ধর্ম হচ্ছে অতিপ্রাকৃত সত্ত্বায় বিশ্বাস। সাধারণ মানুষের কাছে লাইলাতুল মিরাজের ঘটনা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা যা ইচ্ছা তা করতে পারেন কেননা তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। সকল নবী-রাসূলগণের মধ্যে একমাত্র হযরত মুহাম্মদ সা. কে আল্লাহ তা’য়ালা তার কাছে ডেকে নিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মানের আসনে আসীন করেছেন। স্রষ্টা কর্তৃক মনোনীত এমন মহামানবের উম্মত হতে পেরে নিশ্চয়ই আমরা গর্বিত।

মেরাজ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা ঘোষণা করেন, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে এক রজনীতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় পরিভ্রমণ করিয়েছিলেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছিলাম তাকে আমার নিদর্শন পরিদর্শন করার জন্য, নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১) ।

হাদীসের ভাষ্যানুযায়ী, রাসূলুল্লাহ সা. এর ৫০বছর বয়সে নবুওয়াতের দশম বর্ষে রজব মাসের ২৬তারিখ দিবাগত রজনীতে মিরাজের বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে। সে রাত্রিতে হযরত মুহাম্মদ সা. কাবা শরিফের চত্ত্বরে (হাতিমে) অথবা কারও মতে, উম্মে হানীর ঘরে শায়িত ও নিদ্রিত ছিলেন। এমন সময় ফেরেশতা জিব্রাইল আ. সেখানে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগালেন, ওজু করালেন, সিনা চাক করলেন এবং ‘বোরাকে’চড়িয়ে মুহূর্তের মধ্যে বায়তুল মোকাদ্দাস পৌঁছালেন। সেখানে হজরত মুহাম্মদ সা. ‘ইমামুল মুরসালিন’হিসেবে তাঁর ইমামতিতে সমস্ত নবী-রাসুলকে সঙ্গে নিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করলেন।

এরপর তিনি আবার ‘বোরাকে’চড়ে মহাকাশ পরিভ্রমণ করলেন এবং সপ্তম আকাশে তাঁর সঙ্গে হজরত আদম আ., হজরত ঈসা আ., হজরত ইয়াহইয়া আ., হজরত ইউসুফ আ., হজরত ইদ্রিস আ., হজরত হারুন আ., হজরত মূসা আ. ও হজরত ইব্রাহিম আ.-এর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত ও সালাম বিনিময় হলো। নবীদের সংবর্ধনা শেষে সেখান থেকে সপ্তম আকাশের ওপর ‘সিদরাতুল মুনতাহা’নামক স্থানে পৌঁছালেন, যেখানে জিব্রাইল (আ.) থেমে গেলেন।

…..

মিরাজ রজনীতে আল্লাহ তা’য়ালা ও হযরত মুহাম্মদ সা. এর মধ্যে আশেক ও মাশুকের ন্যায় আলাপ হয়েছিল।

ঐতিহাসিক মিরাজ রজনীতে আল্লাহ তা’য়ালা তার প্রিয় বন্ধু হযরত মুহাম্মদ সা. এবং তার বান্দাহদের প্রতি বিশেষ উপহার প্রদান করেন ।

হাদীস শরীফের আলোকে প্রমাণিত যে এ রাতে যে সকল নেয়াতম দেয়া হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, প্রথমতঃ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। দ্বিতীয়তঃ তাঁর উম্মতের যেসব ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না, আল্লাহ তার পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন বলে ঘেষণা। তৃতীয়তঃ সূরা আল-বাকারার শেষাংশ। যারা মিরাজের ঘটনাকে অস্বীকার করেন তাদের পরিণতি আবু জেহেলের চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে না। মিরাজের ঘটনা শ্রবন করতঃ বিশ্বাস করেই হযরত আবু বকর রা.-কে হযরত মুহাম্মদ সা. সিদ্দিক উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। যারা মেরাজকে অবিশ্বাস করেন তাদের জ্ঞাতার্থে কয়েকটি ঐতিহাসিক সত্যের দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি-

….

  • হযরত মূসা আ.-এর সদলবলে হেঁটে নীলনদ পার।
  • হযরত ইব্রাহিম আ.-এর বিশাল অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা।
  • হযরত ঈসা আ.-এর আকাশে আরোহণ।
  • বিবি মরিয়মের স্বামী ব্যতীত পুত্রসন্তান লাভ।

….

উপোরক্ত অস্বাভাবিক বিষয়গুলো যেই ক্ষমতাধর স্রষ্টা সংগঠিত করতে পেরেছেন সেই খোদাই মিরাজ সংগঠন করিয়েছেন। সুতরাং কোন মুসলিমের মিরাজের সত্যতা বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকা উচিত নাই। বিধর্মীদের মধ্যে যারা জ্ঞানী তারাও নিশ্চয়ই মিরাজের সত্যতাকে অস্বীকার করবে না। কেউ কেউ বলেন, হযরত সা. এর উর্ধ্বাকাশের বিষয়টি দৈহিক ছিল না বরং আত্মিক ছিল। বেশিরভাগ ইসলামিক স্কলার তাদের এ ধারণাকে কোরআন ও হাদীসের যুক্তি দ্বারা ভ্রান্ত প্রমাণ করেছেন। সুতরাং মেরাজের ঘটনা দৈহিক ছিল।

…..

ইসলাম বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। পছন্দ করেনা কোন নব উদ্ভাবিত আচারকে ইসলামের নামে প্রচার করাকে। কাজেই মিরাজকে কেন্দ্র করে ফিরনি খাওয়ার আয়োজন করে হাঙ্গামা সৃষ্টি কিংবা মহল্লাবাসীর ঘুম নষ্ট করা মিরাজ সংশ্লিষ্ট নয়, নয় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাও।

সুতরাং গতানুগতিক দিনগুলোর মত আল্লাহর হুকুম-নিষেধগুলো যথাযথভাবে পালন ও বর্জন করাই মিরাজের উত্তম শিক্ষা, ইসলামের শিক্ষাও বটে। মিরাজ সম্পর্কিত বহু জাল হাদিস আমাদের সমাজে প্রচালিত রয়েছে; যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। আমরা যেন ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করে সঠিক ইসলামের অনুসারী হতে পারি-আজকের পবিত্র রজনীতে এটাই হোক আল্লাহ কাছে আমাদের চাওয়া।

এমআইএস