ওল্ডটেস্টামেন্ট ও নিউটেস্টামেন্টে মহানবী (সাঃ): একটি বাইবেলের পূর্বাভাস নিয়ে ভ্যাটিকানে তোলপাড়ের ঘটনা ঘটেছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পৃথিবীতে আগমন সম্পর্কে ওই বাইবেলে পূর্বাভাস দিয়েছেন যিশু। এমন কথা প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই বাইবেলটি দেখতে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ষোড়শ পোপ বেনেডিক্ট।
অনেকে বলছেন, ওই বাইবেলটি হলো দ্য গসপেল অব বারনাবাস। এটি ১৫০০ বছরের পুরনো। গত ১২ বছর এটি তুরস্কে লুকানো ছিল। ২৪শে ফেব্রুয়ারি এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। এতে বলা হয়, ওই বাইবেলটি সোনালি অক্ষরে লেখা।
১ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড মূল্যের এই বাইবেলটি যিশুর মুখের ভাষা আরামাইকে লেখা। এর ফটোকপির প্রতিটি পৃষ্ঠার মূল্য পনের লাখ পাউন্ড। এতে তিনি তার প্রথম দিককার ধর্মপ্রচার ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আগমন সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়েছেন।
এ বাইবেলটি চামড়ায় বাঁধানো। আর লেখা হয়েছে পশুর চামড়ায়। এটি তুরস্কের পুলিশ ২০০০ সালে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশনের সময় উদ্ধার করে। তারপর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এটি ছিল নিবিড় পর্যবেক্ষণে। এরপরই তা হস্তান্তর করা হয়েছে আঙ্কারা ইথনোগ্রাফি মিউজিয়ামে। সামান্য কিছু ক্ষতি ঠিকঠাক করে এটি জনগণের জন্য শিগগিরই হাজির করা হবে প্রদর্শনীতে।
তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটনমন্ত্রী ইরটুগ্রুল গুনে বলেছেন, এই বাইবেলটি হবে গসপেলের যথার্থ সংস্করণ। এতে ইসলামের পক্ষে সমর্থন রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, এরই মধ্যে এটি দেখতে অনুরোধ করেছেন ভ্যাটিকানের কর্মকর্তারা। এ বাইবেলেই বলা হয়েছে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আগমনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যিশু। ইসলামের সঙ্গে মিল থাকায় এ বাইবেলটি লুকিয়ে রেখেছিল খ্রিস্টান চার্চের লোকেরা।
তিনি আরও বলেন, মুসলমানরা মনে করেন আদি গসপেল মার্ক, ম্যাথিউ, লুক এবং জন-এর সঙ্গে সংযোজন নতুন এই বাইবেলটি। ইসলাম বিশ্বাস করে গসপেলে যিশুকে একজন মানব হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং তিনি ঈশ্বর নন। ত্রিত্ববাদ ও ক্রুশবিদ্ধ সংক্রান্ত মতবাদও তা প্রত্যাখ্যান করে।
এতে বলা হয়, মহানবী (সাঃ) সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যিশু। গসপেলের এক সংস্করণে যিশু এক পুরোহিতকে বলেন- সেই বার্তাবাহককে কি নামে ডাকা হবে? মুহাম্মদ হবে সেই আশীর্বাদ ধন্য নাম।
মহানবী (সা.) সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মুসতফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন নবী-রাসূলগনের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর নবুওতের সত্যতার অনেক দলীল-প্রমাণ বিদ্যমান আছে। দালাইলুন-নুবুওওয়াহ নাম দিয়ে ইমাম বায়হাকীসহ অনেক মুহাদ্দিস সে সব প্রমাণ-পঞ্জি সংকলণ করেছেন। এ ব্যাপারে আর কোন প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা বাকী থাকেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা সে সব প্রমাণকে যথেষ্ট মনে করে না।
তাই বিভিন্ন যুগে ইসলামী মনীষীগন তাঁদের রচনাবলীতে বাইবেল থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়তের প্রমাণসমূহ তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন, যেমন হাফেজ ইবনে তায়মিয়া (মৃত্যু-৭৩৮ হি.) আল জাওয়াবুস-সহীহ গ্রন্থে, হাফেজ ইবনুল-কায়্যিম (মৃত্যু ৭৫১ হি.) হেদায়াতুল হায়ারা গ্রন্থে, আবুর ফজল আল মালেকী আল মুনতাখাবুল জালীল গ্রন্থে, আবু ওবায়দা আল খাযরাযী (মৃত্যু ৫৮২ হি.) মাকামিউস সুলবান গ্রন্থে, ইমাম কুরতুবী আল এ’লাম বিমা ফী দীনি’ন-নাসারা মিনাল ফাসাদি ওয়াল-আওহাম গ্রন্থে, মাও: রহমতুল্লাহ কিরানবী ইজহারুল হক গ্রন্থে, ড: মুহাম্মাদ রুয়াস “মুহাম্মদ ফি কুতুবিল মোকাদ্দাসা” গ্রন্থে, ইবরাহীম খলীল আহমদ “মুহাম্মদ ফিত-তাওরাত ওয়াল ইঞ্জিল ওয়াল কুরআন” গ্রন্থে, এবং বাশারী যাখারী মিখাঈল “মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ হাকাজা বাশশারাত বিহিল-আনাজীল ” গ্রন্থে ।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আলোচনা যে বাইবেল তথা তওরাত ও ইঞ্জিলে উল্লেখ ছিল সে কথা কোরআনে কারীমেই বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছেঃ যারা অনুসরণ করবে রাসূলের অর্থাৎ উম্মী নবীর যাঁর কথা তারা তাদের নিকট লিপিবদ্ধ পেয়ে থাকে তাওরাত ও ইঞ্জিলে ....... (আনআম-১৫৭)।
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তাঁকে চিনত যেমন ভাবে নিজেদের সন্তানদের চিনত (বাকারা-১৪৫)।
কুরআন নাযিলের যুগে ইহুদী ও খৃষ্টানদের কেউই উক্ত আয়াতকে চ্যালেঞ্জ করেনি। তখনকার দিনে তারা উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী গুলিতে অর্থগত বিকৃতি ঘটিয়ে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করত। কিন্তু মুসলিম মনীষীবর্গের উক্ত ভবিষ্যদ্বাণীগুলি দ্বারা জোড়ালো
প্রমাণ পেশের বিপরীতে ঐ অর্থগত বিকৃতি যথেষ্ট হচ্ছিল না। ফলে তারা সেগুলির শব্দগত বিকৃতির হীন পথ বেছে নিয়ে নিজেদের দুর্ভাগ্যকে ত্বরান্বিত করেছে। এখানে উদাহরণ স্বরূপ ৮টি ভবিষ্যৎ বাণী তুলে ধরছি।
এ ব্যাপারে বাইবেলের বাংলা অনুবাদ কিতাবুল মোকাদ্দসের উপরই আমরা নির্ভর করেছি। তবে অনুবাদের ভুল ভ্রান্তি আমরা অপরাপর অনুবাদ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
১ নং ভবিষ্যদ্বাণী
বাইবেলের দ্বিতীয় বিবরণে (৩৩:১-৩) মুসা (আ.) এর উক্তি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-“মাবুদ তুর পাহাড় থেকে আসলেন, তিনি সেয়ীর থেকে তাদের উপর আলো দিলেন; তাঁর আলো পারণ পাহাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি লক্ষ লক্ষ পবিত্র ফেরেস্তাদের মাঝখান থেকে আসলেন; তাঁর ডান হাতে রয়েছে তাদের জন্য আগুন ভরা আইন। সত্যিই তিনি তাঁর নিজের বান্দাদের মহব্বত করেন। পবিত্র ফেরেস্তারা তাঁর অধীনে রয়েছেন, তারা সবাই তাঁর পায়ে নত হয়ে আছেন; তাঁরই কাছে তাঁরা হুকুম পান।”
উপরোক্ত উদ্ধৃতিতে কয়েকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়ঃ
ক. মাবুদ তুর পাহাড় থেকে আসলেন” বলে তুর পাহাড়ে মুসা (আ.) এর উপর খোদার তাজাল্লি প্রকাশ এবং সেখানে তাঁকে তাওরাত প্রদানের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। “সেয়ীর থেকে তাদের উপর আলো দিলেন” দ্বারা ঈসা (আ.) কে নবুওয়ত ও ইঞ্জিল প্রদানের কথা বলা হয়েছে। সেয়ীর শামের একটি পাহাড়ের নাম । এর বর্তমান নাম হল জাবাল আল খালীল। এ পাহাড়ের উপরহযরত ঈসা (আ.) ইবাদত-বন্দেগী করতেন। উল্লেখ্য যে, এ বাক্যটির অনুবাদে খৃষ্টানরা কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
সে হিসেবে বাংলা পবিত্র বাইবেলের অনুবাদই সঠিক বলে মনে হয়। সেখানে বলা হয়েছে- সেয়ীর হইতে তাহাদের প্রতি উদিত হইলেন।
খ. “তাঁর আলো পারণ পর্বত থেকে ছড়িয়ে পড়ল” বলে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর ওহী নাযিল হওয়া এবং তাঁকে বিশ্ব মানবের পথ-নির্দেশকারী কুরআন হাকীম প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এখানে পারণ পর্বত বলে মক্কার পর্বতশ্রেনীকে বোঝানো হয়েছে। জাবালে নূর, (হেরা পাহাড়) সব ঐ পর্বত শ্রেনীরই অংশ।
বাইবেলের ইয়াহুদী-খৃষ্টান ভাষ্যকাররা সবাই একমত যে এখানে পারণ (ফারান) বলতে সেই স্থানকেই বোঝানো হয়েছে, যে স্থানে হযরত হাজেরা ও হযরত ইসমাঈল বসবাস করতেন বলে বাইবেলের আদি পুস্তকে উল্লেখ করা হয়েছে (দ্র. অক্সফোর্ড ইনসাইক্লোপেডিয়াস কনকন্ডেন্স, পৃ ২১৭ ঢ়ধৎধহ শব্দে)।
আদি পুস্তকে ইসমাঈল (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে পারণ নামে এক মরুভূমিতে সে বাস করতে লাগলো (২১:২১ বাংলা কিতাবুল মোকাদ্দস)। আর সকল ঐতিহাসিকের কাছে এটা স্বীকৃত কথা যে হযরত ইসমাঈল মক্কা শরীফের পারণেই বসবাস করেছিলেন। সুতরাং সেই পারণই যে এখানে উদ্দেশ্য হবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। মজার ব্যাপার হল, সামেরীদের বাইবেলে এখানে পারণ শব্দের পর বন্ধনীর মধ্যে “হেজাজ” শব্দটিও উল্লেখিত আছে। এ থেকে আরও স্পষ্ট হয় যে, এখানে পারণ বলতে মক্কাকেই বোঝানো হয়েছে। সুতরাং খৃষ্টানদের এই দাবী যে, “পারণ বলতে এখানে সেয়ীর থেকে সিনয় পর্বত পর্যন্ত এলাকাকে বোঝানো হয়েছে” এটা মোটেও ঠিক নয়।
উপরোক্ত পদগুলোতে তিনটি গুরুত্বপূর্ন ঐতিহাসিক পবিত্র স্থানের কথা বলা হয়েছে। সেখান থেকে মানুষের হেদায়েতের আলো বিচ্ছুরিত হয়েছিল।
এভাবে উক্ত পদগুলো কুরআন কারীমের সূরা ত্বীনের সংগে হুবহু মিলে যায়। উক্ত সূরার শুরুতে বলা হয়েছে, ত্বীন ও যায়তূনের কসম, সিনাই পর্বতের কসম, এবং এই নিরাপদ শহরের (মক্কা শরীফ) কসম, এখানে সিনাই পর্বতও নিরাপদ শহরের বিষয় সকলের কাছে স্পষ্ট।
ত্বীন ও যায়তুন বলে মণীষীদের মতে শামদেশকে বোঝানো হয়েছে। কারণ ত্বীন ও যায়তুনের সর্বাধিক উৎপাদন উক্ত দেশেই হয়ে থাকে। বহু নবী-রাসূল এদেশে আগমন করেছেন ও সেখানে সমাহিত আছেন। ঈসা (আ.) এর জন্মও এই শামের ফিলিস্তিনে, সেয়ীর পর্বতও এখানেই অবস্থিত।
উল্লেখ্য যে তাঁর আলো পারণ পর্বত থেকে ছড়িয়ে পড়ল” এই অনুবাদে কিছুটা বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। বাংলা পবিত্র বাইবেলে পদটি এভাবে আছে-পারণ পর্বত হইতে আপন তেজ প্রকাশ করিলেন। ইংরেজী, আরবী ও উর্দূ অনুবাদের সঙ্গে এই দ্বিতীয় অনুবাদের মিলই পাওয়া যায় বেশী।
এখানে মূলতঃ তিনটি বাক্যে তিনটি কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দসে দু'টি কথা বানানোর সুক্ষ চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া উক্ত তিনটি বাক্যে মূসা (আ.) এর নবুওয়তকে প্রভাতের আলোর সঙ্গে, ঈসা (আ.) এর নবুওয়তকে সূর্যোদয় কালীন আলোর সংগে এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়তকে দ্বিপ্রহরের প্রখর সূর্যালোকের সংগে তুলনা করা হয়েছে। বিভিন্ন অনুবাদ থেকে এটাই সুস্পষ্ট। কিন্তু কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদে এটাও গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।
গ. “ তিনি লক্ষ লক্ষ ফেরেস্তাদের মাঝখান থেকে আসলেন” এটা বিকৃত অনুবাদ, ইচ্ছা করেই এ বিকৃতি ঘটানো হয়েছে, যাতে এটা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর প্রযোজ্য না হয়। প্রাচীন ইংরেজী অনুবাদে বলা হয়েছে।
তিনি দশ হাজার পবিত্র লোক (সাহাবী) নিয়ে আসলেন। প্রাচীন উর্দু অনুবাদ সমূহে এমনকি ১৯১৬ সালে মুদ্রিত উর্দূ বাইবেলে বলা হয়েছে-
دس ہزار قدسوں كے ساتھ أيا
অর্থাৎ দশ হাজার পবিত্রের সংগে আসলেন। এ কথাটি যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য কোন নবীর উপর প্রযোজ্য হয় না, কারণ একমাত্র তিনিই মক্কা বিজয়ের সময় দশ হাজার পবিত্র সাহাবীর জামাত নিয়ে এসেছিলেন; তাই খৃষ্টান ও ইয়াহুদীরা এই বাক্যটির অনুবাদে বিকৃতির যথেষ্ট চেষ্টা চালায়।
প্রথমত: তারা “দশ হাজার”কে হাজার হাজার বানায়। ক্যাথলিক উর্দূ বাইবেলে ہزاروںঅর্থাৎ “হাজার হাজার” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ১৮৪৪ সালের আরবী অনুবাদে معه الوف الأطهار (অর্থাৎ তাঁর সংগে রয়েছেন হাজার হাজার পবিত্র লোক) বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এতেও তাদের মন ভরেনি।
তাই ১৮৬৫ ও ১৮৯৮ সালের আরবী অনুবাদে و أتي من ربوات القدس বাক্য ব্যবহার করে বিকৃতির চুড়ান্ত করে ছেড়েছে। أتي من ربوات القدس এর অর্থ দাঁড়ায় তিনি হাজার হাজার পবিত্রের কাছ থেকে আসলেন। এখানে দশ হাজারকে হাজার হাজারে পরিণত করা ছাড়াও “সংগে আসলেন” কে “কাছ থেকে আসলেন” দ্বারা পরিবর্তন করা হয়েছে।
বাংলা পবিত্র বাইবেলে এই শেষোক্ত অনুবাদকেই অবলম্বন করে বলা হয়েছে- তিনি অযুত অযুত পবিত্রের নিকট হইতে আসিলেন। পরবর্তীতে কিতাবুল মোকাদ্দস নামে বাইবেলের নতুন সংস্করণ তৈরী করার সময় অনুবাদকরা “হাজার” আর “অযুত” কে বিদায় করে তার জায়গায় “লক্ষ লক্ষ” শব্দ যোগ করেন এবং পবিত্র লোকের স্থানে ফেরেস্তা শব্দটি সংযোজন করেন, যাতে কোন ভাবেই মুসলমানরা দাবী করতে না পারে যে, এটা তাদের নবীর জন্য ভবিষ্যদ্বাণী।
যাহোক খুশীর ব্যাপার হল এতসব বিকৃতকারীদের মধ্যেও কিছু কিছু সত্যাশ্রয়ী আছেন যারা দশ হাজারকে বাইবেলে পুনঃস্থাপন করেছেন।(১৯৬৭ সালে নিউইয়োর্ক থেকে মুদ্রিত)
ঘ. “তাঁর ডান হাতে রয়েছে তাদের জন্য আগুন ভরা আইন” এবং ১৮২৩ ও ১৮৪৪ সালের আরবী অনুবাদে -
فى يمينه سنة من نار (অর্থাৎ অগ্নিময় তরিকা) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
১৮৬৫ সালের আরবী অনুবাদে বলা হয়েছে فى يمينه نار شريعة لهم (তাদের জন্য অগ্নিময় শরীয়ত আছে তার ডান হাতে) এবং প্রায় সকল উর্দূ অনুবাদে
“ اتشى شريعت ” শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে, যার অর্থ অগ্নিময় শরীয়ত। বাংলা পবিত্র বাইবেলে “অগ্নিময় ব্যবস্থা” কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে, তবে শেষে “ছিল” শব্দটি যোগ করে বিকৃতি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যা হোক, এই অগ্নিময় শরীয়ত বলতে সেই শরীয়তই বোঝানো হয়েছে যাতে কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদের বিধান রয়েছে। আর এটা ঈসা (আ.) এর ব্যাপারে খাটে না, কারণ তাঁর শরীয়তে জিহাদ ফরজ ছিল না। এটা পুরোপুরি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যাপারেই প্রযোজ্য তাঁর শরীয়তেই জেহাদকে ফরজ করা হয়েছে।
আশ্চর্যের ব্যাপার হল ২০০৪ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক থেকে মুদ্রিত ইয়াহুদীদের বাইবেলে এই পুরো বাক্যটি মুছে ফেলা হয়েছে।
ঙ. সত্যিই তিনি তাঁর নিজের বান্দাদের মহব্বত করেন। এটিও বিকৃত অনুবাদ। ইংরেজী অনুবাদে আছে তিনি সত্যিই লোকদের ভালোবাসেন। ইহুদীদের ইংরেজী বাইবেলে বলা হয়েছে তিনি নিশ্চয়ই মানুষকে ভালবাসাদানকারী।
উর্দু অনুবাদে বলা হয়েছে ہاں وه اپنے لوگوں سے بڑى محبت ركهتا ہے
অর্থাৎ সত্যিই তিনি নিজের লোকদের সংগে খুব মহব্বত রাখেন। বাংলা পবিত্র বাইবেলে বলা হয়েছে-নিশ্চয় তিনি গোষ্ঠীদিগকে প্রেম করেন।
এসব অনুবাদের কোথাও “বান্দাদের” কথাটি নাই। কিতাবুল মোকাদ্দসের অনুবাদে ইচ্ছা করেই এটি বাড়ানো হয়েছে যাতে সুসংবাদটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর প্রযোজ্য না থাকে। উল্লেখ্য যে, উপরোক্ত অনুবাদ সমূহে আরও একটি বিকৃতি ঘটানো হয়েছে, তা হল “মহব্বত করেন” “প্রেম করেন” সবগুলো শব্দই অতীত ও বর্তমানকাল বাচক। অথচ প্রাচীন উর্দূ অনুবাদ ও ক্যাথলিক বাইবেলে ভবিষ্যৎকাল শব্দ বাচক শব্দ যোগে বলা হয়েছে তিনি তাঁর লোকদের মহব্বত করবেন।
চ. পবিত্র ফেরেস্তারা তাঁর অধীনে রয়েছেন, তারা সবাই তাঁর পায়ে নত হয়ে আছেন; তারই কাছে তারা হুকুম পান। উর্দু অনুবাদে বলা হয়েছে-
اس كے سارے مقدس تيرے ہاتھ ميں اور وه تيرے قدموں كے پاس بيٹهےہيں اور تيرى باتوں كو مانيں گے
এ হিসাবে বাংলা পবিত্র বাইবেলের অনুবাদই অনেকটা সঠিক বলে মনে হয়। সেখানে বলা হয়েছে-“তাঁহার পবিত্রগন সকলে তোমার হস্তগত, তাহারা তোমার চরণতলে বসিল , প্রত্যেকে তোমার বাক্য গ্রহণ করিল।” তবে ইংরেজী অনুবাদের ও উর্দু অনুবাদের مانيں گے দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, এ ক্ষেত্রে সঠিক অনুবাদ এভাবে হওয়া উচিৎ-তাঁর পবিত্র গন সকলে তোমার হস্তগত, তারা তোমার চরণতলে উপবিষ্ট, প্রত্যেকে তোমার বাক্য গ্রহণ করবে।
এর দ্বারা প্রতিশ্রুত নবীর প্রতি তাঁর সাহাবীগণ যে চরম আনুগত্য প্রকাশ করবে সে দিকেই ইশারা করা হয়েছে। বলা বাহুল্য এটা শেষ নবী (সঃ) এরই বিশেষত্ব। সাহাবীগণ যে ভাবে তাঁর অনুগত হয়ে থেকেছেন, বিশ্ব ইতিহাসে তার নজীর নেই। এমনকি অমুসলিমগণও তা স্বীকার করেছেন, করতে বাধ্য হয়েছেন। এ ভাবে “গ” থেকে “চ” পর্যন্ত উল্লিখিত বাক্য গুলোতে যে চারটি কথা বর্ণিত হয়েছে, তা কুরআন শরীফের সুরা ফাতাহ এর কয়েকটি আয়াতের সংগে হুবহু মিলে যায়।
১. তিনি দশ হাজার পবিত্রের সংগে আসলেন। محمد رسول الله والذين معه (মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং যারা তার সংগে আছেন) মক্কা বিজয়ের সময় সাহাবীদের সংখ্যা দশ হাজারই ছিল। তারা ফারানের চুড়া থেকে উদিত নূরানী সত্ত্বার সংগে মক্কা নগরীতে প্রবেশ করেছিলেন।
২. তার হাতে অগ্নিময় শরীয়ত। أشداء على الكفار (তাঁরা কাফেরদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর)।
৩. তিনি তাঁর নিজের লোকদের মহব্বত করবেন। رحماء بينهم (পরস্পর একে অন্যের প্রতি কোমল দয়াদ্র)।
৪. হে খোদা! তাঁর (অর্থাৎ ভবিষ্যতে আগমনকারী উক্ত নবীর) সকল পবিত্ররা (অর্থাৎ সাহাবীগন) তোমার হস্তগত তাঁরা তোমার
পদতলে উপবিষ্ট, এবং তারা তোমার কথা মেনে চলবে।
تراهم ركعا سجدا يبتغون من فضل الله و رضوانا سيماهم فى وجوههم من أثر السجود
(অর্থাৎ তুমি তাদেরকে দেখবে রুকু সেজদাবনত, তাঁরা অন্বেষণ করে চলছে আল্লাহর মহা অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি, সিজদার কারণে তাদের চেহারায় (বন্দেগীর) চিহ্ন পরিস্ফুটিত হয়ে আছে।) এরপরও কি এ ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ আছে যে ذلك مثلهم فى التورات
অর্থাৎ তাদের এই গুনাবলী তওরাতে বিদ্যমান আছে?
আজ একটি ঐতিহাসিক বিষয় উন্মোচিত হয়েছে। যা বিস্ময়ের চেয়েও বিস্ময়। আর সেটি হচ্ছে আজ থেকে ১৫০০ বছরের পুরনো বাইবেল সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। সেখানে ঈসা আঃ ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) পৃথিবীতে আগমনের কথা। আর এ বিষয়টি নিয়ে ভ্যাটিকেনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। তো যেখানে খৃষ্টোনদের বাইবেলে ঈসা আঃ রাসুল (সাঃ) নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। সেই রাসুল (সাঃ) কে নিয়ে আজ খৃষ্টান জগতে কেন এত অবমাননা !
ঢাকা, টাইমনিউজবিডি.কম,এসএইচ, এসআর





