চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেছেন, দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছে। সরকার এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ১৮০ দিনের মধ্যে। কিন্তু এখন এক বছরের মধ্যেও তা সম্ভব নয় বলে সময় বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে সব সময় প্রতারণা হয়।’
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর শাখা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, দেশের তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। অথচ কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং এখন সময় বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। তার ভাষ্য, মেধার ভিত্তিতে চাকরি হবে—এটাই প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তিনি অভিযোগ করেন, একসময় নিয়োগে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত কোটার বিষয় সামনে এসেছিল। এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
কোটা আন্দোলনের প্রসঙ্গ
ছাত্রশিবির ১৯৯৬ সাল থেকেই কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছে বলে দাবি করেন সিবগাতুল্লাহ। তিনি বলেন, সংগঠনটি সবসময় মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবি জানিয়ে এসেছে এবং এ দাবিতে রাজপথেও আন্দোলন করেছে।
তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও উপলব্ধি করেছে যে নিজেদের দাবি আদায়ে তাদের রাজপথে নামতে হবে। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে নেমে এসেছিল।
সিবগাতুল্লাহ বলেন, তরুণদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে একটি ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার ওপর। সেখানে মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেন নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য বা অযাচিত প্রতিবন্ধকতার মুখে না পড়ে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিবন্ধন পরীক্ষার নিয়োগ নিয়ে অভিযোগ
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন ছাত্রশিবিরের এই নেতা। তিনি দাবি করেন, দেশে চাকরির সুযোগ এমনিতেই সীমিত। এর মধ্যে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও নতুন করে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
সিবগাতুল্লাহ বলেন, তার কাছে এ বিষয়ে একটি ‘ইন্টারনাল সার্কুলার’ এসেছে বলে তিনি দাবি করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এতদিন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) আওতায় সম্পন্ন হতো। কিন্তু এখন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, স্থানীয় পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বক্তব্যে তিনি ১০ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তোলেন।
তবে অনুষ্ঠানে তিনি যে সার্কুলারের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটির বিস্তারিত বা সরকারি কোনো নথি প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর স্বতন্ত্র যাচাইও প্রতিবেদনের এই পর্যায়ে সম্ভব হয়নি।
‘মেধাবীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে’
সিবগাতুল্লাহ বলেন, একদিকে দেশের তরুণরা চাকরি পাচ্ছে না, অন্যদিকে যারা শিক্ষাজীবনে ভালো ফলাফল করছে, তাদের জন্যও বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাদের যেন চাকরি বা ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে অযাচিত বাধার মুখোমুখি হতে না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কৃতী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম ইতিবাচক পরিবর্তন চায়। সবাই যদি ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে ভালো ও পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলে, তাহলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ
ছাত্র রাজনীতির প্রসঙ্গে সিবগাতুল্লাহ বলেন, অতীতে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নীরব থাকার কারণে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম চলতে পেরেছিল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের ‘গেস্টরুম’ ও ‘গণরুম’ সংস্কৃতির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
তিনি দাবি করেন, শিক্ষার্থীরা সাহস করে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ শুরু করার পর এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। তার বক্তব্যে ছাত্রসমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
তিনি বলেন, ছাত্রশিবির তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে এবং তাদের নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে চায়। তরুণদের ইতিবাচক ভূমিকার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর শাখা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
এ ছাড়া ছাত্রশিবিরের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তারা কৃতী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান এবং ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।
সিবগাতুল্লাহ সিবগা তার বক্তব্যে তরুণদের কর্মসংস্থান, নিয়োগে মেধার মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।
তার বক্তব্যে কর্মসংস্থান ও নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে যেসব অভিযোগ ও দাবি উঠে এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
এমএম