১৯৯১ সালে আবদুর রহমান বিশ্বাস ও বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর সংসদীয় ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যায়নি। ক্ষমতাসীন দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তিনিই রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ধীরে ধীরে এমন এক সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছিল, যেখানে ভোট ছিল, কিন্তু ভোটের ফল নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল না।

এবার অন্তত সেই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তবে শুধু ভোটের আয়োজন হলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। ভোট কতটা অর্থবহ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা কতটা কার্যকর এবং নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি কতটা সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।

সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও তার মিত্রদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ফলাফল নিয়ে বাস্তবিক অর্থে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। বিরোধী জোটের প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও তাদের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, এতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অন্তত একতরফা আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ পেয়েছে। গণতন্ত্রে জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখানেই বড় প্রশ্ন- রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন, নাকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে একজন যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার প্রকৃত প্রক্রিয়া?

আইন অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। আবার সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগও কার্যত সীমিত। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত মতামত কতটা প্রতিফলিত হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

একজন সংসদ সদস্য যদি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা না পান, তাহলে তাঁর হাতে থাকা ব্যালট কতটা ব্যক্তিগত পছন্দের প্রতিফলন, এটি ভাবার বিষয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে ভোট যদি শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনে পরিণত হয়, তাহলে নির্বাচনটি তার গণতান্ত্রিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশ হারায়।

এখানেই জুলাই সনদের প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আইনসভার উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দলের পদে থাকতে পারবেন না—এমন প্রস্তাবও রয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদকে দলীয় আনুগত্যের গণ্ডির বাইরে এনে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার চিন্তা সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে।

কিন্তু সেই সংস্কার বাস্তবায়নের আগেই বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিরোধী জোটের আপত্তির অন্যতম জায়গা এখানেই।

আমার বিবেচনায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর এই মতবিরোধকে শুধু দলীয় দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নও গভীরভাবে জড়িত। জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছেছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের বিতর্ক আবারও সামনে আসবে।

অন্যদিকে বিরোধী জোটের প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তকেও ইতিবাচকভাবে দেখা যায়। তারা হয়তো সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবে জয়ী হওয়ার অবস্থানে নেই। কিন্তু নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জনগণের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করা নয়; ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করা, বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া এবং জনগণের সামনে ভিন্ন রাজনৈতিক পথ উপস্থাপন করাও তাদের দায়িত্ব।

তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত আনুগত্য কিংবা দলীয় পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়ায় পরিণত না হয়। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত হন। তাই তাঁর সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হওয়া উচিত দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা, সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জাতীয় সংকটে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখার যোগ্যতা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত হয়, তাহলে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রতিকূল সময়ে দলের নেতৃত্ব দেওয়া এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস অবশ্যই বিবেচনায় আসবে। একইভাবে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ মুক্তিযোদ্ধা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে বিরোধী জোটের প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁদের মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত ব্যক্তি পরিচয় বা দলীয় অবস্থান নয়; বরং সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের প্রতি তাঁরা কতটা নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল থাকবেন, সেটিই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা হলো, ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় দলীয় প্রভাবমুক্ত হতে পারে না। সরকার বদলায়, মন্ত্রী বদলায়, ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের সংস্কৃতি অনেক সময় বদলায় না।

রাষ্ট্রপতি পদও যদি কেবল ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত ব্যক্তিকে বসানোর একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, তাহলে পদটির সাংবিধানিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাষ্ট্রপতি কোনো দলের নন; তিনি রাষ্ট্রের। এই মৌলিক ধারণাটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত না হলে শুধু নির্বাচন পদ্ধতি বদলে খুব বেশি লাভ হবে না।

এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন তাই একটি সুযোগও বটে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রপতি পদকে আরও মর্যাদাপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

শেষ পর্যন্ত কে রাষ্ট্রপতি হবেন, তা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসাবেই প্রায় নির্ধারিত। কিন্তু এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য কী বার্তা রেখে যাবে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা কি আবারও শুধু সংখ্যার রাজনীতিতে ফিরে যাব, নাকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার পথে এগোব- তার উত্তর ভবিষ্যৎ রাজনীতিই দেবে।

৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের লড়াই হচ্ছে- এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কেবল দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের প্রতিযোগিতা হয়ে না থাকে। এটি যেন রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদা, সাংবিধানিক ভারসাম্য, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করে- এটাই প্রত্যাশা।

কারণ রাষ্ট্রপতি কে হলেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপতি প্রতিষ্ঠানটি কতটা শক্তিশালী, মর্যাদাপূর্ণ এবং জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারল।

আর তাই বঙ্গভবনের চাবি কার হাতে যাচ্ছে, এটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, চাবি হাতে যিনি যাবেন, তিনি শেষ পর্যন্ত কার দরজা খুলবেন- দলের, নাকি রাষ্ট্রের?

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই প্রশ্নের উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মো. মীর মারুফ তাসিন

গণমাধ্যমকর্মী

এমএম