তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও এখনো তারা ন্যায্য মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সব খাতে নিয়মিত মজুরি পুনর্নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে।

শুক্রবার ‘শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়ন অনিবার্য’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পিরোজপুরে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জেলা সভাপতি খন্দকার ছিদ্দিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খান, অঞ্চল সহকারী পরিচালক মশিউর রহমান, জেলা প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা আব্দুর রব, জেলা উপদেষ্টা জহিরুল হক ও আব্দুর রাজ্জাক শেখসহ অন্যরা।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি শ্রমজীবী মানুষ হলেও তাদের অনেকেই এখনো ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত।

নবম পে-স্কেল ঘোষণার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, এর আদলে দেশের সব খাতের মজুরি কমিশন ও মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে ন্যায্য মজুরি ঘোষণা করা উচিত। মজুরি পুনর্নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করে একটি স্থায়ী ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো ব্যবস্থা চলতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে শ্রমিকরা আবার রাজপথে নামবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কৃষকদের সার সংকটের প্রসঙ্গ তুলে আতিকুর রহমান বলেন, কৃষকরা মাঠে সার পাচ্ছেন না, অথচ দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সংকট নেই বলে দাবি করছেন। সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হলে কিংবা সিন্ডিকেট করে জনগণকে জিম্মি করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিভিন্ন অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই করা হচ্ছে। চাকরি হারানো অনেক শ্রমিক ন্যায্য পাওনা ও সার্ভিস বেনিফিট থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বছরের পর বছর আইনি প্রক্রিয়ায় ঘুরেও অনেকে প্রতিকার পাচ্ছেন না।

তিনি অবিলম্বে অন্যায়ভাবে শ্রমিক ছাঁটাই ও শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রথা বন্ধ করার দাবি জানান।

আতিকুর রহমান বলেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বিদ্যমান চাকরি রক্ষার বিষয়েও সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। গত কয়েক মাসে কতজন নতুন চাকরি পেয়েছেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকরা যাতে জুলুম ও বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমিক নেতাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও তাদের ভাগ্যের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন হয়নি। শ্রমিক-মালিক উভয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করে মানবিক ও বৈষম্যহীন শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই শ্রমিকের সব অধিকার নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক শ্রমব্যবস্থা।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং মালিক ও শ্রমিক উভয়েই জবাবদিহির আওতায় থাকবেন।

এদিকে একই দিনে বরগুনায় বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের দিনব্যাপী দায়িত্বশীল শিক্ষা শিবির অনুষ্ঠিত হয়েছে। নূরে হেরা দাখিল মাদ্রাসার মিলনায়তনে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি ও বরিশাল অঞ্চল পরিচালক অধ্যাপক হারুন অর-রশিদ খান এবং বরগুনা জেলা ফেডারেশনের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মাওলানা মুহিবুল্লাহ হারুন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বরগুনা জেলা ফেডারেশনের সভাপতি মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস।

এর আগে ঝালকাঠিতে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ইউনিয়ন দায়িত্বশীল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জেলা সভাপতি মাওলানা মেরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে আয়োজিত সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খান, অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান এবং সহকারী অঞ্চল পরিচালক মশিউর রহমান।

সমাবেশে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

এমএম