তবে মুহাম্মদ হুজদিক হুদজিচের মুখের দিকে তাকালে দর্শকরা দ্রুতই বুঝতে পারেন, এই গোরস্তানের পেছনে লুকিয়ে আছে এক গা শিউরে ওঠা, নির্মম আর পৈশাচিক ইতিহাস। এখানে যারা চিরনিদ্রায় শায়িত, তাদের একেকজনকে হত্যা করা হয়েছে হরর সিনেমার চেয়েও নৃশংস কায়দায়। বছরের পর বছর ধরে পরিচয়হীনভাবে মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল তাদের লাশ। দীর্ঘ সময় পর সেই দেহাবশেষগুলো সংগ্রহ করে এখানে সমাহিত করা হয়েছে, যা বিশ ও একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম জঘন্যতম গণহত্যার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটিই ইতিহাসের কুখ্যাত স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা।

তিন দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও সেই ভয়াবহতার দাগ মোছেনি মুহাম্মদের মুখ থেকে। এই গোরস্তানে তার নিজের পরিবারেরই ৭৬ জন সদস্যের কবর রয়েছে। বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া প্রায় আট হাজার নিরস্ত্র বসনীয় মুসলিমের কয়েকজন তারা। অথচ এই খুনিরা কিছুদিন আগেও ছিল তাদের প্রতিবেশী, সহপাঠী কিংবা খেলার সাথি। এই পাশবিকতার মাঝে রেহাই পায়নি নারীরাও, প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি বসনীয় নারী সেই সময় ধর্ষণের শিকার হন।

এই ট্র্যাজেডির গল্প বেঁচে যাওয়া মানুষদের চেয়ে আর কেউ এত নিখুঁতভাবে বলতে পারবে না। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের চেহারায় সেই দুঃসহ স্মৃতির প্রতিটি ক্ষত স্পষ্ট। কেউ কেউ নিজ স্বজনের পচে যাওয়া হাড় কিংবা সামান্য দেহাবশেষ দাফন করার জন্য অপেক্ষা করেছেন এক দশকেরও বেশি সময়।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়েছিল শীতল যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব সাময়িকভাবে কমলেও পূর্ব ইউরোপের বুকে তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল উগ্র জাতীয়তাবাদ আর জাতিগত বিদ্বেষের বারুদ।

ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নিজেদের আলাদা রাষ্ট্র গঠনের জন্য বলকান অঞ্চলের এই জাতিগত সংঘাতের আগুন তখন জ্বলছিল। কারণ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এই বলকানেরই এক সার্ব তরুণ গাভরিলো প্রিন্সিপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বালিয়েছিলেন। ফলে সেই উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষ যে এক শতাব্দীরও কম সময়ে ফুরিয়ে যাবে না, তা বলাই বাহুল্য।

আমেরিকান সাংবাদিক ডেভিড রিফ তার বলকান ক্রাইসিস অ্যান্ড দ্য ফেইলিওর অব দ্য ওয়েস্ট বইয়ে লিখেছেন, যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন যখন শুরু হয়, তখন থেকেই স্পষ্ট ছিল যে ক্রোয়েশিয়ান এবং সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদীরা সীমানার চেয়ে নিজেদের জাতিগত বিশুদ্ধতার রাষ্ট্র গঠনে বেশি আগ্রহী ছিল। সার্বরা স্বপ্ন দেখছিল যে সব সার্ব নাগরিক তাদের নিজস্ব একটি বৃহৎ রাষ্ট্রে বসবাস করবে।

১৯৯১ সালের ২৫ জুন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস বেকার বেলগ্রেড সফর করেন। তিনি ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়াকে সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেবে না। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা অনেক দেরিতে এসেছিল। যুগোস্লাভিয়ার বিভাজন ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। বেকারের ভাষণের দুদিন পরই ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এর জবাবে যুগোস্লাভ সেনাবাহিনী স্লোভেনিয়ায় হামলা চালালেও পরে পিছু হটে, যা ছিল স্লোভেনিয়ার স্বাধীনতার পরোক্ষ স্বীকৃতি।

তবে যুগোস্লাভিয়া কোনোভাবেই ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা মেনে নিতে পারছিল না। কারণ স্লোভেনিয়ায় সার্বদের উপস্থিতি না থাকলেও ক্রোয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক সার্ব বসবাস করত। এই সার্ব সংখ্যালঘুদের রক্ষার অজুহাতে যুগোস্লাভ জাতীয় সেনাবাহিনী ১৯৯১ সালের জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ক্রোয়েশিয়ায় আক্রমণ শুরু করে। এই অভিযানের মাধ্যমে তারা ক্রোয়েশিয়ার এক-তৃতীয়াংশ এলাকা দখল করে নেয়, যার বেশিরভাগই ছিল বসনিয়া সীমান্তের সংলগ্ন।

সার্বরা ক্রোয়েশিয়ার এই অংশটি দখল করে দাবি করে যে, এটি আর ক্রোয়েশিয়ার অংশ নয়, বরং সার্বিয়ান ক্রাজিনা প্রজাতন্ত্র। তখনই সার্বদের মনে বলকান অঞ্চলে গ্রেটার সার্বিয়া বা বৃহৎ সার্বিয়া গঠনের চরম আকাঙ্ক্ষা জেগে ওঠে। যুগোস্লাভিয়ার ধ্বংসাবশেষের ওপর যেন এক নতুন রক্তলোলুপ সার্বিয়া মানচিত্রের জন্ম নিচ্ছিল।

১৯৯২ সালের শুরু পর্যন্ত ক্রোয়েশিয়ায় যুদ্ধ চলে। এরপর ইউরোপীয় দেশগুলো ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়ার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিলে সার্ব ও ক্রোয়েশীয়দের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সফল হয়। তবে ক্রোয়েশিয়া বসনিয়া সীমান্তের সেই অংশটি আর ফেরত পায়নি।

ইউরোপীয় দেশগুলো তখন বুঝতে পারেনি যে স্লোভেনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতাকে তড়িঘড়ি স্বীকৃতি দেওয়ার ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। যদিও মার্কিন কূটনীতিক সাইরাস ভ্যান্স তৎকালীন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হ্যান্স-ডিয়েট্রিচ গেনশারকে সতর্ক করেছিলেন যে, এই স্বীকৃতির ফলে বসনিয়ায় যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে। বাস্তবে তা-ই ঘটেছিল। নিয়ম অনুযায়ী সার্বদের নিরস্ত্রীকরণ করে সেখানে জাতিসংঘের সেনা মোতায়েনের কথা ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি। সার্বরা শুধু তাদের সামরিক পোশাক বদলে পুলিশের পোশাক পরেছিল, যার ফলে অস্ত্রগুলো তাদের হাতেই রয়ে যায়।

১৯৯১ সালের আগস্টে বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট আলি ইজ্জত বেগোভীচ সতর্ক করে বলেছিলেন, সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচ পুরো বসনিয়া গ্রাস করতে চান। ইউরোপের অনুরোধে ১৯৯২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বসনিয়ায় স্বাধীনতার ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। বসনিয়ার মুসলিম ও ক্রোয়াটরা, যারা জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি ছিল, স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে বসনিয়ার সার্ব নেতৃত্ব এই গণভোট বয়কটের ডাক দেয় এবং ভোটকেন্দ্র স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করে।

১৯৯২ সালের মার্চ মাসে, গণভোটের মাত্র কয়েকদিন পর, বসনিয়ান সার্ব মিলিশিয়ারা রাস্তাঘাটে ব্যারিকেড দেওয়া শুরু করে, যা তারা ক্রোয়েশিয়া যুদ্ধের সময়ও করেছিল। মার্চের শেষ নাগাদ তারা বসনিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। ওই বছরের ৬ এপ্রিল শুরু হয় সারায়েভো অবরোধ। একের পর এক শহরের পতন হতে থাকে এবং শুরু হয় বসনীয় মুসলিমদের ওপর সার্বদের বর্বর গণহত্যা।

সাংবাদিক ডেভিড রিফ লিখেছেন, এটিকে যুদ্ধ বলা আসলে সত্যের অপলাপ এবং সার্বদের অপরাধকে আড়াল করার শামিল। এটি ছিল স্রেফ একতরফা গণহত্যা। যুদ্ধের আগে ইজ্জত বেগোভীচ ভেবেছিলেন যে যুদ্ধ হবে না, কারণ তার পক্ষ থেকে কোনো উসকানি বা যুদ্ধপ্রস্তুতি ছিল না। কিন্তু প্রেসিডেন্টের এই সরল বিশ্বাসই বসনিয়ার মুসলিমদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।

‘আমি তোমার প্রতিবেশী, গুলি কোরো না’

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ডেভিড রিফ বসনিয়ায় যুদ্ধ সংবাদদাতা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বুঝতে চাচ্ছিলেন কেন ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্র এই বর্বরতা থামাতে এগিয়ে আসছে না। জাতিসংঘ ও শান্তিরক্ষী বাহিনী যেখানে ব্যর্থ, সেখানে সংবাদমাধ্যমের প্রচার মানুষের বিবেককে নাড়া দেবে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।

রিফ সারায়েভোতে তার এক বন্ধুর কথা স্মরণ করে বলেন, আমার সেই বন্ধু বলেছিল—প্রথমে আমি ছিলাম যুগোস্লাভিয়ান, তারপর হলাম বসনিয়ান, আর এখন আমি শুধু একজন মুসলিম। এই পরিচয় আমি নিজে বেছে নিইনি। আমি কখনোই খুব বেশি ধর্মীয় রীতিনীতি মানতাম না। কিন্তু যখন আমার চোখের সামনে দুই লাখ মানুষ খুন হয়ে গেল, তখন আমার আর কী করার আছে? প্রতিটি মানুষের তো মাথা গোঁজার একটা নিজস্ব দেশ লাগবে।

আমেরিকান এই সাংবাদিক বুঝতে পেরেছিলেন, যুদ্ধের শুরুতেও বসনিয়ার মুসলিমরা জাতিগত বা ধর্মীয় পার্থক্যকে গুরুত্ব দেয়নি। তারা সহাবস্থানে বিশ্বাস করত। কিন্তু তারা ভাবতেও পারেনি যে, একদিন তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী ও পরিচিত সার্বরাই তাদের দিকে বন্দুকের নল তাক করবে।

এই গণহত্যার শিকার ছদ্মনামধারী এক নারী প্রামাণ্যচিত্রে তার ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। ১৯৯২ সালে যখন এই যুদ্ধ শুরু হয়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। তিনি স্রেব্রেনিৎসার কাছের একটি গ্রামে বড় হয়েছিলেন, যেখানে মুসলিম ও অর্থোডক্স সার্বরা একসঙ্গে বাস করত।

তিনি বলেন, ১৯৯২ সালের এপ্রিলে সার্বরা আমাদের গ্রামের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। মানুষ ভয়ে গ্রাম ছাড়তে শুরু করে। মে মাসের এক রাতে হঠাৎ গুলির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙে। পরদিন আমরা বনে গিয়ে আশ্রয় নিই। কিন্তু সার্বরা বনেও বোমা বর্ষণ শুরু করে। একদিন সকালে আমি ও আমার ফুফু খাবারের খোঁজে যখন বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম দুজন সশস্ত্র সেনা আমাদের দিকে আসছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি, ওরা অন্য কেউ নয়, আমাদেরই সার্ব প্রতিবেশী।

সেই প্রতিবেশী যে তার সঙ্গে এমন পৈশাচিক আচরণ করতে পারে, তা তিনি কল্পনাও করেননি। নিজের ধর্ষণের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ও আমার হাত চেপে ধরেছিল এবং আমি যতবার চিৎকার করছিলাম, ততবার আমাকে আঘাত করছিল। সে চলে যাওয়ার পর আরেকজন সেনা ঘরে ঢুকল এবং সেও আমাকে ধর্ষণ করল। এরপর তৃতীয় আরেকজন এসে একই কাজ করল।

মুসলিমরা ভাবতেই পারেনি যে, বছরের পর বছর একসাথে থাকা মানুষগুলো এভাবে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। স্রেব্রেনিৎসার আরেক বাসিন্দা খাদিজা মুহাম্মাদোভিচ বলেন, ১৯৯২ সালের ১৭ এপ্রিল আমরা দেখলাম সার্বরা শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের অনেক সার্ব বন্ধু থাকা সত্ত্বেও তারা আমাদের কিছুই জানায়নি। টেলিভিশনে হত্যার দৃশ্য দেখলেও আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে যুদ্ধ আমাদের স্রেব্রেনিৎসাতেও পৌঁছাতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দানবেরা চলেই এল।

মুসলিমদের ওপর সার্বদের বর্বরতা:

সার্বরা বসনিয়ার অর্ধেকেরও বেশি এলাকা দখল করে নেয় এবং প্রতিটি অঞ্চলে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালায়, বিশেষ করে পূর্ব বসনিয়া ও স্রেব্রেনিৎসার আশপাশের এলাকায়। বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট আলি ইজ্জত বেগোভীচ আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আশায় কোনো সামরিক প্রস্তুতি নেননি, যা সাধারণ মানুষকে চরম বিপদে ফেলে দেয়। ফলে বাঁচার জন্য মানুষকে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল।

খাদিজা মুহাম্মাদোভিচ অশ্রুসজল চোখে স্মরণ করেন সেই মুহূর্তের কথা, যখন ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে তিনি তার দুই ছেলেকে অন্য এলাকায় রেখে আসার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ২০ বছর পার হয়ে গেলেও সন্তানদের রক্ষা করতে না পারার সেই অপরাধবোধ তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায়।

১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সার্ব মিলিশিয়াদের অবরুদ্ধ করে রাখা স্রেব্রেনিৎসার দৃশ্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। কামানের গোলার শব্দে প্রকম্পিত হতো চারপাশ। সার্বিয়ার সরাসরি সহায়তায় তিনটি সার্ব ব্রিগেড ২৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিলে বসনিয়ার প্রতিরোধ যোদ্ধারা পাহাড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফলে স্রেব্রেনিৎসা হয়ে ওঠে চারপাশের তাড়া খাওয়া মুসলিম উদ্বাস্তুদের শেষ আশ্রয়স্থল। শহরের জনসংখ্যা মুহূর্তের মধ্যে ৪০ হাজারে গিয়ে পৌঁছায়।

খাদিজা জানান, খাদ্য ও ওষুধহীন সেই অবরুদ্ধ শহরে আহতদের যন্ত্রণার চিৎকার পুরো উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত হতো। সাবেক সেনা আহমেদ উসতিচ জানান, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মানুষ ক্ষুধায় মারা যেত এবং অবিরাম বোমাবর্ষণের কারণে সেই লাশগুলো উদ্ধার করে দাফন করারও কোনো উপায় ছিল না।

লাশ আর উদ্বাস্তুর ভিড়ে স্রেব্রেনিৎসা যখন স্থবির, তখন জাতিসংঘ শহরটিকে সম্পূর্ণ বেসামরিক অঞ্চল এবং তাদের শান্তিরক্ষী বাহিনীর অধীনে নিরাপদ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘের আশ্বাসে বসনিয়ার যোদ্ধারা তাদের অস্ত্র জমা দেয়। কিন্তু এটিই ছিল জাতিসংঘের দেওয়া এক বিষাক্ত আপেল। শান্তিরক্ষী বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যেই সার্বরা প্রতিদিন শহরে নির্বিচারে শেল ছুড়তে থাকে।

১১ জুলাই ১৯৯৫; কিছুদিনের আপেক্ষিক শান্তির পর স্রেব্রেনিৎসা আবারও সার্বিয়ান ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের গোলার আঘাতে কেঁপে ওঠে। অস্ত্রহীন বসনীয় মুসলিমদের রক্ষায় জাতিসংঘ এগিয়ে আসেনি। প্রায় ২০ হাজার মানুষ পোটোচারিতে অবস্থিত জাতিসংঘের ঘাঁটির দিকে ছোটেন আশ্রয়ের আশায়। আর বাকি ১৫ হাজার মানুষ জীবন বাঁচাতে ৫০ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে রওনা হন।

মুহাম্মদ হুজদিক হুদজিচ জানান, জাতিসংঘের পোশাক পরে সার্ব সেনারা উদ্বাস্তুদের আলাদা করছিল এবং পুরুষদের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসিদের কায়েম করা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো। মুহাম্মদ ও তার ভাই সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও সেদিন কোনো পুরুষই সার্বদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি, এমনকি প্রতিবন্ধীদেরও তারা রেহাই দেয়নি।

সার্বদের এই অপরাধ লুকানোর সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো এক ভিডিওতে দেখা যায়, হাত-পা বাঁধা বসনীয় পুরুষদের সামরিক ট্রাক থেকে নামিয়ে মাটিতে উপুড় করে শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের শেষবারের মতো আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে বলা হচ্ছে, যা ছিল এক গণকবর রচনার পূর্বপ্রস্তুতি।

স্রেব্রেনিৎসার এই নির্মম গণহত্যায় আট হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান, যাদের বেশিরভাগই নিখোঁজ তালিকায় ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে এই অঞ্চলের আশপাশে ৪২টি গণকবরের সন্ধান মেলে, যেখান থেকে প্রায় দুই হাজার দেহাবশেষ শনাক্ত করা সম্ভব হলেও আজও বহু মানুষের হাড়গোড় ইতিহাসের নির্মম সাক্ষী হয়ে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে।

সূত্র : আল জাজিরা

এস