আরাফাত ময়দানে দিনভর দশ লাখেরও বেশি আল্লাহর মেহমানগন ময়দানে অবস্থান করে নিজের গোনাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছেন। কান্নাকাটি করেছেন, নামায আদায় ও কুরআন তেওলাওয়াতসহ ইবাদাত বন্দেগি করেছেন। সেখানে যোহর ও আছরের নামায একসাথে আদায় করেছেন। যোহরের নামাযের আগে মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দিয়েছেন সৌদির সাবেক বিচারমন্ত্রী ও মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের বর্তমান মহাসচিব শায়খ ড. মুহাম্মদ বিন আবদুল করিম আল ইসা। খুতবায় তিনি মুসলিম উম্মাহর হেফাজতের জন্য উত্তম চরিত্র গঠন করে পারষ্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান।

তিনি সকল মুসলিমকে উত্তম চরিত্র গঠনের আহবান জানিয়ে বলেন, উত্তম চরিত্র বলতে সমগ্র মানবজাতির মধ্যে একটি যৌথমূল্যবোধকে বুঝায়, মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই যাকে শ্রদ্ধা করে। সেটি হলো, কথা ও কাজে মার্জিত সঠিক আচার আচরণ। আল্লাহ বলেন, আর তোমারা মানুষের সাথে উত্তমভাবে কথা বলো। তিনি আরো বলেন, ভালো কাজ আর মন্দ কাজ সমান হতে পারে না, মন্দ প্রতিহত করো উৎকৃষ্ট দ্বারা। ফলে তোমার সাথে যার শতত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।

খুতবায় বলা হয়, হে দুনিয়ার মুসলিমগন, আপনারা আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করুন। আল্লাহর ইবাদাত করুন। এটাই সর্বোৎকৃষ্ট সঞ্চয়। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ। আপনি কিভাবে আল্লাহকে ভয় না করে পারেন। আর এককভাবে তার ইবাদাত না করে পারবেন? অথচ লাভ ক্ষতির মালিক তো তিনিই।

হজের খুতবায় খতিব সবাইকে ভালো কাজের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, আপনাদেরকে ভালো কাজের প্রতি ধাবিত হওয়ার জন্য উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহ বলেন, তোমরা স্বীয় প্রতিপালক ও জান্নাতের দিকে ধাবিত হও। যার প্রসারতা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল পর্যন্ত। আর তোমরা ভালো কাজ কর, যেন তোমরা সফলকাম হতে পার। হে আল্লাহর বান্দাগন, ভালো কাজে ধাবিত হওয়ার অন্যতম অর্থ হলো, সেসব ইসলামী মূল্যবোধ ধারণ করা, যা মুসলিমের আচার আচরণকে মার্জিত করে সভ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। তার মূর্তপ্রতীক ছিলেন, মুহাম্মদ সা.।

তিনিই সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। মুহাম্মদ সা. বলেছেন, কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবে সে ব্যক্তি, যার চরিত্র তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো। আর সাধারণ অর্থে উত্তম চরিত্র বলতে সমগ্র মানবজাতির মধ্যে একটি যৌথমূল্যবোধকে বুঝায়, মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই যাকে শ্রদ্ধা করে। সেটি হলো, কথা ও কাজে মার্জিত সঠিক আচার আচরণ। আল্লাহ বলেন, আর তোমারা মানুষের সাথে উত্তমভাবে কথা বলো। তিনি আরো বলেন, ভালো কাজ আর মন্দ কাজ সমান হতে পারে না, মন্দ প্রতিহত করো উৎকৃষ্ট দ্বারা। ফলে তোমার সাথে যার শত্রæতা আছে সে হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।

খুতবায় আরো বলা হয়, মুর্খতা ও বোকামীর মোকাবেলায় আল্লাহ বলেন, আপনি বিনয় ও ক্ষমা পরায়নতার নীতি গ্রহণ করুন। আর লোকদেরকে সৎ কাজের নির্দেশ দিন আর মূর্খদের এড়িয়ে চলুন।

খুতবায় ইসলামী মূল্যবোধের বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, ইসলামী মূল্যবোধের অন্যতম বিষয় হলো, যা কিছু ঘৃণা ও হিসাং বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এবং যা কিছু আমাদের পারষ্পরিক সৌহার্দ্য ও সর্ম্পক বিনষ্ট করে তা থেকে দূরে থাকা। আর আমাদের আচার আচরনে পারষ্পরিক ভালোবাসা ও মায়ামমতা বিদ্যমান থাকা। আর এসকল মূল্যবোধ আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে ধারন করার চূড়ান্ত পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত। আল্লাহ বলেন, আর তোমরা একযোগে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ কর। পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।

মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করার আহবান জানিয়ে খুতবায় বলা হয়, ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারষ্পরিক সহযোগিতা মুসলিম মিল্লাতের হেফাজতে ও ঐক্যের বন্ধনে এবং অন্যের সাথে উত্তম আচরণ নিরাপত্তার সুরক্ষিত বেষ্টনির ভূমিকা পালন করে। আর একথা প্রমাণিত হয় যে, ইসলাম ব্যাপক ভিত্তিক ও সার্বজনীন এমন এক চেতনার নাম, যা গোটা মানবতার কল্যাণ অর্ন্তভূক্ত করে। রাসূল সা. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উত্তম সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে উপকারী। ইসলামী শরীয়া মানবতাকে উর্দ্ধে স্থান দিয়েছে। যার মধ্যে কোন দ্বিমুখী নীতি নেই। আর ইসলামের নীতি কখনো পরিবর্তন হয় না। ইসলাম সকলের কল্যাণকে ভালোবাসে এবং সকলের অন্তরে মিল মহব্বত সৃষ্টি করতে চায়। এসকল মহান মূল্যবোধের কারণেই ইসলামের আলো প্রসারিত হয়েছে। পৃথিবীর সকল আনাচে কানাচে লোকালয়ে পৌছেঁছে।

খতিব বিদায় হজের ভাষনের কথা তুলে ধরে বলেন, আরাফার স্থানটি দোয়া কবুলের অন্যতম স্থান। কেননা রাসূল সা. আরাফায় অবস্থানকালে বেশি বেশি দোয়া করেছেন। আরাফায় দোয়া ও জিকিরের সাথে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করেছেন। পরে ধীরে ধীরে মুজদালিফায় গিয়ে মাগরিব ও এশার নামায আদায় করেছেন। সারারাত অবস্থান করেছেন। পরদিন সকালে মিনায় গিয়ে বড় জামারায় পাথর নিক্ষেপ করেছেন। পরে কুরবানী করেছেন। বিদায় হজের ভাষণে মুহাম্মদ সা. বলেছেন, ইসলামকে পরিপূর্ণ করা হয়েছে। এই ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে পালন করার জন্য তিনি মুসলিম উম্মাহর প্রতি আহবান জানান।

আরাফাতের ময়দানে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করেন হাজীরা। সারাদিন অবস্থানের পর সন্ধ্যায় হাজীরা মিনা ও আরাফাতের মধ্যবর্তী মুজদালিফায় গিয়ে রাত্রিযাপন করবেন।

মুজদালিফায় একত্রে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করে সেখান থেকে মিনায় শয়তানকে প্রতীকি পাথর নিক্ষেপের জন্য নুড়িপাথর সংগ্রহ করবেন তারা। সারারাত মুজদালিফায় অবস্থানের পর আজ শনিবার মিনায় গিয়ে হাজীরা জামরাতে বড় শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপ, কুরবানি ও চুল কাটার মধ্য দিয়ে ইহরাম থেকে মুক্ত হবেন।

প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আরাফাতের ময়দান থেকেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানবাধিকার, ইসলামের শিক্ষা এবং নারীর অধিকার এবং সুন্নাহ মেনে চলার জন্য ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণটি দিয়েছিলেন।

২০১৮ সাল থেকে অনুবাদ প্রকল্প শুরু করে মক্কা-মদিনার পবিত্র দুই মসজিদের জেনারেল প্রেসিডেন্সি বিভাগ। আরাফাত দিবসের খুতবা অনুবাদের ফলে প্রথম বছরে ১০ লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন। ২০২২ সালে যা সারা বিশ্বের ২০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে বলে আশা দেশটির হজ্জ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রনালয়র।

এবিএস