বাঁশের তৈরি বিশেষ তুলিতে ক্যানভাসে চলছে আঁকিবুকি। সাদা ক্যানভাসে বাহারি রঙ্গের আলপনায় আঁকা হচ্ছে এক একটি হরফ। পরিণত হচ্ছে রঙ্গীন ক্যানভাস। শিল্পকলা অ্যাকাডেমির গ্যালারিতে শোভা পাওয়া কালিমার সঙ্গে নজর কেড়েছে কুরআন হাদিসের বিভিন্ন বানি। এম এম আর্ট ফাউন্ডেশন নামের ফেসবুক ভিত্তিক একটি প্লাটফর্ম গেল ৩ মার্চ থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত আয়োজন করে এই ক্যালিগ্রাফি আর্ট প্রদর্শনী। নবীন ক্যালিগ্রাফি শিল্পীদের জন্য ছিল বিশেষ প্রশিক্ষণ ক্লাস।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা ভবনে গেল শুক্রবার (৩ মার্চ) পাঁচ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন এমএম আর্ট ফাউন্ডেশনের সভাপতি চিত্রশিল্পী মাহবুব মুর্শিদ।

calegraphy art 5

গ্যালারিতে শোভা পাওয়া আরবি ও বাংলা অক্ষরের নানা ডিজাইনের এসব ক্যানভাস ক্যালিগ্রাফ নামেই পরিচিত। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসব আর্টের অনেক বেশি পরিচিতি থাকলেও বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগিরিষ্ঠ হলেও তেমন পরিচিতি পায়নি। হাতেগোনা কয়েকজন এসব কাজ করতো। বিশেষ করে জাতীয় সংসদে স্পিকারের মাথার উপরে কাঠের উপরে খচিত কালিমার ক্যানভাস অনেকটাই পরিচিত।

আরবি বর্ণমালার পাশাপাশি বাংলা বর্ণমালাও সেজেছে কিছু ক্যানভাস। সেসবে জায়াগা পেয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই শীর্ষক বাঙালি জাতিসত্তার দ্রোহের চেতনা স্নাত স্লোগান। একইসাথে আরবি অক্ষরের মাঝে নান্দনিকভাবে মেলে ধরা হয়েছে বিভিন্ন সূরা থেকে আয়াত।

334485356_599990051654963_9216436614513086162_n

প্রচীনযুগে গুহা গায়ের সেই সংকেত চিহ্ন সময়ের স্রোতে পরিণত হয় বর্ণে । এসব ক্রমেই তা শব্দে ও বাক্যে রূপান্তরিত হয়, গড়ে ওঠে ভাষা। জীবনের প্রয়োজনে সেই ভাষা থেকেই সৃষ্টি হতে থাকে স্লোগান। এসব স্লোগানের নির্মাণের ধারাবাহিকতাই পরবর্তীতে হস্তলিপি শিল্প বা ক্যালিগ্রাফি আর্টের পরম্পরা হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে প্রাচীন বাংলায় মসজিদ, ধর্মীয় নানান স্থাপনার দেয়ালে ক্যালিগ্রাফির কারুকাজ দেখা যেত। এতে থাকতো ধর্মীয় ভাবধারা ও গাম্ভির্য। ক্রমেই এসব ক্যালিগ্রাফির জায়গায় হয় বড় প্রতিষ্ঠানের ক্যালেন্ডার, ডায়েরিসহ বিভন্ন প্রকাশনায়। অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও এখন সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং ধর্মীয় আবহ তৈরিতে এসব ক্যালিগ্রাফি জায়গা করে নিয়েছে।

calegraphy art 3

সেকারণে বর্তমানে এই শিল্পের বড় চাহিদা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে। এজন্যই তরুণদের মধ্যে এ শিল্পের প্রতি অনেক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। দেশের কওমি ধারার মাদ্রাগুলোতে যেমন ক্যালিগ্রাফি শিল্পি তৈরি হয়েছে, তেমনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও আগ্রহ নিয়ে শিখছে। শখের বসে শিখতে শুরু করলেও অনেকেই এখন এ শিল্পকে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন।

332726487_156713307254102_366870380757602300_n

তৃতীয় এম এম আর্ট ফাউন্ডেশনের প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ‘আমি পড়াশোনার পাশাপাশি সময় দিয়ে আর্ট করলেও অনেকেই এখন এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিচ্ছেন। এতে আর্থিক নিরাপত্তাও ভালো পাচ্ছেন তারা। কোনো কোনা ক্যানভাস লাখ টাকার উপরও বিক্রি হচ্ছে। কাজের মান ভালো হলে নির্দিধায় একজন শিল্পী এটিকে প্রধান পেশা হিসেবে নিতে পারেন।’

এসব ক্যালিগ্রাফির বিশেষত্ব সম্পর্কে ডা. মাওয়া বলেন, ‘সাধারণত যেসব ফ্রন্ট ব্যবহার করা হয় তার অনেকগুলোই সাধারণ মানুষের কাছে অপরিচিত। এজন্য নিচে আমরা আয়াতগুলো বা হাদিসগুলো সাধারণ ফ্রন্টে লিখে দিই। যাতে মানুষ আর্টগুলোর সৌন্দর্যে যেমন মুগ্ধ হবে তেমনি আয়াতগুলোও জানতে পারবে। তবে সাধারণভাবে আমরা ক্যানভাসে অক্ষরগুলোকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্ঠা করি।’

calegraphy art

প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া মহানগর মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান জানান, ‘প্রথম দিকে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। করোনার লকডাউনে হাতে কোনো কাজ না থাকায় একজনের এই কাজ দেখে আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর ইউটিউব থেকে কিছুটা শিখলে আরও বেশি আগ্রাহ তৈরি হয়। পরে মাহবুব মুর্শিদ স্যারের কাছ থেকে আরও ভালোভাবে শিখি। এখন এসব ক্যালিগ্রাফি ক্যানভাসে ভালো সম্মানিও পাই’।

calegraphy art১১

এমন আর্ট প্রদর্শনির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষার্থী এবং অভিজ্ঞ শিল্পীদের সঙ্গে নতুন শিল্পীদের একটা ভালো বোঝাপাড়া হয় বলে জানান মদিনাতুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী মারিয়া আক্তার। ক্যালিগ্রাফি আর্টের প্রসঙ্গে মারিয়া আক্তার বলেন, ‘ আমরা সাধারণত কুরআন ও হাদিসের বানিগুলো চেষ্টা করি নান্দনিকভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরতে। এসব ক্যানভাসের নান্দনিক সৌন্দর্য বরাবরই মানুষকে আকৃষ্ট করে। এতে করে ইসলামের বিভিন্ন বানি সাধারণ মানুষের কাছে আরও পরিচিত হবে।’

calegraphy art১২

এবারের তৃতীয় আর্ট প্রদর্শনীর প্রধান উদ্যোক্তা ও এম এম আর্ট ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা দেশের প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফি শিল্পি মাহবুব মুর্শিদ বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্যালিগ্রাফির ব্যপক প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশে এ শিল্পের তেমন প্রচলন নেই। আমরা চেষ্ঠা করছি এ শিল্পকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে। মানুষের আগ্রহ এবং এসব শিল্পের চাহিদা আমাদের নুতন শিল্পীদের অনেক বেশি উৎসাহিত করছে।’

এবারের আর্ট প্রদর্শনীতে প্রায় ১৭০ জন শিল্পীর কয়েকশো ক্যানভাস জমা পড়ে। সেখান থেকে ২৭০টি ক্যানভাস প্রদর্শনিতে স্থান পায়। আগামীতে ভালো পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও বৃহৎ পরিসরে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করার করার প্রত্যাশা মাহবুব মুর্শিদর।

এইচএম