আজ পবিত্র ঈদুল আযহা। সময়ের পরিক্রমায় বছর ঘুরে আমাদের মাঝে আবারও ফিরে এসেছে আনন্দের এই দিনটি। আল্লাহর জন্য নিজের জান-মাল ও প্রিয়তম জিনিস সন্তুষ্টচিত্তে বিলিয়ে দেয়ার এক সুমহান শিক্ষা দেয় পবিত্র এই দিনটি।

ঈদুল আযহা মুসলমানদের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। সারা বিশ্বে মুসলমানরা হিজরী বর্ষের দ্বাদশ মাস জিলহজ্বের ১০ তারিখে ঈদুল আযহা বা কুরবানীর ঈদ উদযাপন করে।

পবিত্র কুরআনের সূরা আল বাকারার ১৯৬ নম্বর আয়াতে ঈদ উদযাপনের মূল ভিত্তি দেখতে পাওয়া যায়।সূরা মায়েদাতে ‘ঈদ' শব্দটি দেখতে পাওয়া যায়, যার অর্থ হলো ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ আনন্দ-উৎসব।

ঈদ অর্থ বার বার ফিরে আসাও বুঝায়। তাই ইবনুল আরাবী বলেছেন, ঈদ নামকরণ করা হয়েছে এ কারণে যে তা প্রতি বছর নতুন সুখ ও আনন্দ নিয়ে আমাদের কাছে ফিরে আসে। আর আযহা বা কোরবানী শব্দের অর্থ ত্যাগ। আরবীতে তাই ঈদুল আযহা অর্থ হচ্ছে আত্মত্যাগের উৎসব।

পবিত্র এই দিনে সারা বিশ্বের মুসলিম জাতি হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আল্লাহর নির্দেশে পশু কোরবানী দিবেন। আর মহান ত্যাগের মাধ্যমে মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও খোদাভীতি অর্জন করে আল্লাহর পথে জানমাল উৎসর্গের চেতনায় উজ্জীবিত হবেন।

ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী কোরবানি করা ওয়াজিব। আল কুরআনের সূরা কাউসারে বলা হয়েছে, ‘‘অতএব তোমার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং কোরবানি কর।'' সূরা হজ্জে বলা হয়েছে, ‘‘কোরবানি করার পশু মানুষের জন্য কল্যাণের নির্দেশনা।''

হাদীসে বর্ণিত আছে ঈদের দিনে আল্লাহর কাছে কোরবানির চেয়ে অন্য কোন কাজ পছন্দনীয় নয়। এক হাদীসে হুজুর (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তির সামর্থ থাকার পরও কোরবানি দিল না, সে যেন ঈদের মাঠে না যায়।

কোরবানীর ইতিহাসঃ

হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুল ও তাদের অনুসারীরা কোরবানি করেছেন। ইতিহাসে হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল-কাবিলের মাধ্যমে প্রথম কোরবানির সূত্রপাত হয়।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আদমের পুত্রদ্বয়ের (হাবিল-কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদের যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল তখন একজনের (হাবিলের) কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না।’ তাদের একজন বললেন, ‘আমি তোমাকে হত্যা করবই।’ অপরজন বললেন, ‘আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ২৭)

তারপর আল্লাহর নবী হজরত নূহ (আ.), হজরত ইয়াকুব (আ.) ও হজরত মুসা (আ.)-এর সময়ও কোরবানির প্রচলন ছিল। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহ-প্রেমে স্বীয় পুত্রকে কোরবানি করার মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নযোগে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ত্যাগের জন্য আদিষ্ট হন। তিনি পর পর তিন দিন দৈনিক ১০০ করে মোট ৩০০ উট কোরবানি করেন। কিন্তু তা কবুল হলো না, বারবার আদেশ হলো, ‘তোমার প্রিয় বস্তু কোরবানি করো।’ শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারলেন, প্রাণপ্রিয় শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করতে হবে।

হজরত ইসমাইল (আ.) নিজের জানকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করতে নির্দ্বিধায় সম্মত হয়ে আত্মত্যাগের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রতি এটা ছিল আল্লাহর পরীক্ষা। তাই পিতার ধারালো ছুরি শিশুপুত্রের একটি পশমও কাটতে পারেনি; পরিবর্তে আল্লাহর হুকুমে দুম্বা জবাই হয়।

পৃথিবীর বুকে এটাই ছিল স্রষ্টাপ্রেমে সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কোরবানি। আত্মত্যাগের সুমহান ও অনুপম দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদির জন্য পশু কোরবানি করাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাদের স্মরণে এ বিধান অনাদিকাল তথা রোজ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের (কোরবানির) গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত ৩৭)

ঈদের দিন মুসলমানরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামায শেষে ঈদের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। সকাল সকাল গোসল সেরে উত্তম পোশাক পরে তারা ঈদগাহ বা মসজিদে সমবেত হয়। পুরুষেরা সুগন্ধি আতর ব্যবহার করে।

সুন্নত অনুযায়ী ঈদগাহে এক পথ দিয়ে যাওয়া হয় আর অন্য পথ দিয়ে ফিরে আসা হয়। ঈদুল ফিতরের মতো ঈদুল আযহাও শুরু হয় দুই রাকাত ওয়াজিব নামায দিয়ে। নামায শেষে ইমাম খুতবা প্রদান করেন। খুতবা শোনা ওয়াজিব।

এদিকে ৯ জিলহজ্ব ফযর নামাযের পর থেকে ১৩ জিলহজ্ব আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরয নামাযের পর তাকবীরে তালবিয়া পাঠ করা ওয়াজিব। তালবিয়াহ হলো, ‘‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।''

ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতিটি পরিবার একটি মেষ বা ছাগল কিংবা উট বা গরু কুরবানী দেয়। সাধারণত কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে এর এক ভাগ গরীব-দু:খী, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশী এবং অপর ভাগ নিজ পরিবারের জন্য রাখা হয়।

কুরবানী আল্লাহর নামে দেয়া হয়। আল্লাহর কাছে এর গোশত, রক্ত বা অন্য কোন কিছু পৌঁছায় না, তার কাছে যায় কুরবানী দাতার নিয়ত। তাই কুরবানীর জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত প্রয়োজন। কুরবানী করা পশুর গোশত দাতারা খেয়ে থাকেন। মূলত কুরবানীর পশুর অধিকাংশই অপরের জন্য বিলিয়ে দেয়া হয়ে থাকে।

কোরবানী কার উপর ওয়াজিবঃ যার উপর ছদকা ফেৎরা ওয়াজিব তার উপর কোরবানী করা ওয়াজিব অর্থাৎ ১০ যিলহজ্বের ফজর হতে ১২ যিলহজ্বের সন্ধা পর্য্ন্ত সময়ের মধ্যে কোন সময় যদি মালেকে নেছাব হয় তবে তার উপর কোরবানী ওয়াজিব হবে। মুছাফিরের উপর কোরবানী ওয়াজিব নহে। কুরবানী দাতা নিজে পশু জবাই করতে পারলে তা করাই উত্তম।

কখন কোরবানী করতে হবেঃ১০ জিলহজ্ব হতে ১২ জিলহজ্ব পর্যন্ত এই তিনদিন কোরবানী করার সময়। এই তিন দিনের মধ্যে যেদিন ইচ্ছা সেদিনই কোরবানী করার বিধান আছে। কিন্তু প্রথম দিন সর্বপেক্ষা উত্তম। তার পর দ্বিতীয় দিন। তারপর তৃতীয় দিন।

ঈদের নামাজের আগে কোরবানী করা দুরস্থ নয়। ঈদের নামাজের পর কোরবানী করতে হবে। অবশ্য যে স্থানে ঈদের নামাজ বা জুমার নামাজ দুরুস্থ নয় সে স্থানে ১০ জ্বিলহজ্বের ফজরের পরেও কোরবানী করা দুরস্থ আছে।

কোরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে দু'টি রাত পড়ে সেই দুই রাতেও কোরবানী করা জায়েজ আছে। কিন্তু রাতের বেলা যবেহ করা উচিত নয়। কেননা হয়ত কোন একটি রগ কাটা নাও যেতে পারে, যার ফলে কোরবানীর দুরুস্থ হবে না।

কেমন হবে কোরাবানী পশুঃ কুরবানীর উপযুক্ত হওয়ার জন্য গরু, ছাগল, উট বা বকরীর মতো গৃহপালিত পশু সুস্থ সবল ও নিখুত হতে হবে। রোগাক্রান্ত ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক পশু কুরবানী করা যাবে না।

গৃহপালিত পশুর মধ্যে গরু, মহিষ ও উটের মধ্যে এক হতে সাতজন পর্যন্ত শরীক হতে পারবে। গরু এবং মহিষের বয়স দুই বছরের কম হলে কোরবানী দুরস্থ হবে না। অন্যদিকে উটের বয়স পূর্ণ পাঁচ বছর হতে হবে। এখানে দাঁত উঠা বা না উঠার মধ্যে কোন শর্ত নেই।

বকরী, খাসী এবং দুম্বার দ্বারা একজনই কোরবানী করতে পারবে। বকরীর বয়স এক বছরের কম হলে কোরবানী দুরস্ত হবে না। দুম্বা ও ভেড়া বকরীরর মতই। কিন্তু ছয় মাসের বেশি বয়সের দুম্বার বাচ্চা যদি মোটা তাজা হয় তবে এরূপ দুম্বার বাচ্চার কোরবানী জায়েজ আছে অন্যথায় নহে। পক্ষান্তরে বকরীর বাচ্চা এরূপ মোটা তাজাও যদি হয় তবুও এক বছর পূর্ণ না হলে কোরনানী দুরস্থ হবে না।

পরিশেষে আমরা বলতে পারি, ঈদুল আযহার সময় পশু কোরবানী করা কেবল ধর্মীয় ও মানবিক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ তা নয় উপরন্তু তার অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম।

মুসলমানদের শুধু কোরবানীর প্রতীক হিসেবে পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিশ্ব মানবতার শান্তি ও কল্যাণের জন্য সবাইকে উৎসর্গিত ও নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে। মানুষের অন্তর থেকে পাশবিক শক্তি ও চিন্তা-চেতনাকে কোরবানী করে দিতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে কোরবানী জীব-জানোয়ার বা পশু হনন করতে আসে না, বরং কোরবানীর মাধ্যমে পশুপ্রবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার এটি যে একটি উত্তম ব্যবস্থা তা স্মরণ করিয়ে দিতে ঈদুল আজহা প্রতিবছর ফিরে আসে।

এআর/ জেএ