কিন্তু চল্লিশ বছর বয়সে এসে একটি প্রশ্ন বারবার মাথায় ঘুরে ফিরে আসে-আমরা যে ইতিহাস পড়েছি, সেই ইতিহাসের স্বপ্নের বাংলাদেশ কি সত্যিই তৈরি হয়েছে? প্রশ্নটি কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়। বরং প্রশ্নটি আমাদের সবার জন্য। কারণ ইতিহাস যদি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হয়, তাহলে ইতিহাস তার শক্তি হারায়। আর মুক্তিযুদ্ধ যদি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হয়, তাহলে শহীদের রক্তের মর্যাদা কোথায়?
স্বাধীনতার কারণ কি শুধু একটি পতাকা?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে কেবল ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বরের নয় মাসে সীমাবদ্ধ করলে ইতিহাসের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য বহু বছর ধরে জমা হচ্ছিল। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার প্রশ্ন থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অসম বণ্টন-সবকিছুই মানুষের ক্ষোভকে ক্রমশ বাড়িয়ে তোলে। ঐতিহাসিক গবেষণায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন ব্যয়ের বৈষম্যের কথাও উঠে এসেছে।
১৯৭০ সালের নির্বাচন সেই সংকটকে চূড়ান্ত রাজনৈতিক রূপ দেয়। পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল বিজয় অর্জন করে এবং জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়ে ওঠে। কিন্তু নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হয়। এরপর অসহযোগ আন্দোলন, সামরিক দমন-পীড়ন এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার যুদ্ধের দিকে পরিস্থিতি এগিয়ে যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে ছিল শুধু একটি ভূখণ্ড আলাদা করার আকাঙ্ক্ষা নয়; ছিল রাজনৈতিক অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক ন্যায়, ভাষা-সংস্কৃতির মর্যাদা এবং মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।
স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতিতেও সেই স্বপ্নের প্রতিফলন রয়েছে। সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে শোষণমুক্ত সমাজ, মানবাধিকার, আইনের শাসন, সাম্য ও ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে-যে স্বপ্ন সংবিধানে লেখা হলো, বাস্তব জীবনে তার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে? মুক্তিযুদ্ধকে কি আমরা দলীয় সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছি? আমাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতাগুলোর একটি সম্ভবত এখানেই।
মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের একার সম্পত্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধ একটি জাতির অভিজ্ঞতা। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, নারী, তরুণ-বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেই সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, কেউ আশ্রয় দিয়েছেন, কেউ তথ্য দিয়েছেন, কেউ অর্থ দিয়েছেন, কেউ শরণার্থী হিসেবে সীমান্ত পেরিয়েছেন, কেউ নিজের পরিবার ও সম্পদ হারিয়েছেন।
কিন্তু স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠেছে-এমন অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার এসেছে।
এক দল মুক্তিযুদ্ধের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যাকে নিজের রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি করেছে, অন্য দল সেই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছে। কখনো মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, কখনো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে খণ্ডিত বা অস্বীকার করার প্রবণতাও দেখা গেছে। ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সত্য।
একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় কোনো দলের সদস্যপদ দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা হওয়া উচিত তার ত্যাগের ভিত্তিতে। আবার মুক্তিযুদ্ধের নামে কোনো রাজনৈতিক দলের অন্যায় বা দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগও থাকা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় সম্পত্তি না বানিয়ে জাতীয় সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই হতে পারে সত্যিকারের শ্রদ্ধা।
তাহলে ৫৫ বছর পর আমাদের অর্জন কোথায়? এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ আজ আর ১৯৭১ সালের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা দেশ নয়। অর্থনীতি, শিক্ষা, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও সামাজিক নানা সূচকে দেশ এগিয়েছে। কোটি কোটি মানুষের জীবনমান বদলেছে।
কিন্তু উন্নয়ন আর স্বাধীনতার স্বপ্ন এক জিনিস নয়। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে মানুষ নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে, ভোটের মূল্য থাকবে, আইনের চোখে সবাই সমান হবে, ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের জন্য একই আইন প্রযোজ্য হবে, দুর্নীতির কাছে রাষ্ট্র পরাজিত হবে না এবং একজন নাগরিক তার যোগ্যতার ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যেতে পারবে। কিন্তু তা হচ্ছে কি?
সংবিধানের ভাষায়ও রাষ্ট্রের লক্ষ্য শোষণমুক্ত সমাজ, মানবাধিকার, সাম্য, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। তাই আজ যদি একজন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করেন-“আমার ভোটের মূল্য কোথায়?”, “চাকরি পেতে কেন পরিচয় লাগে?”, “আইন সবার জন্য সমান নয় কেন?”, “দ্রব্যমূল্যের চাপে পরিবার চালানো কঠিন কেন?”, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এত সমস্যা কেন?” তাহলে তাকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বলা যায় না। বরং এই প্রশ্নগুলোই মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ইতিহাসের মালিক রাজনৈতিক দল নয়
আমার মনে হয়, আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে ইতিহাসের মালিকানা নিয়ে। আমরা বলেছি-এই ইতিহাস আমার, ওই ইতিহাস তোমার কিন্তু ইতিহাস কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।
নতুন প্রজন্মই কি পারবে ইতিহাসকে মুক্ত করতে? সম্ভবত এখানেই আশার জায়গা। আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে বেশি তথ্যের নাগরিক। তাদের হাতে বই আছে, আর্কাইভ আছে, আন্তর্জাতিক নথি আছে, আদালতের রায় আছে, ডিজিটাল লাইব্রেরি আছে, আবার ভুল তথ্যও আছে।
তাই তাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো-কাকে বিশ্বাস করবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ বললেই ইতিহাস সত্য হয়ে যায় না। আবার রাষ্ট্র বা কোনো রাজনৈতিক দল বললেই সেটিও শেষ সত্য হয়ে যায় না। প্রতিটি দাবির সঙ্গে দলিল চাইতে হবে। কে কী বলেছিল-তার মূল নথি দেখতে হবে। কোন ঘটনা ঘটেছিল-তার একাধিক স্বাধীন উৎস মিলিয়ে দেখতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের ভূমিকা কী ছিল-তার সমর্থন ও বিরোধিতা দুটোই পড়তে হবে। আদালতের রায় পড়তে হবে, ঐতিহাসিক দলিল পড়তে হবে, আন্তর্জাতিক নথি পড়তে হবে, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য যাচাই করতে হবে। ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্লোগান থেকে বের করে গবেষণার টেবিলে বসাতে হবে।
শেষ কথা: স্বাধীনতার বিচার হবে নাগরিকের জীবনে ৫৫ বছর পর এসে আমার কাছে স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় অর্থ পতাকা নয়, শুধু ভূখণ্ডও নয়। স্বাধীনতার অর্থ হলো একজন মানুষ যেন ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে। একজন তরুণ যেন রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই চাকরি পেতে পারে। একজন কৃষক যেন তার উৎপাদনের ন্যায্য দাম পায়। একজন শ্রমিক যেন তার অধিকার পায়। একজন নারী যেন নিরাপদে চলতে পারে। একজন সংখ্যালঘু যেন রাষ্ট্রের সমান নাগরিক হিসেবে বাঁচতে পারে। একজন বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষ যেন রাষ্ট্রের শত্রু না হয়ে নাগরিক হিসেবেই বিবেচিত হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়, তার ত্যাগের কারণে সম্মানিত হন। আর একজন সাধারণ নাগরিক যেন বলতে পারেন-এই রাষ্ট্রটি সত্যিই আমার। আমরা যদি সত্যিই মুক্তিযুদ্ধকে সম্মান করতে চাই, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় বাক্স থেকে বের করে আনা। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি কিংবা অন্য কোনো দল-কেউই মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র মালিক নয়। মুক্তিযুদ্ধের মালিক বাংলাদেশের জনগণ। শহীদের রক্তের মালিক কোনো রাজনৈতিক দল নয়। আর ইতিহাসের মালিকানা কোনো সরকারের হাতে নয়। ইতিহাসের মালিক ইতিহাস নিজেই। তাই আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে আমার একটাই আবেদন-কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করবেন না, কাউকে অন্ধভাবে ঘৃণাও করবেন না। দলিল পড়ুন, প্রশ্ন করুন, প্রমাণ খুঁজুন। কারণ সত্যিকারের স্বাধীনতা শুধু একটি দেশের জন্ম নয়। সত্যিকারের স্বাধীনতা হলো-সত্য জানার স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং নিজের বিবেক দিয়ে সত্যকে গ্রহণ করার স্বাধীনতা। যে বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে জন্ম নিয়েছিল, ৫৫ বছর পর তার কাছে আমাদের সবচেয়ে বড় ঋণ হলো-সেই বাংলাদেশকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে তুলে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা। সেদিনই হয়তো আমরা বলতে পারব-আমরা শুধু একটি দেশ স্বাধীন করিনি; আমরা স্বাধীনতার স্বপ্নটাকেও সত্যি করেছি।
লেখক : মীর্জা মসিউজ্জামান
গণমাধ্যমকর্মী