আগামী ৪ সেপ্টেম্বরের অনলাইন সম্মেলনকে সামনে রেখে সারা দেশেই চলছে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরিরের সক্রিয় কার্যক্রম। যা মূলত অবাক করে দিয়েছে দেশবাসীকে। কারণ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা এবং বিশ্ববিদ্যালগুলোতে এতো ব্যাপক পরিমাণ পোষ্টারিং করা হয়েছে যা দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলকেও হার মানায়।

এক সময় হিজবুত তাহরিরের কর্মীর সংখ্যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশি থাকলেও এখন তাদের গন্ডি ছাড়িয়েছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল পর্যায়ে। আর এবারের প্রচারণার ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের চাইতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুলের কর্মীদের ভুমিকাই বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। যার প্রমাণ মিলে সামাজিক যোগাযোগে তাদেরপোষ্ট করা ছবির মধ্য দিয়ে।

এছাড়া অবাক করার মতো আরেকটি বিষয় হল বেশিরভাগ সময়ে দিনের বেলাতেই হিজবুত তাহরিরের কর্মীরা তাদের পোষ্টার লাগিয়েছে এবং রাজধানীর নামকরা বিভিন্ন স্কুল ও মসজিদে তারা লিফলেট বিলি করেছে। আর তাদের এ কার্যক্রমের ছবি তারা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে।

 

দেশে যে পরিমাণ পোষ্টার ও লিফলেট বিলি করা হয়েছে তার ব্যয়ের পরিমাণ নেহাত কম নয়। কিন্তু কোন উৎস থেকে তারা পাচ্ছে এতো টাকা? এ বিষয়ে তাদেরই কয়েকজন কর্মীর সাথে কথা হয় টাইমনিউজবিডির এই প্রতিবেদকের। তারা জানায়, বড় ভাই'রা তাদেরকে এসব কিছু সরবরাহ করে থাকেন। কিন্তু একজন বা দুই জন বড় ভাই ছাড়া কাউকেই চিনেন না এ কর্মীরা। এছাড়া বড় ভাই'রা কে কোথায় থাকে তাও জানেন না স্থানীয় এই কর্মীরা।

হিজবুত তাহরির কে বা কারা চালাচ্ছেন তাদের কারো নামই জানেন না বেশির ভাগ কর্মী। বড়ভাইদের জিজ্ঞেস করলেও উত্তর পাওয়া যায় না এই বিষয়ে। তাহলে কিভাবে চলছে এই সংগঠন, তার রহস্য এখনো উন্মোচিত হয়নি।

এসব বিষয় নিয়েই কথা হয় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরিরের ঢাকা শহরের এক সংগঠক বা বড়ভাই হোসাইন ইবনে তাহির সাইমনের সাথে।

বিদেশি বা অন্য কোন উৎস থেকে টাকা পান না বলে জানান এই নেতা। তিনি বলেন, আমরা যারা হিজবুত তাহরির করি তারা নিজেরাই পোষ্টার-লিফলেট ছাড়াও সব ধরণের খরচ বহন করি।

এক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন হিজবুত তাহরিরের প্রধান সমন্বয়ক। বর্তমানে তিনি কি প্রধান আছেন নাকি অন্য কেউ দায়িত্ব পেয়েছেন-এই বিষয়ে হিজবুত তাহরিরের আরেক নেতা সাকিব মাহমুদ বলেন, আমরা যেহেতু নিষিদ্ধ সংগঠন তাই অনেক কিছুই প্রকাশ করতে পারি না।

সাকিব মাহমুদ জানান, আমাদের কেন্দ্রীয় আমির আতা আবু আল-রাস্তা'র নির্দেশেই সকল কাজ করি। আতা আবু আল-রাস্তা ফিলিস্তিনের নাগরিক এবং বর্তমানে তিনি জর্ডান থেকে হিজবুত তাহরির চালাচ্ছেন বলে জানান এই নেতা।

তিনি আরো জানান, বিশ্বের অনেক দেশেই আমাদের সংগঠন রয়েছে এবং প্রতিটি দেশের জন্য একটি করে উলাইয়া কমিটি রয়েছে, যারা মূলত সেই দেশের সংগঠন পরিচালনা করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের উলাইয়া কমিটির প্রধানকে সে বিষয়ে অবশ্য কিছু বলেন নি এই নেতা। এছাড়া তাদের নগর, জেলা বা থানা কমিটি আছে কিনা সে বিষয়েও কিছু জানান নি সাকিব মাহমুদ।

অনেক সক্রিয় কর্মীরাও জানেন না তাদের নেতা কে? কার নির্দেশে কাজ করছেন তারা? এমন ধুম্রজালের মধ্যে কিভাবে তারা সংগঠন পরিচালনা করছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাকিব বলেন, খেলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব আমাদের সবার, তাই আমির কে বা তিনি কি কাজ করেন তা দেখার বিষয় নয়। যার ভালো লাগে সে করেন, যার ভালো লাগে না সে করেন না। এ বিষয়ে বলার কিছুই নাই।

তাদের সাথে কথা বলে জানা গিয়েছে, রাজধানীর উত্তরা, দক্ষিণখান, আশকোনা, খিলক্ষেত, কুড়িল, শাহজাদপুর, গুলশান এবং পুরাতন ঢাকায় তাদের ভালো কাজ হয়। এছাড়া ইষ্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তাদের ব্যাপক কাজ হচ্ছে বলে জানা যায়।আর যারা সংগঠক তারা বেশির ভাগই কাজের সুবিধার জন্য শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

এদিকে, আগামী ৪ সেপ্টেম্বরের সম্মলনকে সামনে রেখে রাজধানীতে চট্টগ্রাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রকে লিফলেট বিলি করতে দেখেছেন অনেকে।

রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি জানান, এখন প্রায়ই এলাকার বিভিন্ন মসজিদে হিজবুত তাহরিরের কর্মীদের লিফলেট বিলি করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন বয়সে বড় এবং বাকিরা সবাই স্কুলের ছাত্র। তাহরির কর্মীদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলে জানায়। আর ছোটরা স্খানীয় বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র বলে জানায় এলাকাবাসি।

ঢাকার বাহির থেকে অনেকে এসে রাজধানীতে কাজ করছেন- তার মানে কি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মীর সংখ্যা কমে গেছে- জানতে চাইলে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরিরের ঢাকা শহরের এক সংগঠক হোসাইন ইবনে তালহা সাইমন বলেন, আমরা তো হিসেব করে কাজ করি না, তাই কোথায় সংখ্যা কমলো আর বাড়লো তার হিসেব বলতে পারবো না। তবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন: রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো কাজ হচ্ছে বলেও জানায় এই তাহরির নেতা।

বর্তমানে বড়দের চাইতে ছোটরাই বেশি জড়িয়ে পড়ছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরিরে। আর হিজবুত তাহরিরের কর্মীদের পুলিশ গ্রেফতার করলে কমপক্ষে ছয় মাসের আগে কেউই জামিন পায়না বলে জানায় হোসাইন ইবনে তালহা সাইমন। তাহলে কি কারণে স্কুলের ছোট ছাত্রদের তাদের সংগঠনে ভেড়ানো হচ্ছে এমন প্রশ্ন করা হলে সাইমন জানান, ইসলামী আন্দোলন করার শর্ত এই নয় যে, তার কমপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। শর্ত এই যে, ব্যক্তির বালেক হতে হবে। তাই স্কুলে পড়ে অথচ বালেক তাহলে তাদের নিলে সমস্যা থাকার কথা না।

আইনশৃংখলা বাহিনীর এতো নজরদারির ভিতরে কিভাবে এসব কাজ করেন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইমন বলেন, বিদেশী প্রভুদেরকে খুশি করতে মাঝে মধ্যে না পারতেই আমাদের গ্রেফতার করা হয়। এবার আমরা তো অনেক পুলিশ, এমন কি থানার ওসির হাতেও লিফলেট দিয়েছি, কিন্তু কই আমাদের তো গ্রেফতার করেননি তারা। এবার শুধু মাত্র রাজধানীর দক্ষিণখানে আমাদের দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশে আর কাউকেই আটক করা হয়নি।

রাজধানীর বুকে একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ব্যাপক সংক্রিয় কার্যক্রমের পিছনে রয়েছে আরেক রহস্য। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সরকারদলীয় অনেক নেতাকর্মী এখন তাদের সংগঠনের সাথে জড়িত এবং তারা হিজবুত তাহরিরের কার্যক্রমে (পোষ্টারিং-লিফলেট বিলি) সংক্রিয় অংশগ্রহন করে থাকেন। তাই দিনের বেলা বা খোলা উন্মুক্তভাবে তাদের কাজ করতে সমস্যা হয়না বলে দাবি করেন হোসাইন ইবনে তাহির।

হিজবুত তাহরির সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপ কমিশনার (গণমাধ্যম) মুনতাসিরুল ইসলাম টাইমনিউজবিডিকে জানান, হিজবুত তাহরির যাতে তাদের ঘোষিত অনলাইনে রাজনৈতিক সম্মেলন করতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের যথেষ্ট নজরদারি রয়েছে।

হিজবুত তাহরিরের সাথে সরকার দলীয় কেউ জড়িত আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছু বলা ঠিক না। তবে আমরা এ পর্যন্ত যাদের গ্রেফতার করেছি তাদের মধ্যে অনেকেই ধনাঢ্য পরিরবারের সন্তান। কিন্তু সরকার দলীয় কোন নেতার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

ইআর, কেবি