ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থার নাম। জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের দিকনির্দেশনা রয়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদের বিষয়েও ইসলামের দিকনির্দেশনা রয়েছে। পোশাককে আরবিতে ‘লিবাস’ বলা হয়। এর অর্থ পরিহিত বস্তু বা যা পরিধান করা হয়। শরিয়তের পরিভাষায় লেবাস ও পোশাক বলা হয়, যা মানুষের লজ্জাস্থানকে আবৃত করে। (ফাতাওয়ায়ে শামী : ৬/৩৫২)
পোশাক মানুষের মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়। লজ্জাস্থান আবৃত রাখা এবং সুন্দর ও পরিপাটি থাকার চাহিদা মানুষের স্বভাবজাত। তদ্রূপ শীত-গ্রীস্মের প্রকোপ ও বাইরের ধুলোবালি থেকে শরীরকে রক্ষার জন্য তা অতীব জরুরি আবরণ। মোটকথা পোশাক মানুষের জন্য আল্লাহর অপার এক অনুগ্রহ।
আদিকাল থেকে মানুষ পোশাকের ব্যাবহার করে আসছে। পোশাকের মধ্য দিয়ে মানুষের রুচিবোধ ও ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটে। তাই ইসলাম পোশাক পরিধানে যথাযথ বিধিনিষেধ পালনের গুরুত্ব দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে বনী-আদম আমি তোমাদের জন্যে পোশাক অবর্তীণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং অবর্তীণ করেছি সাজসজ্জার বস্ত্র এবং পরহেযগারীর পোশাক, এটি সর্বোত্তম। এটি আল্লাহর কুদরতের অন্যতম নিদর্শন, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।’ (সূরা আ'রাফ, আয়াত : ২৬)
ইসলাম পোশাক-পরিচ্ছদের বিষয়ে নীতিমালা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যা অনুসরণ করে মানুষ পোশাকের কল্যাণ লাভ করতে পারে এবং পোশাকের অকল্যাণ থেকে রক্ষা পেতে পারে। এ ধরনের কিছু নীতিমালা নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো-
১. সতর আবৃত করা। লেবাস অবশ্যই সতর আবৃতকারী হতে হবে। ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত নামাজে সতর ঢাকা ফরজ। পুরুষের নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত আর নারীর মুখমণ্ডল, টাখনু পর্যন্ত পা ও কব্জি পর্যন্ত হাত ছাড়া গোটা শরীর নামাজে আবৃত রাখা ফরজ। তদ্রূপ গায়রে মাহরাম ও পরপুরুষের সামনে মুখমণ্ডলসহ গোটা শরীর আবৃত রাখাও জরুরি। অতএব পোশাকের মাধ্যমে যাতে এই প্রয়োজন পূরণ হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা অপরিহার্য।
এত সংক্ষিপ্ত পোশোক পরিধান করা যে, সতর বা সতরের কিছু অংশ খোলা থাকে বা এত পাতলা কাপড় ব্যবহার করা যে, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দৃষ্টিগোচর হয়, পুরুষ মহিলা সবার জন্যই হারাম ও নিষিদ্ধ। তদ্রূপ এত আঁটসাঁট পোশাক, যার ওপর দিয়ে শরীরের আবরণীয় অঙ্গসমূহ ফুটে ওঠে তাও বর্জনীয়।
২. পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রে অন্যের সাদৃশ্য বর্জন করা। পোশাক-পরিচ্ছদে দুটি বিষয়ে সাদৃশ্য অবলম্বনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এক. কাফির-মুশরিকদের পোশাক গ্রহণ করা যাবে না। ইবন উমার রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের অনুসরণ-অনুকরণ করবে, সে তাদের দলভুক্ত হবে। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৩৩)
দুই. বিপরীত লিঙ্গের মতো পোশাক ধারণ করা যাবে না। অর্থাৎ পুরুষের জন্য নারীদের মতো আর নারীদের জন্য পুরুষের মতো পোশাক পরিধান করা জায়েজ নয়। ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়কে লজ্জা ও শালীনতা রক্ষাকারী পোশাক পরিধান করার নির্দেশ দিলেও পোশাকের ক্ষেত্রে উভয়কে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর বেশধারণকারী পুরুষের ওপর আর পুরুষের বেশধারণকারিনী নারীর ওপর লানত করেছেন।(সহিহ বুখারি, হাদীস : ৩৮৮৫)
৩. রেশমের পোশাক পরিধান না করা। ইসলামে রেশমের পোশাক পুরুষের জন্য নিষেধ, কিন্তু নারীর জন্য অনুমোদিত। স্বর্ণের ব্যবহার নারীর জন্য জায়েজ, কিন্তু পুরুষের জন্য হারাম। যেকোনো রংয়ের কাপড় নারীরা পরিধান করতে পারে, কিন্তু পুরুষের জন্য কিছু কিছু রং অপছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য রেশমি কাপড় এবং স্বর্ণ ব্যবহার করা হারাম; কিন্তু নারীদের জন্য তা হালাল।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৭২০)
৪.পোশাকটি লাল, জাফরান, হলুদ রঙের হতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, আমি লাল রঙের জিনপোষে সওয়ার হই না, হলুদ (কুসুম) বর্ণের কাপড় পরি না এবং রেশম আটকানো জামা পরিধান করি না। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৪৮) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু নিষেধ করেছেন সেহেতু অবিমিশ্র উজ্জ্বল লাল ও হলুদ উভয় রংয়ের পোশাক পুরুষদের জন্য না পরাই উত্তম। ইমাম নববি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার আল মাজমুতে উল্লেখ করেছেন, তবে লাল ও হলুদের সাথে অন্য রঙ মিশ্রিত থাকলে উক্ত পোশাক পরতে কোনো বাধা নেই।
৫. পোশাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে অহংকার ও লোক দেখানোর মানসিকতা বর্জন করা কাম্য। পোশাক-পরিচ্ছদের মাধ্যমে যেন অহংকার মানুষের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়েও হাদিস শরিফে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি অহংকারবশত মাটিতে কাপড় টেনে টেনে চলে আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তার দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না (রাগান্বিত থাকবেন)। (সহিহ বুখারি, হাদীস : ৫৭৯১)
মানুষকে দেখানোর জন্য বা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য খুব জাঁকজমকপূর্ণ পোষাক বা ব্যতিক্রমী পোশাক পরিধান করাও শরীয়তে নিষেধ। ইরশাদ হয়েছে, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে প্রসিদ্ধির (উদ্দেশ্যে) পোশাক পরিধান করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে লাঞ্ছনার পোষাক পরিধান করাবেন।(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০২৩)
৬ পোশাক পরিষ্কার ও পরিপাটি হওয়া উচিত। পোশাক সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন হওয়ার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন আল্লাহ পাক। মহান আল্লাহ বলেন, হে বনী আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে, আহার করবে ও পান করবে কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না। (সূরা আ’রাফ, আয়াত : ৩১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পোশাক পরিস্কার ও পরিপাটি হওয়ার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
জাবির রা: বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এলেন এবং এক ব্যক্তির মাথার চুল এলোমেলো দেখলেন। তখন তিনি ইরশাদ করলেন, ‘এই লোকের কি এমন কিছু নেই, যা দিয়ে সে তার মাথা পরিপাটি করবে?’ অপর এক ব্যক্তিকে ময়লা কাপড় পরিহিত দেখে বললেন, ‘এর কাছে কি এমন কিছু নেই যা দিয়ে তার কাপড় ধৌত করবে।(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৫৬)
৭. অপচয় থেকে বিরত থাকা উচিত। বিলাসিতার জন্য কিংবা শুধু শখের বসে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক ক্রয় করা ইসলামে নিষেধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বনী আদম! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করবে, আহার করবে ও পান করবে কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আ’রাফ, আয়াত : ৩১)
পোশাকের ব্যাপারে অপচয় করা যেমন নিন্দনীয় তদ্রুপ কৃপণতাও কাম্য নয়। প্রয়োজন ও সামর্থ্যের মাঝে ভারসাম্য বজায় রেখে লেবাস-পোশাক ব্যবহার করাই ইসলামের নির্দেশনা। এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে নিম্নমানের পোশাক পরিধান করে উপস্থিত হন। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমার কি অর্থকড়ি, সহায়-সম্পত্তি নেই?’ সাহাবি বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে তো আল্লাহ অঢেল সম্পত্তি দান করেছেন।’ তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ তোমার শরীরে দৃশ্যমান হওয়া উচিত।’ (তাবরানি কাবির : ১৯/৯৭৯)
৮. পোশাক পরিধান করে আল্লাহর শোকরগোযারী করা উচিত। পোষাক যেহেতু আল্লাহ তাআলার নেয়ামত তাই তা পরিধান করে শুকরিয়া আদায় করা উচিত। আবু সাঈদ খুদরী রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো নতুন কাপড় পরিধান করতেন তখন বলতেন, ‘ইয়া আল্লাহ! তোমারই প্রশংসা। তুমিই আমাকে এই পোশাক পরিয়েছ। আমরা তোমার কাছে এই কাপড়ের কল্যাণ ও উপকারিতা প্রার্থনা করি এবং এর অকল্যাণ ও অপকারিতা থেকে পানাহ চাই।’ (জামে তিরমিযী, হাদিস : ১৭৬৭) মহান আল্লাহ মুসলিম জাতিকে যার যার সক্ষমতা অনুযায়ী উত্তম ও সুন্দর পোশাক পরিধান করার তাওফীক দান করুন, আমীন!
এমবি





