হাজার হাজার বছর ধরে এই ভূখন্ডের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বিরাজ করেছে। ধর্মে ধর্মে কোনো বিভেদ সৃষ্টি হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি কিছু স্বার্থান্বেশী মহল ধর্মে ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চাচ্ছে। আমরা ধর্মে বিশ্বাসীগণ এই স্বার্থান্বেশী মহলকে ধর্মে ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করে কোনো ফায়দা হাসিল করতে দেবো। ধর্মে ধর্মে ভালোবাসা সৃষ্টি করে এই দেশকে সুখি সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো।
সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানস্থ অল কমিউনিটি ক্লাব লি. মিলনায়তনে সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি সভার ৪র্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সম্প্রীতি সম্মেলন-এ বক্তারা এসব কথা বলেন।
সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি সভার চেয়ারম্যান বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশস্থ ফিলিস্তিনের হেড অব মিশন মি. ইউসুফ রামাদান, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকারমের ভারপ্রাপ্ত খতিব মুফতি মুহিবুল্লাহিল বাকী নদভী, বাংলাদেশ বৌদ্ধকৃষ্টি প্রচার সংঘ এর সভাপতি ও ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারের অধ্যক্ষ মহাসংঘনায়ক শুদ্ধানন্দ মহাথের, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন এর সহকারী সেক্রেটারি স্বামী গুরু শেবানন্দ, ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চ ইন্টারফেইথ ডায়লগ এর সদস্য রেভারেন্ট মার্টিন অধিকারী, ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস এর বাংলাদেশ অফিসের ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন মি. বরিস কেলেসেবিস ও সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।
সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন সম্প্রীতি সভার কো-চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া, সাংবাদিক সঞ্জীব চৌধুরী, ড. ফাদার তপন ডি রোজারিও এবং জেনারেল সেক্রেটারি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শরীফ বায়জীদ মাহমুদ। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মীয় পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিক, লেখক বুদ্ধিজীবী এবং বিভাগীয় প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ, জাতীয় সংগীত ও থিম সঙ পরিবেশন করা হয়। এরপর বক্তারা বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশ বাংলাদেশ। এ দেশে সকল ধর্মের মধ্যে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা সকল ধর্মের মানুষ এক বন্ধনে থেকে সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই। তার জন্য প্রত্যেকের মধ্যে পারস্পারিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
তারা বলেন, একটি শান্তিময় পৃথিবীর জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতির কোনো বিকল্প নেই। ধর্মীয় সম্প্রীতির মাধ্যমেই পৃথিবীর সকল প্রকার জুলম-নির্যাতন বন্ধ করা যায়। তাই জুলম-নির্যাতন বন্ধে ধর্মীয় সম্প্রীতির সুদৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ কোনো ধর্মই অন্যায়কে ন্যায় বলে না – মন্তব্য করে বক্তারা আরো বলেন, এক ধর্ম অন্য ধর্মকে আঘাত করুক এই শিক্ষা কোনো ধর্মেই নেই। তাই আসুন আমরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি। ধর্মীয় সংলাপ বৃদ্ধি করি। পরস্পর আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করি। যদি তা পারি তাহলে আগামী প্রজন্ম শান্তিময় সমাজে বসবাস করতে পারবে।
সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব শরীফ বায়জীদ মাহমুদ সম্মেলনে ৬ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে:
০১. এই সম্মেলন সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি সভার প্রতিষ্ঠার তারিখ ৫ এপ্রিল আন্তর্জাতিক সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি দিবস (International religious harmonious day) ঘোষণা করা ।
০২. সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি সভা মনে করে যে, দুর্ভাগ্যবশত দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম্প্রীতির অভাব প্রকট। এই বাস্তবতা যাতে বাংলাদেশের চিরায়ত ধর্মীয় সম্প্রীতিকে ক্ষুন্ন করতে না পারে তার জন্য ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা।
০৩. সম্প্রীতি সভা সকলকে মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে নিজ নিজ ধর্ম পালনে উদ্বুদ্ধ করতে এবং ধর্মচর্চার মাধ্যমে পারস্পারিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে প্রচেষ্টা চালাবে।
০৪. জাতীয় ঐক্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি সভা তার কার্যক্রমকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার গতি ত্বরান্বিত করবে।
০৫. যে সব আইনের কারণে, জমি সংক্রান্ত বিরোধ সম্প্রীতি নষ্ট করছে, সেই আইনগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত, বেসরকারি বা সরকারি পর্যায়ে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা, যা হাজার বছরের সম্প্রীতি বিনষ্ট করে, এ ব্যাপারে সকল মহলের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা।
০৬. বাংলাদেশে অতীতে সংগঠিত বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙচুর, জোরপূর্বক জমি দখলসহ সকল সাম্প্রদায়িক হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে আজকের এই সম্মেলন।
কেবি





