বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা সংবাদ মাধ্যমের ওপর আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দুটি বাংলা দৈনিক এবং আরো ৩টি টেলিভিশন চ্যানেল। এই ৫টি সংবাদ মাধ্যমেই বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের সংবাদ প্রচার করা হতো। গত ক'বছরে সাময়িকভাবে এগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।
শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতাসীন দলটি ব্যক্তি মালিকাধীন টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর জন্য একটি জাতীয় প্রচার নীতিমালা প্রবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলছে, এই নীতি ‘অবাধ ও সুষ্ঠু সংবাদ প্রচার’ নিশ্চিত করবে।
তবে সমালোচকরা একে দেশের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য একটি অশুভ সঙ্কেত হিসেবেই দেখছেন।
নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবীর সংবাদ সংস্থা আল জাজিরা প্রতিনিধিকে বলেন,‘যখনই কোনো সরকার সংবাদমাধ্যমের নীতিমালা আরোপের বিষয়ে কথা বলেন তখন কারো বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যই তারা সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছে।
সংবাদ মাধ্যমের সাময়িক বন্ধ ঘোষণা প্রসঙ্গে
গত ১৬ জানুয়ারি ‘সাময়িকভাবে’ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বাংলা সংবাদপত্র দৈনিক ইনকিলাব। সাতক্ষীরায় ভারতীয় সেনাবাহিনী যৌথ অভিযানে অংশ নিচ্ছে বলে সংবাদ পরিবেশনের পর পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে পত্রিকাটির অনলাইন প্রকাশনা অব্যাহত রয়েছে।
সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন গুজব আর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পত্রিকাটিতে সাতক্ষীরার ওপর অনুসন্ধানমূলক ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছিল। সেখানে দাবি করা হয়, গত ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের আগে থেকেই সহিংসতাপূর্ণ জেলাটিতে যৌথ অভিযানে অংশ নিয়েছিল ভারতীয় সেনারা।
এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর প্রতিবেদক আহমদ আতিকসহ চার সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এ সম্পর্কে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গত ১৭ জানুয়ারি এক বিবৃতিতে বলেছেন,‘বিভ্রান্তমূলক রিপোর্ট প্রকাশ করার জন্য দৈনিক ইনকিলাব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইনকিলাব কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় যদি জিততে পারেন, তবে তারা আবার পত্রিকা প্রকাশ করতে পারবেন।’
সরকার পত্রিকাটির বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করেছে তাতে বলা হয়েছে, দেশ এবং সামরিক বাহিনীর ইমেজ ক্ষুন্ন করতে পত্রিকাটি একটি ভিত্তিহীন ও মনগড়া রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
ঢাকার এক আদালত গত ২০ জানয়ারি পত্রিকাটির আটক রিপোর্টার আহমেদ আতিকের বিরুদ্ধে দু দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আর নিউজ এডিটর রবিউল্লাহ রবি এবং সহকারী চিফ রিপোর্টার রফিক মোহাম্মদকে পাঠানো হয় জেলহাজতে।
ইনকিলাবের পক্ষের আইুনজীবী সৈয়দ আহমদ গাজি বলেন, আদালতে প্রতিবেদনটির বিভিন্ন সূত্র উত্থাপন করার পরও সাংবাদিকদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। তিনি আল জাজিরাকে আরো বলেন,‘অহেতুক পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর প্রিন্ট সংস্করণ বন্ধ করার পক্ষে সরকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে পারেনি।’
এ সম্পর্কে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রেসিডেন্ট শাহেদ চৌধুরী বলেন, কোনো রিপোর্টের বিষয়ে আপত্তি থাকলে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ জানাতেই পারে এবং এখানে এটাই স্বাভাবিক। কোনো সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের দরকার হয়না।
এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাংবাদিকরা আশঙ্কা করছেন, ইনকিলাবের পরিণতি হবে আমার দেশের মতোই। বিরোদী দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত এ পত্রিকাটির কার্যালয়ে পুলিশি তল্লাসির পর ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে এটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে সরকারি দলের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত পত্রিকাটির সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে।
গতবছরের আগস্ট মাসে পত্রিকাটি বন্ধের ঘোষণা কেন অবৈধ হবে না, এ বিষয়ে সরকারের কাছে কারণ জানাতে চেয়ে একটি রুলিং জারি করেছিল হাইকোর্ট। কিন্তু সরকার আদালতের এ নির্দেশের কোনো জবাব দেয়নি। এমনকি এ মামলাটির কোনো শুনানিও হয়নি।
গত বছরের ৬ মে ধর্মীয় উন্মাদনা এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ এনে প্রচারণা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দিগন্ত এবং ইসলামি টিভি চ্যানেল দুটি। ঢাকায় হেফাজতি ইসলামির সমাবেশের খবর প্রচার করার সময় তাদের প্রচারণা বন্ধ করে দেয়া হয়।
এ সম্পর্কে ইসলামি টেলিভিশনের মহাব্যবস্থাপক শামস ইস্কান্দর আল জাজিরাকে বলেন,‘ওইদিন সরকারপন্থী চ্যানেলগুলোর মতো আমরাও ২৪ ঘণ্টার সংবাদ ফুটেজ প্রচার করছিলাম। পরে আমরা তথ্যমন্ত্রীর কাছে সংবাদ প্রচার করা ছাড়াই চ্যানেলটি চালাতে দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।’
আল জাজিরা প্রতিনিধি এসব সংবাদ মাধ্যমগুলির পরিণতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কাছে। উত্তরে মন্ত্রী বলেন, ‘তাদের সংবাদ প্রকাশনা ও সম্প্রচারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত করে দেখছে সরকার। তদন্ত শেষ হলে এদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।’
তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ রাজনৈতিক হীনমন্যতার কারণেই সরকার এই সংবাদ মাধ্যমগুলো এগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। তবে তাদের এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তথ্যমন্তী। তিনি বলেন,‘ইনকিলাব পত্রিকাটি ইতিমধ্যে তাদের প্রকাশিত রিপোর্টের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছে। কাজেই বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ভিত্তিহীন।’
সম্প্রচার নীতিমালা
জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালার খসড়া নিয়ে অনেক সাংবাদিক বিশেষ করে যারা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কাজ করছেন তারা আতঙ্কে রয়েছেন। প্রস্তাবিত এ নীতিমালায় সম্প্রচার, লাইসেন্স প্রদান এবং বিজ্ঞাপনের ওপর একটি গাইডলাইন রয়েছে। সেখানে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের ওপর রয়েছে পৃথক একটি ধারা।
সরকারি ও বেসরকারি ৪৬টি টিভি চ্যানেলের ওপর ৪০টি ধারা ও উপধারা সম্বলিত নীতিমালাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি অনুমোদিত হলে লাইসেন্স প্রদান করা সহ টিভি চ্যানেলগুলোর ওপর তথ্য মন্ত্রণালয়ের খবরদারি বাড়বে।আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই নীতিমালা সংসদে পাশ হবে বলে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী ইনু আরো বলেন,‘ আগামী ২৯ জানুয়ারি আমরা আরো একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি যা থেকে আরো বেশি ফিডব্যাক পাবো।’
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার অবমাননা
নতুন নীতিমালার সমালোচনা করে নিউ এজ পত্রিকার সাংবাদিক নুরুল কবীর বলেন, ভিন্নমতালম্বীদের কণ্ঠরোধ করার জন্যই এই নীতিমালা গৃহীত হতে যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন,‘ প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে এই যে, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যই তারা সংবাদ মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিকলা্পনা করছে। এজন্যই তারা মূলধারার দুটি সংবাদপত্র এবং দুটি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিয়েছে।’ তিনি সরকারের এ পদক্ষেপকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার স্পষ্ট লঙ্ঘণ বলেও উল্লেখ করেছেন।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফাহমিদুল হক ইনকিলাব পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটিকে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়ার সরকারি পদক্ষেপেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি নতুন নীতিমালা প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকারি কর্মকাণ্ডের সমালোচনার অধিকার সীমিত করা বা সরকারের লাইসেন্স বাতিলের অধিকার দিয়ে যে নীতিমা্লাই করা হউক না কোনো, এটি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাকে খর্ব করবেই।’ তাই এ ধরনের পদক্ষেপ বন্ধের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেতন থাকতে হবে।
[b]ঢাকা, জানুয়ারি ২৮ (টাইমনিউজবিডি.কম) //এসএইচ[/b]
আতঙ্কে বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা : আসছে ...নিয়ন্ত্রণ
বাংলাদেশের সংবাদকর্মীরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা সংবাদ মাধ্যমের ওপর আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দুটি বাংলা দৈনিক এবং আরো ৩টি টেলিভিশন চ্যানেল। এই ৫টি সংবাদ মাধ্যমেই বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের সংবাদ প্রচার করা হতো। গত ক'বছরে সাময়িকভাবে এগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়
ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হলো ইনুকে
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ ১০ বছরের সাজা থেকে খালাস চেয়ে ইনুর আপিল
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায় থেকে খালাস চেয়ে আপিল করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
ইনুর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের আপিল
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যাসহ ৮ অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করছে আইসিটি প্রসিকিউশন।
শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত ছিলেন ইনু : চিফ প্রসিকিউটর
জুলাই আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধে গত ৩০ জুন রায় হয় জাসদ নেতা ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর। রায়ে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে, এখানেই শেষ নয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেক মামলায় এবার আসামি হচ্ছেন হাসানুল হক ইনু।
নাহিদ ইসলাম ৫ আগস্ট জুলাই জাদুঘর খুলে না দিলে জনগণই খুলবে
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আগামী ৫ আগস্ট গণভবনে প্রতিষ্ঠিত জুলাই স্মৃতি জাদুঘর জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে ঘোষণা থাকলেও সেদিন জাদুঘর খোলার বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ওইদিনের আগেই জাদুঘরটি খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন জুলাই আন্দোলনে এক দফার ঘোষণাকারী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। না হলে জনগণই ওইদিন জাদুঘরটি খুলে ফেলবে বলেও তিনি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
















