হিন্দু ধর্মগ্রন্থে মহানবী (সাঃ): কল্ক’ শব্দের অর্থ পাপ আর ‘কল্কি’ শব্দের অর্থ হল পাপের বিনাশকারী। ভগবত ধর্মের কল্কিপুরাণে বর্ণিত কল্কি অবতার যে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই তথ্য আজ আর অজানা নয়। সংস্কৃত শব্দের আড়াঁলে চাপা পড়া সেই মহান সত্যের উদঘাটন করেছেন ধর্ম পন্ডিতগণ।
ধর্মগ্রন্থগুলো কল্কি অবতারের যে সব গুণাবলী বর্ণনা করেছে সে সব নিরপেক্ষভাবে, বিশ্লেষণী মনে অধ্যয়ন করে যে কেউ নির্দিদ্ধায় বলে উঠবেন ইনি হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভিন্ন অন্য কেউ নন। কেননা কল্কি অবতারের যে সব গুণ বর্ণনা করা হয়েছে সে সব কেবলমাত্র মরুনিবাসী শিখাহীন শ্মশ্রুধারী হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরই ছিল।
বলা হয়েছে পৃথিবী যখন পাপে পাপে দূষিত হবে, মানুষ ধর্ম ভুলে যাবে – সেই সময় জগতের পাপ নাশ করেতে কল্কি অবতার আসবেন। ইসলামপূর্ব আরব সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, ধর্ম বিবর্জিত মানুষ নিজ নিজ গোঁড়ামীর কারণ হেতু অজ্ঞতা ও বর্বরতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। সেই যুগকে বলা হত আইয়ামে জাহেলীয়াতের যুগ অর্থাৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ।
তখন তারা তাদের সৎ মাকে বিবাহ করতে শুরু করেছিল, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর, মদ পান, ব্যভিচার, মূর্তিপূজা, জুয়া খেলায় লিপ্ত হয়ে পড়েছিল। ঠিক সেই সময়ে হযরত হুযূরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছিলেন। তিনি অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আরব সমাজকে মুক্ত করলেন।
মরুনিবাসীদের পাপ নাশ করে তিনি জগতের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করলেন। জগতের পাপ নাশ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা এমন দৃষ্টান্ত হযরত হুযূরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতিত আর কেউ স্থাপন করতে সফল হননি। আসুন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যাক, বেদ-পুরাণ সেই কল্কি অবতার সম্পর্কে কি বলছেঃ
কল্কি পুরাণে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
“শম্ভুলে বিষুৎ যশাসো গৃহে প্রাদূর্ভবাসত্বম।
সমুত্যাং মাতরি বিভো কন্যায়াং ত্বন্নিদেশতঃ \\” সূত্রঃ (কল্কি পুরাণে-২, শ্লোক-৪])
অর্থঃ “আমি শম্ভুল (আরব) নগরে বিষ্ণুযশা (আব্দুল্লাহ) নামক গৃহে সুমতি (আমিনা) নাম্মী ব্রাহ্মণ কন্যার গর্ভে আবির্ভূত হইব।”
শম্ভুলঃ এখানে সংস্কৃত ‘শম্ভুল’ শব্দ দ্বারা আরব নগরীকে বোঝানো হয়েছে? ভারতের বৈদিক যুগের পন্ডিতরা পৃথিবীর স্থলভাগকে সাতটি অঞ্চলে ভাগ করেছিলেন।
১.জম্বুঃ ভারত, তিব্বত ও চীন অঞ্চল, ২.শাকঃ পারস্য ও ইরাক অঞ্চল, ৩.কুশঃ আফ্রিকা অঞ্চল, ৪.ক্রৌঞ্চঃ ইউনান বা গ্রীস, ৫.প্লক্ষ, ৬.পুষ্করঃ স্পেন ও ইতালী অঞ্চল, ৭.শম্ভুলঃ আরব অঞ্চল।
বিষ্ণুযশাঃ বিষ্ণুযশা সংস্কৃত শব্দ। মুলতঃ সংস্কৃত শব্দের আড়াঁলে লুকিয়ে রাখা হয়েছে প্রকৃত সত্য তথ্য। শব্দটি বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায়- বিষ্ণু = ভগবান (আরবীতে আল্লাহ), যশা = সেবক বা দাস; অর্থাৎ আল্লাহর সেবক বা দাস। অপরদিকে, আরবী ‘আব্দুল্লাহ’ শব্দের অর্থও আল্লাহর সেবক বা দাস।
সুমতিঃ সুমতি সংস্কৃত শব্দ। সুমতি শব্দের অর্থ দাঁড়ায় শান্ত, সুদর্শনা, বুদ্ধিমতি ইত্যাদি। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ততকালীন সময়ে সমগ্র আরবের মধ্যে মা আমিনা ছিলেন সবচাইতে শান্ত প্রকৃতির, সুদর্শনা, বুদ্ধিমতি।
ব্রাহ্মণ হল হিন্দু ধর্মের সর্ব্বোচ্চ বংশ, গোত্র, জাত বা শ্রেণীর নাম। অন্যান্য জাত বা গোত্রের চেয়ে ব্রাহ্মণরা সম্মানে, অধিকারে, শাস্ত্রে সবদিক থেকে অগ্রগণ্য। আল্লাহর রাসুল যে বংশে (কুরাইশ) এসেছিলেন সেটিও ছিল ততকালীন আরবের মধ্যে সবচাইতে সম্মানিত, অধিকারে, ক্ষমতায়, ধর্মে-কর্মে। প্রকৃত অর্থে এখানে ব্রাহ্মণ বলতে কুরাইশ বংশকে বোঝানো হয়েছে। কল্কি পুরানের ২য় অধ্যায় এ বর্ণিত আছেঃ
জগতগুরু জন্ম গ্রহণ করবেন বিষ্ণুযশার ঔরসে, সুমতির গর্ভে। তিনি জন্ম গ্রহণ করবেন বৈশাখ মাসের সোমবারে, সূর্য উদয়ের ২ ঘন্টা পরে। জন্মের পূর্বে-ই তাঁর পিতা মারা যাবেন এবং জন্মের কিছুকাল পরে মাতা মারা যাবেন। জগতগুরু সালমান দ্বীপের রানীকে বিবাহ করবেন।
বিবাহ অনুষ্ঠানে তাঁর চাচা এবং তিন ভাই উপস্থিত থাকবেন। পরশুরাম তাঁকে এক পাহাড়ের গুহার ভিতর শিক্ষা দান করবেন। যখন তিনি শম্ভুলা থেকে সালমান দ্বীপে আসবেন, তিনি তাঁর শিক্ষা প্রচার করবেন, তাঁর পরিজন তাঁর সাথে বিরোধিতা করবে।
তাদের অত্যাচার ও যন্ত্রনা থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য উত্তর পাহাড়ে গমন করবেন (হিজরত করবেন)। কিন্তু, কিছু কাল পর, তরবারী হাতে শম্ভুলায় ফিরে আসবেন এবং সমগ্র স্থান দখল (জয়) করবেন। জগতগুরু ঘোড়ায় চড়ে পৃথিবী এবং সাতটি স্বর্গ পরিভ্রমণ/পর্যবেক্ষণ করবেন। সূত্রঃ কল্কি পুরানা \\ অধ্যায়-২
জগতগুরু =’জগতগুরু’ অর্থ পৃথিবীর শিক্ষক। হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বকালের সর্বমানবের সর্বশেষ্ঠ শিক্ষক। তিনিই প্রকৃত জগতগুরু।
বিষ্ণুযশা বা বিষ্ণুভগত =বিষ্ণু অর্থ সৃষ্টিকর্তা (আল্লাহ) এবং ভগত বা যশা অর্থ দাস. অর্থাৎ বিষ্ণুযশা বা বিষ্ণুভগত অর্থ সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহর) দাস। আরবীতে ‘আব্দুল্লাহ’ শব্দের অর্থও সৃষ্টিকর্তার (আল্লাহর) দাস। (‘আব্দুল্লাহ’ হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর পিতার নাম।)
সুমতির =’সু’ অর্থ শান্ত অথবা আত্মতুষ্ট এবং ‘মতি’ অর্থ আত্মা অথবা হৃদয়। অর্থাত্ ‘সুমতি’ শব্দের অর্থ পরিতুষ্ট আত্মা। আরবীতে ‘আমিনা’ শব্দের অর্থও শান্ত বা পরিতুষ্ট আত্মা। (আমিনা নবী হযরত হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মাতার নাম)
“দ্বাদশ্যাং শুক্ল পক্ষস্য মাধবে মাঝি মাধবঃ।
জাতে দদৃতঃ পুত্রং পিতরৌ হৃষ্টমানষৌ \\”
সূত্রঃ কল্কি পুরাণঃ প্রথমাংশের দ্বিতীয় অধ্যায়ের ১৫ শ্লোক
অর্থঃ “বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষীয় দ্বাদশীতে (১২ তারিখে) কলির অবতার জন্ম গ্রহণ করিলে তদ্দর্শনে তাঁহার পিতৃকূল হৃষ্টচিত্ত হইবে।”
বৈশাখ মাসের সোমবারে-ইন্ডিয়ান বিক্রামি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বসন্ত কে বলা হয় বৈশাখ। অপরদিকে, আরবীতে বসন্তকে বলা হয় ‘রাবি’। হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্ম গ্রহণ করেন ১২-ই রাবিউল-আওয়াল মাসের সোমবারে (ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আরবী তৃতীয় মাসে)।
সূর্য উদয়ের ২ ঘন্টা পরে=যখন ইন্ডিয়াতে সূর্য ওঠার ২ ঘন্টা পর, তখন আরবে সূর্য ওঠার ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট পূর্বে বুঝায়। হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামাজের পূর্বে (সুবেহ সাদিকে জন্ম গ্রহন করেন।
পরশুরাম =’রাম’ অর্থ সৃষ্টিকর্তা এবং ‘পরশু’ অর্থ কুঠার (এখানে, বার্তা)। ‘পরশুরাম’ শব্দটি আল্লাহর বার্তা বাহক ফেরেস্তা হযরত জির্রাঈল আলাইহিসসালাম এর পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে। জিব্রাঈল আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজলী ঝলকের মত দ্রুত (এখানে কুঠারের তীব্রতা, তীক্ষ্ণতার সাথে তুলানা করা হয়েছে) বার্তা বহন করে এনেছিলেন হযরত হুযূরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাছে, যার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল অন্যায়/অবিচার, মিথ্যা দূরীভূত হয়। অর্থাৎ, পরশুরাম-ই হলেন জিব্রাঈল আলাইহিসসালাম, যিনি আল্লাহর বার্তা-বাহক (এখানে কুঠার বাহক)।
উত্তরস্থ পাহাড় =উত্তরস্থ পাহাড় (দি নর্দান হিল) বলতে মদিনা শহরকে বোঝানো হয়েছে। মদিনার পূর্ব নাম ইয়াত্রি অর্থাৎ, উত্তর। মদিনা শহরটি মক্কা হতে ২২৫ মাইল উত্তরে অবস্থিত।
আবার উত্তরস্থ পাহাড় বলতে হেরা পাহাড়কেও বুঝানো যেতে পারে। কারণ হেরা পাহাড় যার বর্তমান নাম জাবালে নূর বা আলোর পাহাড় যাকে বাইবেল পারন বলে ব্যাখ্যা করেছে। এই হেরা গুহাতেই হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধ্যানে মগ্ন থাকতেন।
হেরা গুহা কাবা শরীফ থেকে প্রায় তিন মাইল উত্তর দিকে অবিস্থিত। সুতরাং বলা চলে হেরা পাহাড়ই ভগবত ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত উত্তরস্থ পাহাড়। ধর্মের প্রকৃত তত্ত্ব যে গুহায় নিহিত সে সম্পর্কে ব্যাসদেব রচিত মহাভারতের বনপর্বে বর্ণিত আছে, একদিন ধর্ম দেবতা যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করেছিলেন, প্রকৃত ধর্ম কি? হস্তিনাপুরের পঞ্চাল রাজা যুধিষ্ঠির ইসলাম ধর্মকে রুপকার্থে এবং ইঙ্গিত পূবর্ক ধর্ম দেবতার প্রশ্নের উত্তর দিলেনঃ
” বেদা বিভিন্না, শ্রুতুয়ে বিভিন্না নাসো মুনিযাস্যং মতং বিভিন্না ধর্ন্মাসং তত্তং নিহিতং গুহায়ং মহাজেন যেন গতঃ স পন্থা”।
অর্থঃ “বিভিন্ন প্রকার বেদশাস্ত্রগুলো বিভিন্ন। মুনি-ঋষিগণের মতবাদও ভিন্ন ভিন্ন। ধর্মের নিগূঢ় রহস্য গুহায় নিহিত। সে ধর্মপথ অবলম্বনকারীগণই মহাজন বা শ্রেষ্ঠ মানুষ।” (মহাভারতের বনপর্ব্ব এ বর্ণিত)
ঘোড়ায় চড়ে=এখানে, ঘোড়া বাহনটি ব্যবহার করা হয়েছে বোরাক বাহনের পরিবর্তে। পবিত্র মেরাজের রাতে বোরাক বাহন হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং তারপর সপ্ত-আসমান-বেহেস্তে এবং অবশেষে মহান সৃষ্টিকতা আল্লাহর নিকট নিয়ে যায়।
কল্কি পুরাণের তৃতীয়াংশের ষোড়শতম অধ্যায়ের ২-৪ শ্লোকে বলা হয়েছেঃ
কল্কি অবতারের আগমনে মানবকূল অন্তরে প্রশান্তি লাভ করবেন, শান্তিতে দিনযাপন করবেন। তিনি পূর্বযুগের মুর্তিপূজা রহিত করবেন। তাঁর যুগে তিলকধারী সাধু-সন্ন্যাসী কোথাও দেখা যাবে না। তিনি সন্ন্যাস ধর্মকে পরিপূর্ণভাবে রহিত করবেন।
“বেদা ধর্মঃ কৃতযুগং দেবা লেঅকাশ্চরাচরাঃ
হৃষ্টাঃ পুষ্টাঃ সুসংতুষ্টা কল্কৌ রাজনী চাভবন \\ ২ \\
নানা দেবাদি লিঙ্গেষু ভূষণৈভর্ষিতেষূচ।
ইন্দ্রাজালিকবদ্ বৃত্তিকল্পকাঃ পূজকা জনাঃ \\ ৩ \\
ন সন্তি মায়া মোহাঢ্যাঃ পাষান্ডাঃ সাধুবঞ্চকাঃ।
তিল্কাচিত সর্বাঙ্গাঃ কল্কৌ রাজনি কুত্রাচিত্ \\ ৪ \\”
সরল অর্থঃ “তিনি (কল্কি) রাজাসিয়হাসনে অধিষ্ঠিত হইলে বেদ, ধর্ম, কৃতযুগ, দেবগণ, স্থাবর জঙ্গমাত্মক নিখিল জীব সকলেই হৃষ্টপুষ্ট ও সুপ্রীত হইবেন। ২।
পূর্বযুগে পূজক দ্বিজাতিরা নানাবিধ অলঙ্কার দ্বারা অলকৃত দেবমূর্তিসমূহে ইন্দ্রজালিকবত্ ব্যবহার করিয়া সকলকে মোহিত করিত, তাহা দূর হইবে। ৩।
কল্কি রাজপদে প্রতিষ্ঠিত হইলে কুত্রাপি (কোথাও) তিলকাঙ্কিত-সর্বাঙ্গ মায়া-মোহবিষ্ট সাধু বঞ্চক পাষন্ড দৃষ্ট (দেখা) হইবে না। ৪ ।” কল্কি পুরাণঃ তৃতীয়াংশে ষোড়শ অধ্যায়ের ২-৪ নং শ্লোক, অনুবাদক- পন্ডিত শ্রীকালীপ্রসন্ন বিদারত্নেন, রাজেন্দ্র লাইব্রেরী, ১৩২ বিপ্লবী রাসবিহারী বসু রোয, কলিকাতা-৭০০০০১
হযরত মুহম্মাদ (সাঃ) আগমনের পূর্বে মরুর দেশে মূর্তিপূজা হত। পৌত্তলিকতার যুগে কাবা ঘরে বিভিন্ন গোত্রের ৩৬০ টি মূর্তি ছিল। একক স্রষ্টাকে ৩৬০ রুপে বিভক্ত করে মানুষ যখন অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছিল ঠিক সেই সময়ে করুণাময় স্রষ্টার পক্ষ থেকে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রেরিত হলেন আরবের পৌত্তলিকদের কাছে।
মূর্তিপূজকরা হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সহজে গ্রহণ করতে পারল না। বিতারিত করল। এর কিছুকাল পরে হযরত হুযূরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয় করলেন। মক্কা বিজয়ের পর কাবা ঘর থেকে মূর্তি অপসরণ করলেন। মূর্তি পূজা রহিত করলেন। তাঁর আগমনে আরবের মরুভূমে সাধূ সন্ন্যাসীদের ধর্ম রহিত হল।
তিনি শান্তির ধর্ম প্রচার করলেন। সেই ধর্ম ধারণ করে মানব কূল পরম শান্তি প্রাপ্ত হল। সুতরাং নতুন কোন কল্কির আশায় বসে না থেকে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামের কল্কির পদাঙ্ক অনুসরণ করা উচিত। মূর্তিপূজকরুপী কল্কি অবতারের আশায় কালাপাত করা নিবুদ্ধিতারই পরিচয়।
কারণ কল্কি পুরানে যে কল্কি অবতারের আগমনের কথা বলা হয়েছে তিনি মূর্তিপূজক নন, তিনি মূর্তিপূজার রহিত কারক। তিনি সাধূ-সন্ন্যাসীদের ধর্ম গুরু নন, বরং তিনি সন্ন্যাসধর্ম নাশকারী।
ভবিষ্য পুরাণে হযরত হুযূরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -
“এতস্মিন্নন্তিবে সেত্দচ্ছ আচার্যেন সমন্বিতঃ।
মহামদ ইতিখ্যাতঃ শিষ্যশাখা সমন্বিত \\
নৃপশ্চৈব মহাদেবং মরুস্থল নিবাসিম্ম।
চন্দনাদিভির ভ্যর্চ্য তুষ্টাব মনসাহরম্ \\
নমস্তে গিরিজানাথ মরুস্থল নিবাসিনে।
ক্রিপুবাসুরনাশায় বহুমায়া প্রবর্তিনে \\
স্নেচ্ছৈর্গপ্তায়শুদ্ধায় সচ্চিদানরুপিণে।
ত্বং মাং হি কিংকরং বিদ্ধি পরণার্থমু পাগতম \\”
সূত্রঃ ভবিষ্য পুরাণে-৩:৩:৩, ৫-৮ শ্লোক
অর্থ্যাৎ “যথাসময়ে ‘মহামদ’ নামে একজন মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন যাঁর নিবাস “মরুস্থল” (আরব দেশে) সাথে স্বীয় সহচারবৃন্দও থাকবেন। হে মরুর প্রভু! হে জগতগুরু আপনার প্রতি আমাদের স্তুতিবাদ। আপনি জগতের সমুদয় কুলষাদি ধ্বংসের উপায় অবগত আছেন। আপনাকে প্রণতি জানাই। হে মহাত্ম! আমরা আপনার দাসানুদাস। আমাদেরকে আপনার পদমূলে আশ্রয় প্রদান করুন।”
কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ বা বেদব্যাস রচিত ভবিষ্য পুরাণে কল্কি অবতারের (হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলা হয়েছেঃ
“লিঙ্গচ্ছেদী শিখাহীনঃ শ্মশ্রুধারী সে দূষকঃ।
উচ্চালাপী সর্বভক্ষী ভবিষ্যতি জমোমম \\২৫\\
বিনা কৌলংচ পশবস্তেষাং ভক্ষ্যা মতা মম।
মুসলেনৈব সংস্কারঃ কুশৈরিব ভবিষ্যতি \\২৬\\
তম্মান্মুসলবন্তো হি জাতয়ো ধর্ম্ম দূষকাঃ।
ইতি পৈশাচধমশ্চ ভবিষ্যতি ময়াকৃতঃ ।২৭\\” সূত্রঃ ভবিষ্য পুরাণ\\ শ্লোকঃ ১০-২৭।
অর্থঃ ” আমার অনুসরণকারী লিঙ্গের ত্বকছেদন (খতনা) করিবে। সে শিখাহীন (মাথায় টিকিহীন) ও দাড়ি বিশিষ্ট হইবে; সে এক বিপ্লব আনয়ন করিবে। সে উচ্চস্বরে প্রার্থনা ধ্বনি (আজান) করিবে। সে সর্ব প্রকার ভক্ষ্যদ্রব্য (হালাল দ্রব্য) আহার করিবে; সে শূকর মাংস ভক্ষণ করিবে না।
সে তৃণলতা দ্বারা পূত পবিত্র হইবে। ধর্মদ্রোহী জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া সে মুসলমান নামে পরিচিত হইবে। আমার দ্বারা এই মাংসহারীদের ধর্ম স্থাপিত হইবে।”
বেদশাস্ত্রে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -
‘বেদ’ হল হিন্দু ধর্মের মূল ভিত্তি। হিন্দু আইনের মূল উত্সও বেদ। বেদের অপর নাম শ্রুতি। শ্রুতি থেকেই এসেছে শ্রুতিশাস্ত্র। শ্রবণ করে পরবর্তীতে পুস্তক আকারে যে গ্রন্থ লেখা হয় তারই নাম শ্রুতিশাস্ত্র। মুনিবর কৃষ্ণদ্বৈপায়ন কর্তৃক সংকলিত এই শ্রুতিশাস্ত্রের নামই বেদ। বেদ চার ভাগে বিভক্তঃ
- ঋক্ বেদ
- যযু বেদ
- সামবেদ
- অর্থব বেদ
সামবেদে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিচয় বর্ণনা করে বলা হয়েছে – যার নামের প্রথম অক্ষর ‘ম’ এবং শেষ অক্ষর ‘দ’ হবে এবং গো মাংস খাওয়ার আদেশ দিবেন, সেই দেবতাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় দেবতা।
“মদৌ বর্তিতা দেবা দকারান্তে প্রকৃত্তিতা।
বৃষানাং বক্ষয়েত্ সদা মেদা শাস্ত্রেচস্মৃতা \\” সামবেদ সংহিতা
অর্থঃ “যে দেবের নামের প্রথম অক্ষর “ম” ও শেষ অক্ষর “দ” এবং যিনি বৃষমাংস (গরুর মাংস) ভক্ষণ সর্বকালের জন্য পুনঃ বৈধ করিবেন, তিনিই হইবেন বেদানুযায়ী ঋষি।”
উত্তরণ বেদে বলা হয়েছেঃ
“লা-ইলাহা হরতি পাপম ইল্লা ইলহা পরম পদম
জন্ম বৈকুন্ঠ অপ সুতি তজপি নাম মুহামদম \\” সূত্রঃ উত্তরণ বেদ। আনকাহি, পঞ্চম অধ্যায়ঃ
অর্থঃ ” লা ইলাহা কহিলে পাপ মোচন হয়। ইল্লাল্লা কহিলে উচ্চ পদবী যদি চিরতরে স্বর্গে বাস করিতে চাও, তবে মোহাম্মদ নাম জপ কর।”
ঋগ্বেদ এর ২:১২:৬ এ মানবতার হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ‘কীরি’ সম্বোধন করে বলা হয়েছেঃ
“যো রধ্রস্য চোদিত্য যঃ কৃশস্য মো ব্রণো নাম মানস্য কীরেঃ” সূত্রঃ ঋগ্বেদ সংহিতা : ২:১২:৬
অর্থঃ “যিনি তাঁর ভক্ত, তিনিই (কীরি) তাঁর প্রভুর সাথে সম্পর্কিত।”
প্রকৃতপক্ষে এ কথা অস্বীকার করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয় যে মুহাম্মদ (স) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল এবং বান্দা (ভক্ত বা মানুষ) ছিলেন না। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন সাক্ষ্য দিচ্ছে যে “হে মোহাম্মদ, আপনি স্পষ্টভাবে বলিয়া দিন যে, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। তবে আমার নিকট প্রত্যাগত ওহি অবতীর্ণ হয় যে, নিশ্চয় তোমাদের প্রভূ একক- অদ্বিতীয়।” (সূরা কাহাফ-১১০)।
ঋগগ্বেদে এই সম্পর্কিত মানুষটিকে ‘কীরি’ নামে ব্যাখ্যা করা হয়েছ। সংস্কৃত ‘কীরি’ শব্দের অর্থ মহাপ্রভুর সর্বশেষ প্রশংসাকারী। আরবীতে যাকে বলা হয়েছে আহমদ যার অর্থ হল প্রশংসাকারী।
ব্রক্ষসূত্রে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -
ব্রক্ষসূত্রের ৪১, ৪২ নম্বর পৃষ্ঠায় শেষ নবীর পরিচয় বর্ণনা করা হয়েছেঃ
“হিরন্ময় পুরুষ আদিত্যে অধিষ্ঠিত।
কোণ-শ্মশ্রু হয় তাঁর হিরণ্য মন্ডিত \\
পদনখ পর্যন্ত সমস্ত স্বর্ণময়।
অরুণার বিন্দ সম শোভে নেত্রদ্বয় \\
‘উত্’ অভিধানে তিনি অভিহিত হন।
যেহেতু সর্ব্ব পাপের ঊর্ধ্বে তিনি র’ন \\
এই তত্ত্ব অবগত আছেন যে জন;
তিনিও পাপের ঊর্দ্ধে অবস্থিত হন।
ইতিতত্ত্ব দেব পক্ষেঃ অধ্যাত্ন পক্ষেতে,
সে পুরুষ দৃষ্ট অন্তরীক্ষ দর্পণেতে।”সূত্রঃ ব্রক্ষ্মসূত্র, ৪১, ৪২পৃঃ
উপনিষদে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
অল্লোপনিষদের সপ্তম পরিচ্ছেদে কল্কি অবতারের কথা বলা হয়েছেঃ
“হোতার মিন্দ্রো হোতার মিন্দ্রো মহাসুরিন্দ্রাঃ ।
অল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূর্ণং ব্যক্ষণং অল্লাম।
অল্লো রসূল মহামদ রকং বরস্য অল্লো অল্লাম।
আদল্লাং বুকমেকং অল্লাবুকংল্লান লিখার্তকম।”সূত্রঃ অল্লোপনিষদের সপ্তম পরিচ্ছেদ
অর্থঃ “দেবতাদের রাজা আল্লাহ আদি ও সকলের বড় ইন্দ্রের শুরু। আল্লাহ পূর্ণ ব্রক্ষ্মা; মহাম্মদ আল্লাহর রসূল পরম বরনীয়, আল্লাই আল্লাহ। তাঁর অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কেহ নেই। আল্লাহ অক্ষয়, অব্যয়, স্বয়ম্ভু।”
কুন্তাপ সুত্রে হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ
“ইদং জন্য উপশ্রুত নরাশংস স্তবিষ্যতে ষষ্টি সহস্রা নবতিং চ কৌরম অরুষমেষু দদ্মহে”
অর্থঃ “হে লোক সকল! মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর, ‘প্রশংসিত জন’ লোকদের মধ্য থেকে উত্থিত হবেন। আমরা পলাতককে ৬০,০৯০ জনের মধ্যে পেলাম।”
এখানে বলা হচ্ছে নরাশংস অর্থাৎ প্রশংসিত ব্যক্তির কথা। যিনি ষাট হাজার মানুষের মধ্যে অন্যতম হবেন। যিনি দশ সহস্র মানুষ নিয়ে রাজ্য বিজয় করবেন। বেদ যে নরাশংসের কথা উল্লেখ করেছে তিনি আর কেউ নন তিনি হলেন হযরত হুযূরপাক সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
ঈসায়ী ৬৩০ হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা বিজয় করলেন তখন তার সৈন্য সংখ্যা ছিল দশ হাজার। আর তিনি যখন মক্কা বিজয় করেন তখন মক্কার লোকসংখ্যা ছিল ষাট হাজার জন। আর তিনি হিজরতে ছিলেন। হযরত মুহম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মভূমি মক্কাশরীফ ত্যাগ করে মদীনা শরীফে হিজরত করেছিলেন।চলবে.....
ঢাকা, ২৯ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ





