়িত্ব হবে শুধু—“আপনার সন্তান পরীক্ষায় কত পেয়েছে”— তা জানানো নয়; বরং—সে কাদের সঙ্গে মিশছে? বিদ্যালয়ে তার আচরণে পরিবর্তন এসেছে কি?সে কোনো হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার কি না? কোনো বড় বয়সী ব্যক্তির সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে কি না? সে হঠাৎ গোপনীয় হয়ে যাচ্ছে কি না? এসব আচরণগত সতর্কসংকেত নিয়েও আলোচনা করা।
পরিবারকে দিতে হবে প্রযুক্তি ব্যবহারে অভিভাবক নির্দেশিকা
সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও তথ্যপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যৌথভাবে বয়সভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারে অভিভাবক নির্দেশিকা তৈরি করতে পারে।
৬–১০ বছর: মুঠোফোন ও অন্যান্য যন্ত্রের ব্যবহার, নিরাপদ বিষয়বস্তু এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহার।
১১–১৩ বছর: অনলাইন বন্ধুত্ব, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, অনলাইন খেলাধুলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বন্ধুদের চাপ।
১৪–১৬ বছর: ব্যক্তিগত পরিচয়, সম্পর্ক, অনলাইনে হয়রানি, ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়বস্তু, অনলাইন শোষণ এবং নিজের সামাজিক পরিচিতি রক্ষার শিক্ষা।
১৭–১৮ বছর: দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহার, গুজব ও মিথ্যা তথ্য শনাক্তকরণ, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং আইনগত দায়বদ্ধতা।
অভিভাবকদেরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কারণ সন্তান যখন প্রযুক্তি ব্যবহারে বাবা-মায়ের চেয়ে বেশি দক্ষ হয়ে যায়, তখন শুধু অভিভাবকের কর্তৃত্ব দিয়ে প্রযুক্তিগত ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন জ্ঞান।
আমার চতুর্থ জিজ্ঞাসা: সন্তানকে কি আমরা শুধু সফল হতে শেখাচ্ছি?
আমরা সন্তানকে বলি—ভালো ফল করো, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো, ভালো চাকরি করো। কিন্তু বলি কি—“ভালো মানুষ হও", “ভুল বন্ধুত্ব চিনতে শেখো”, “কেউ তোমাকে কোনো কাজ করতে চাপ দিলে না বলতে শেখো”, “কেউ তোমাকে ভয় দেখালে আমাদের বলো”, “কোনো অপরাধ দেখলে চুপ থেকো না”, “কেউ তোমাকে অস্বাভাবিক সুবিধা দিলে প্রশ্ন করো”, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখো, সব সত্য নয়।”
সমাজ নির্মাণে এই শিক্ষা পরীক্ষার নম্বরের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সরকারের দায়িত্ব কোথায়?
এটি শুধু পরিবারের সমস্যা নয়। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে।
প্রথমত, শিক্ষা নীতিতে সামাজিক ও আবেগগত শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর নাগরিকত্ব এবং শিশু সুরক্ষাকে বাধ্যতামূলক কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা অথবা অন্তত আঞ্চলিক পরামর্শসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং পরিবারকে নিয়ে সমাজভিত্তিক কিশোর নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে।
চতুর্থত, কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। শিশুর অবসর যদি শুধু মুঠোফোনের পর্দায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার সামাজিক বিকাশ অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
পঞ্চমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে শিশু নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা আরও সহজ ও দ্রুত করা প্রয়োজন।
পুলিশের ভূমিকাও নতুন করে ভাবতে হবে
অপ্রতিমের ঘটনা তদন্তের পাশাপাশি আমাদের অপরাধ প্রতিরোধের কথাও ভাবতে হবে।পুলিশের কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ ইউনিটগুলো বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি করতে পারে। তবে সেটি যেন ভয় দেখানোর কর্মসূচি না হয়। পুলিশের সদস্যরা শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে কথা বলবেন—কোন পরিস্থিতিতে পুলিশকে জানাতে হবে, কীভাবে বিপদ থেকে বের হতে হবে, অপরাধী ও ভুক্তভোগীর পার্থক্য কী এবং কীভাবে জরুরি সহায়তা নেওয়া যায়।
প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ প্রতিরোধে বিশেষ প্রশিক্ষিত সাইবার নিরাপত্তা দল এবং শিশু সুরক্ষা সমন্বয়ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের শেষ যে প্রশ্নটি করে যায় তা হলো অপ্রতিম হয়তো পড়াশোনায় ভালো ছিল। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে শান্ত ও মিশুক শিক্ষার্থী হিসেবে বর্ণনা করেছে। কিন্তু একটি শিশুর বিদ্যালয়ের পরিচয়ই তার সম্পূর্ণ পরিচয় নয়। তার আরেকটি পৃথিবী থাকে—বন্ধুদের পৃথিবী, মুঠোফোনের পৃথিবী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পৃথিবী। সেই পৃথিবীতে সে কী করছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, কার ওপর বিশ্বাস করছে—আমরা কতটা জানি? এখানেই আমার সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা।
আমরা কি সন্তানকে শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি জীবনের জন্যও প্রস্তুত করছি? অপ্রতিমের মৃত্যু কোনো পরিবারের একক ব্যর্থতার গল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। তদন্তে যেসব তথ্য এসেছে, সেগুলোর ভিত্তিতে আইনগত দায় নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত। কিন্তু সামাজিক শিক্ষা নেওয়ার জায়গায় আমাদের প্রশ্ন আরও বড়।
একটি দামি ফোন, পাঁচ হাজার টাকা, কিছু ভিডিও, কিছু বন্ধুত্ব—এসবের পেছনে যদি একটি শিশুর জীবন হারিয়ে যায়, তাহলে আমাদের বুঝতে হবে সমস্যাটি শুধু অপরাধীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ এবং সমাজ—সব জায়গাতেই প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অপ্রতিমকে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব না কিন্তু তার মৃত্যু যদি বাংলাদেশের হাজারো বাবা-মাকে আজ রাতে সন্তানের ঘরে গিয়ে একটি প্রশ্ন করতে শেখায়—“তুমি আজ কার সঙ্গে সময় কাটিয়েছ?”
যদি একজন বাবা সন্তানের মুঠোফোন হাতে নিয়ে শুধু খেলা বা ফলাফল না দেখে জিজ্ঞেস করেন—“তোমার অনলাইন বন্ধুরা কারা?”
যদি একজন মা সন্তানের কথা শোনার আগে তাকে বকাঝকা না করে বলেন—“কোনো বিপদে পড়লে আমাকে বলবে, আমি তোমার পাশে আছি।”
যদি একটি বিদ্যালয় পরীক্ষার নম্বরের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর সামাজিক ও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেয়—তাহলেই অপ্রতিমের মৃত্যু আমাদের সমাজের জন্য একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা হয়ে থাকবে।
সন্তানকে পাহারা দেওয়া নয়—সন্তানের পৃথিবীকে জানা; সন্তানকে ভয় দেখানো নয়—সন্তানকে সচেতন করা;শুধু ভালো ফল নয়—ভালো মানুষ ও নিরাপদ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের নতুন শিক্ষা দর্শন।অপ্রতিমের জন্য আমাদের শোক থাকুক। কিন্তু সেই শোকের সঙ্গে থাকুক আমাদের জিজ্ঞাসা, আমাদের আত্মসমালোচনা এবং পরিবর্তনের অঙ্গীকার।
লেখক বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (অব), বিশিষ্ট কলামিস্ট, নীতি ও জননিরাপত্তা বিশ্লেষক





