রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের সাথে গভীর অন্তরঙ্গ সময় কাটাতেন এবং তাদের জৈবিক ও মানসিক অধিকার পুরোপুরি আদায় করতেন। অথচ আমাদের দাম্পত্যজীবনের চিত্রটা কেমন? অনেকে আছেন মাসের পর মাস পার হয়ে যায় কিন্তু নিজের হালাল স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হন না। অথচ স্ত্রী ঘরে সেজেগুজে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করেন, স্বামীকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করেন। আর স্বামীর উত্তর হয়, ‘আমি ক্লান্ত।’ কিসের জন্য এত ক্লান্তি আপনার? রাতের বেলা স্ত্রীর কাছে যাওয়া তো ইবাদত। এটা তো একটা পর্যায় পর্যন্ত তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবিদের বলেছিলেন, আপনারা যখন নিজেদের স্ত্রীদের সাথে অন্তরঙ্গ হন, তাদের শারীরিক চাহিদা পূরণ করুন এবং তাদের পরিতৃপ্ত করুন, সেটিও একটি সদকা বা পুণ্যময় কাজ। সাহাবিরা তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল! এটিও কি সত্যিই সদকা? রাসুল (সা.) জবাবে বললেন, আপনারা যদি এই চাহিদা কোনো হারাম উপায়ে পূরণ করতেন, তবে কি তোমাদের গুনাহ হতো না? সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই গুনাহ হতো। রাসুল (সা.) তখন বললেন, ঠিক একইভাবে আপনারা যদি সম্পূর্ণ হালাল উপায়ে, অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সচেতন থেকে এই চাহিদা পূরণ করেন, তবে আপনারা অবশ্যই আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার বা সওয়াব পাবেন।
সুতরাং যখন ঘরে ফিরবেন এবং স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হবেন, তখন এটিকে ইবাদত মনে করবেন। এমন কি স্ত্রীদের ঋতুস্রাব বা মাসিকের দিনগুলোতেও রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কেবল মূল শারীরিক মিলন ছাড়া স্ত্রীর সঙ্গে অন্য সব ধরনের অন্তরঙ্গতা বজায় রাখতেন। সুবহানাল্লাহ! আমরা এর চেয়ে বেশি বিস্তারিত বিবরণে যাব না। রাসুল (সা.) বলেছেন, মূল কাজটি ছাড়া বাকি সবকিছুই করা যাবে। আমরা সবাই জানি যে মাসিকের সময় ওই কাজটি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু এর বাইরেও আপনারা একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকতে পারেন। অনেক পুরুষ আছেন যারা স্ত্রীর পিরিয়ডের কথা শুনলেই বলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে এক সপ্তাহ পর দেখা হবে।’ এ কেমন আচরণ? এটি তো ওই নারীর কোনো অপরাধ নয়, এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করুন। এটাই একজন আদর্শ স্বামীর দায়িত্ব, যা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের শিখিয়েছেন।
আমরা অনেকেই নিজেদের খুব ভালো মুসলিম দাবি করি। যখনই আমরা ‘মুহাম্মদ’ নাম শুনি, তখনই আমরা উচ্চস্বরে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলি। কিন্তু রাসুলুল্লাহর (সা.) প্রতি দায়িত্ব কি কেবল এই দুরুদ পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? আমরা মুখে খুব জোরে দুরুদ পড়ি ঠিকই, কিন্তু আমাদের বাস্তব জীবন সেই মহান আদর্শ থেকে মাইলের পর মাইল দূরে অবস্থান করছে। আপনারা কি মনে করেন যে রাসুলের (সা.) অধিকার এতটুকুই যে তাঁর নাম শুনলে দুরুদ পড়তে হবে? হ্যাঁ, দুরুদ পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এটি বরকতময় আমল, অবশ্যই পড়তে হবে। কিন্তু এটি রাসুলের (সা.) প্রতি আমাদের দায়িত্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ। আপনার পুরো জীবনটাকে রাসুলের (সা.) সুন্নাহ অনুযায়ী সাজান, তখন দেখতে পাবেন আপনার পারিবারিক জীবনটাই আনন্দের বাগানে পরিণত হয়েছে। কারণ আপনি যখন ঘরে ফিরবেন তখন আপনার স্ত্রী খুশি থাকবেন, আপনিও সুখে থাকবেন এবং আপনাদের মনোযোগ একে অপরের প্রতি থাকবে।
আমাদের মূল সমস্যা হলো, আমাদের অনেকেরই চোখ আর মনোযোগ ঘরের বাইরে অন্য কোনো নারীর দিকে নিবদ্ধ থাকে। আস্তাগফিরুল্লাহ! আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই পঙ্কিলতা থেকে রক্ষা করুন। আপনি যখন ঘরে ফিরছেন, তখন আপনার স্ত্রীর সাথে কাটানো সময়টা সম্পূর্ণ হালাল এবং সেটি একটি সদকা। আপনার স্ত্রী আপনার জন্য পথ চেয়ে বসে আছেন, অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এবং নিজেকে সব ধরনের গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, অথচ আপনি ঘরে ফিরে এক কথায় বলে দিলেন, ‘আমি ক্লান্ত।’ কিসের ক্লান্তি আপনার? যদি টিভিতে কোনো ফুটবল ম্যাচ থাকত, তবে তো আপনার সব ক্লান্তি নিমেষেই উধাও হয়ে যেত! আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন। যদি কোনো ইউএফসি (UFC) ফাইট থাকত, তবে আপনি রাত ৩টা পর্যন্ত জেগে খেলা দেখতেন; কিন্তু নিজের স্ত্রীর জন্য রাত ১১টা পর্যন্ত জেগে থাকার ধৈর্য আপনার হয় না!
আল্লাহর রাসুল (সা.) এই সমস্ত পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিষয়ে অত্যন্ত খোলামেলা এবং স্পষ্ট পরামর্শ দিয়ে গেছেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন যে, ইশার নামাজের পর যদি আপনার কোনো জরুরি বা গঠনমূলক কাজ না থাকে, তবে দ্রুত বিছানায় চলে যান। কেন যাবেন? কারণ আপনার স্ত্রী আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। কিন্তু আমাদের সমস্যা হলো, আমরা বিছানায় ঠিকই যাই কিন্তু রাত ২টা পর্যন্ত হোয়াটসঅ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রোল করতে থাকি। স্ত্রী পাশে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে থাকেন, ছটফট করেন। স্ত্রী যখন স্বামীর মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেন, স্বামী স্ত্রীকে উল্টো বলেন, ‘আরে থামো তো, বিরক্ত কোরো না।’ আপনার ভেতরের ইসলাম তখন কোথায় হারিয়ে যায়? আপনার ইসলামই তো আপনাকে ভাবাবে যে, কেন আপনাকে ইশার পরই দ্রুত বিছানায় আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে? আপনাকে বিছানায় আসতে বলা হয়েছে কারণ সেখানে আপনার জীবনসঙ্গী রয়েছে। আপনি যদি রাতের বেলা আপনার স্ত্রীর সাথে সময় কাটাতে না চান, তবে বিয়ে করেছিলেন কেন? তার পাশে বসুন, তার সাথে কথা বলুন, তার সাথে মধুর খুনসুটি করুন, তার সাথে অন্তরঙ্গ হোন, তার অধিকার পূরণ করুন, তাকে সন্তুষ্ট করুন, তারপর ঘুমাতে যান। শেষ রাতে ঘুম থেকে উঠে সালাতুত তাহাজ্জুদের জন্য দাঁড়ান।
রাতে স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে ভোরে গোসল করতে বিন্দুমাত্র লজ্জা পাবেন না; যদি বাড়ির সবাই জেনে যায় যে রাতে কী হয়েছে, তবুও না। এটি তো সম্পূর্ণ হালাল একটি বিষয় ছিল। ভোরে ঘুম থেকে উঠে পবিত্রতার জন্য গোসল করা একজন মুমিনের জন্য সম্মান ও গৌরবের বিষয়। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকে এতটাই লোকলজ্জার ভয় পান যে ভাবেন, ‘সকাল হয়ে গেছে, বাড়ির সবাই কী ভাববে! তার চেয়ে ভালো হয় এখন গোসল না করে সকাল ৮টা বা ৯টায় কাজ সেরে গোসল করব আর ফজরের নামাজটা কাজা করে দেব।’ আল্লাহ আমাদের এই ভয়াবহ মানসিকতা থেকে রক্ষা করুন।
আমরা যদি রাসুলের (সা.) সীরাতের দিকে গভীর নজর দিই, তবে দেখব, কখনো কখনো তিনি তার স্ত্রীদের দিয়ে নিজের চুল আঁচড়ে নিতেন, আবার কখনো তিনি নিজেও স্ত্রীদের চুল নিয়ে খেলা করতেন। দাম্পত্য জীবনের এই যে রোমান্স ও গভীর ভালোবাসার কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তা থেকে আজ আমরা কত দূরে সরে গেছি ভাবলে সত্যি কষ্ট হয়। আমাদের সমাজের পুরুষদের মধ্যে অনেকেই রাসুলের (সা.) দাম্পত্য জীবনের কেবল একটি সুন্নাহ নিয়েই সবচেয়ে বেশি মেতে থাকেন। আপনারা সবাই ভালো করেই জানেন আমি কোন সুন্নাহর কথা বলছি। দ্বিতীয় বিয়ে করাটা নাকি মস্ত বড় সুন্নাহ! আমি দ্বিতীয় বিয়ের বিধানকে অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমার কথা হলো—আপনি এখনো একজন স্ত্রীর স্বামী হিসেবেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলেন না, তার অধিকারই ঠিকমতো আদায় করলেন না, আর আপনি এখনই একাধিক স্ত্রীর স্বামী হতে চাচ্ছেন? আপনি অলরেডি একজনের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছেন, এরপর আরও নারীর জীবনও ধ্বংস করতে চান?
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সঠিকভাবে বোঝার এবং বাস্তব জীবনে আমল করার তৌফিক দান করুন।
এমএম