বর্তমান বিশ্বে আলোচিত একটি শব্দ হচ্ছে 'সমকামিতা'। বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশে। কারণ কয়েকদিন আগে এই অপরাধের কারণে দুই নারীকে প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া হয় মালয়েশিয়াতে।
আর তারই কিছুদিন পর আজ (বৃহস্পতিবার) ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকে সমকামিতাকে বৈধ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।
আর এই সমকামিতার কারণে বর্ণিত অপরাধসংক্রান্ত ভারতের সংবিধানে থাকা ৩৭৭ নং অনুচ্ছেদকে অযৌক্তিক বলে ঘোষণা করা হয়।
বিশ্বের অনেক দেশ এটাকে বৈধতা দিলেও অশ্লীলতা আর ভয়ংকর বেহায়াপনার কারণে ইসলাম, হিন্দু এবং খ্রিস্টান- এই প্রধান তিন ধর্মই এটাকে সমর্থন করে না। নিম্নে ধর্মের আলোকে এর বর্ণনা দেওয়া হওয়া হলো:
ইসলাম ধর্ম
সমকামিতা বলতে আমরা বুঝি একই সেক্স বা লিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করা। গে এবং লেসবিয়ানের মাধ্যমে এক্ষেত্রে ছেলে মেয়েদের আলাদা করে বোঝানো হয়। কিন্তু পবিত্র ধর্ম ইসলামে এই homosexuality বা সমকামিতাকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
সমকামিতার সমস্যাটি বর্তমানের না; বরং এটা অতীতকালেরও এক প্রকাণ্ড সমস্যা এবং এই বিষয়ে আল্লাহ যে কঠিন ছিলেন সে বিষয়ে আলোকপাত পাওয়া যায় পবিত্র কোরআনে।
লুত (আ) এর কওমকে (Sodom আর Gomorrah নগরী) আল্লাহ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন যেসব কারণে এর মধ্যে সমকামিতা ছিল একটি। পবিত্র কোরআনে প্রায় ১৪ বার এই সম্পর্কে কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
"এবং আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন সে স্বীয় সম্প্রদায়কে বললঃ তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি ? তোমরা তো কামবশতঃ পুরুষদের কাছে গমন কর নারীদেরকে ছেড়ে। বরং তোমরা সীমা অতিক্রম করেছ।" (আরাফ ৭:৮১-৮২)
"সারা জাহানের মানুষের মধ্যে তোমরাই কি পুরূষদের সাথে কুকর্ম কর?
এবং তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্য সঙ্গিনী হিসেবে যাদের সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে বর্জন কর? বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।" (শুয়ারা ২৬:১৬৫-১৬৬)
"স্মরণ কর লূতের কথা, তিনি তাঁর কওমকে বলেছিলেন, তোমরা কেন অশ্লীল কাজ করছ? অথচ এর পরিণতির কথা তোমরা অবগত আছ! তোমরা কি কামতৃপ্তির জন্য নারীদেরকে ছেড়ে পুরুষে উপগত হবে? তোমরা তো এক বর্বর সম্প্রদায়। উত্তরে তাঁর কওম শুধু এ কথাটিই বললো, লূত পরিবারকে তোমাদের জনপদ থেকে বের করে দাও। এরা তো এমন লোক যারা শুধু পাকপবিত্র সাজতে চায়। অতঃপর তাঁকে ও তাঁর পরিবারবর্গকে উদ্ধার করলাম তাঁর স্ত্রী ছাড়া। কেননা, তার জন্যে ধ্বংসপ্রাপ্তদের ভাগ্যই নির্ধারিত করেছিলাম।" (কুরআন ২৭: ৫৪-৫৭)
"আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ সুসংবাদ নিয়ে ইব্রাহীমের কাছে আগমন করল, তখন তারা বলল, আমরা লুতের জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব। নিশ্চয় এর অধিবাসীরা অপরাধী।" (২৯:৩১)
কুরআন ছাড়াও হাদিসে যেভাবে এই সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো:
"আবু সাইদ আল খুদ্রি বলেন, রাসুল (স) বলেছেন, একজন পুরুষ আরেক পুরুষের যৌনাঙ্গ দেখবে না। এক নারী আরেক নারীর যৌনাঙ্গ দেখবে না। এক পুরুষ আরেক পুরুষের সাথে অন্তত undergarment না পরে একই চাদরের নিচে ঘুমাবে না। এক নারী আরেক নারীর সাথে কখনও অন্তত undergarment না পরে একই চাদরের নিচে ঘুমাবে না।" (আবু দাউদ, ৩১:৪০০৭)
"জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেছেন, আমি আমার কওমের জন্য সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা আশঙ্কা করি সেটা হল লুতের কওম যা করত সেটা যদি কেউ করে... " (তিরমিজি, ১৪৫৭)
"ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স) বলেছেন, অভিশপ্ত সে যে কিনা কোন পশুর সাথে সেক্স করে, আর অভিশপ্ত সে যে কিনা সেটা করে যা লুতের সম্প্রদায় করত।" (আহমাদ: ১৮৭৮)
খিস্ট্রান ধর্ম
বাইবেলে সমকামিতার বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা না থাকলেও আংশিক যা আছে তার সারমর্ম হলো:
সমকামিতা এক ধরনের পাপ। এক্ষেত্রে রোমীয় ১:২৬-২৭ সুনির্দিষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, ঈশ্বরের অবাধ্য হওয়া এবং তাঁকে অস্বীকার করার ফলস্বরূপ সমকামিতার শাস্তি দেওয়া হয়েছে। লোকেরা যখন অবিশ্বাসের কারণে পাপ করতেই থাকে, তখন ঈশ্বর “লজ্জাপূর্ণ কামনার হাতে” তাদের ছেড়ে দেন যেন তারা আরও জঘন্য পাপে ডুবে যায় এবং ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে থাকার ফলে নিস্ফল ও নৈরাশ্যের জীবন অনুভব করতে পারে। ১ করিন্থীয় ৬:৯ পদে বলা হয়েছে যে, যারা সমকামিতায় “দোষী”, তারা ঈশ্বরের রাজ্যের অধিকার পাবে না।
ঈশ্বর সমকামিতার মনোভাব দিয়ে মানুষ সৃষ্টি করেন নাই। পবিত্র বাইবেল বলেছে, লোকেরা পাপের কারণে সমকামী হয় (রোমীয় ১:২৪-২৭) এবং এটা তাদের নিজেদের পাপপূর্ণ ইচ্ছার পরিণতি।
হিন্দু ধর্ম
হিন্দুধর্ম শাস্ত্রেও সমকামিতার বিধান দেখতে পাওয়া যায়| না। দেবতা বিষ্ণু ও মহাদেব শিবের হরিহর রুপে মিলন এইরকম একটি পৌরানিক আখ্যান থেকে অনেকের মতে সমকামিতা নির্দেষ করে | যদিও বিষ্ণূ সেই সময় নারীরুপে ছিলেন বলে সমকামিতার অভিযোগ যুক্তিতে খাটে না।
তাছাড়া যেহেতু এইসব কাহিনী পুরানসমূহ হতে জানা যায়, তাই হিন্দু ধর্মালম্বীরা এই কাহিনিকে আধ্যাত্ত্বিক বা যেসব বিষয়ে ভক্তি ও য়ুক্তির এক রহস্য লুকিয়ে থাকে এমন বিষয়ই মনে করে থাকেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে এটি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যে কোন ধরনের যৌন-সহবাস, তা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক, শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সমকামীতার ব্যাপারে বাংলাদেশের আইন কি বলে। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সাথে প্রকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করেন, সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দন্ডিত হবেন এবং তদুপরি অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
জেড/বাবলু





