সে (শয়তান) বলল, তুমি আমাকে শাস্তিদান করলে, এজন্য আমিও তোমার সরল পথে মানুষের জন্য নিশ্চয় ওঁত পেতে থাকব। (সূরা আল আরাফ, আয়াত-১৬)
একটি বক কিভাবে মাছ ধরার জন্য বসে থাকে (ওঁত পেতে থাকে)? সে দেখে তাঁর শিকারের সময় ছায়া পড়বে কি না। ছায়া পড়লে তো মাছ টের পেয়ে যাবে। সে দেখে কখন তীব্র রোদ উঠবে এবং মাছ উপরে উঠে আসবে। সে চিন্তা করে যে কোনো মূল্যে এই খাবার এখন সংগ্রহ না করলে অভুক্ত থাকতে হবে, কষ্টে থাকতে হবে। সে চিন্তা করে কোন এ্যাঙ্গেলে গেলে মাছ তাকে দেখবে না। চিন্তা করে মাছ কোন দিকে মাথা দিয়ে রাখবে এবং সেখানেই থাবা দিবে, যেন মাছটি তার শক্তি ব্যবহার করতে না পারে।
এভাবে বহু চিন্তার পর বক মাছ শিকার করে। এটা কি শুধু বসে থাকলে হবে? না কখনোই না; বরং দীর্ঘক্ষণ বসে, চিন্তা করে, পরিকল্পনা করে-এরপরেই না তার কাজ সমাধা করতে হয়। তাহলে চিন্তা করুন কত দীর্ঘ সময় তাকে বসে থাকতে হয় একটি শিকার ধরার জন্য! (এটাই হলো ওঁত পাতা)
যারা অপরাধতত্ত্ব (Criminology) পড়েছেন তারা হয়তো জানেন একজন অপরাধীকে ধরতে বা কোনো অপারেশন চালাতে কত প্রস্তুতি নিতে হয়। কত মাস, কত দিন ধরে সময় নিয়ে অবস্থান ঠিক করে, লোকজন ঠিক করে, অপরাধীর অবস্থান ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করে, কোথায়, কিভাবে, কোন পদ্ধতিতে, কত সময় ধরে, কোন অস্ত্র দিয়ে তাকে ঘায়েল করবে-সবই পূর্ব পরিকল্পিত হয়। এটাই শিকার ধরার জন্য বসে থাকা (ওঁত পাতা)।
এটাই শয়তানের বসে থাকার উদাহরণ যা শয়তান নিজেই দুইবার কসম করেও আবার সৎ বান্দাদের কথা উল্লেখ করেছে যে সে সরল পথে বসে থাকবে, ওঁত পেতে থাকবে। কত শত সময় লাগে লাগুক, এক মাস লাগে লাগুক, পাঁচ মাস লাগে লাগুক, সারা দিন-রাত লাগে লাগুক। যতই কষ্ট হোক বসে থাকতে, তাও আমি (শয়তান) অব্যাহতভাবে বসেই থাকবো। তবুও আদম সন্তানদেরকে পথভ্রষ্ট করেই ছাড়বো। এটাই শয়তানের বসে থাকা বা কুয়ুদ বা ওঁত পাতা।
উপলব্ধি
খারাপ কাজ বা পরিবেশের ধারে-কাছেও যেতে নাই। অন্যায় যত ছোটই হোক তা থেকে দূরে থাকাই নিরাপদ। ‘একটু দেখি না কি আর হবে, আমার ওপর তো আমার নিয়ন্ত্রন আছে’-এটাই হচ্ছে শয়তানের প্রথম ধাপ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রকাশ্য কিন্তু অদৃশ্য শয়তানের অছওয়াছা থেকে হেফাজত করুক। (আমীন)
ফেসবুকে ফাঁদ
আপনার বিপরীত লিঙ্গের ছেলে বা মেয়েকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দিলেন। আর সে এক্সেপ্ট করলো। ভাবলেন এ আর তেমন ক্ষতি কি? শুধু বন্ধুই তো! তাও আবার অনলাইনে। পরিচিত তো আর না। এরপর লাইক, একটা কমেন্ট আর কিছু শেয়ার। একটা কমেন্টই তো। তেমন কিছু না। এরপর একটু প্রশংসা করার ইচ্ছে হলো। তাতে যদি ঐ ছেলে বা মেয়ের নজরে আসা যায়! বলুন তো প্রশংসা কে না চায়? প্রশংসা করতে লাগলেন। প্রতিত্তরে ওপাড় থেকে আপনাকেও ধন্যবাদ দিতে লাগলো।
এর কিছুদিন পর একে-অপরে মেনশন করে প্রশংসা বা কমেন্ট করতে লাগলেন। দিনে দিনে আরো ফ্রি হলেন। ধীরে ধীরে একটু অনলাইনে পরিচিত হলেন। অনলাইনে কমেন্টের মাধ্যমে আমার এত প্রশংসা করলো! অথচ একটু পরিচয়ই তো জানতে চেয়েছে! না দিলে কি মনে করবে আবার। লজ্জার বিষয় আছে না?
এরপর ধীরে ধীরে কিছু ব্যক্তিগত বিষয়ও শেয়ার হয় ফেসবুকে। কিছুটা ফান-মজা হতে লাগলো। আরে না, মজা কি ইসলামে হারাম নাকি? এরপর তাকে অনুভব করতে লাগলেন। চিন্তা করেন তাকে নিয়ে। ফেসবুকে বার বার তার প্রোফাইলে ঘুরে আসেন। কখন সে স্ট্যাটাস দিবে। আর তখন আমি লাইক দিয়ে প্রশংসা করব। সেও মেনশন করে ধন্যবাদ দিবে।
ভালো লাগার এক তীব্র অনুভূতি জেগে উঠতে লাগল। এভাবে হয়তো কোন একদিন তাকে ভালো ফ্রেন্ড (ইসলামী!) বলে উল্লেখ করে স্ট্যাটাসও দিতে পারেন। কৌশলে লিখলেন- এরা অনেক ভালো লেখে। চলতে থাকলো। এভাবে চলতেই থাকলো। এভাবেই শয়তান আপনার জ্ঞানহীন ইসলাম দিয়েই আপনাকে ধ্বংসের শেষপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে।
এখন এই ধীর প্রক্রিয়ার সাথে শয়তানের বসে থাকার (ওঁত পাতার) উদাহরণ মিলিয়ে দেখুন। কত দীর্ঘ সময় নিয়ে শয়তান কাজ করে। চিন্তা করুন কিভাবে, কত পন্থায়, কোন সময়, কোন সাইকোলজি ব্যবহার করে আজ ফেসবুক, অনলাইন বা অফলাইনে শয়তান সফল হচ্ছে। এভাবে ধীরে ধীরে আপনিও শয়তানের বসে থাকার শিকারে পরিণত হচ্ছেন।
এখন যেই ইসলামের কথা ভেবে একজন ছেলে অথবা মেয়েকে ফ্রেন্ড করেছিলেন “জাস্ট ফেন্ডই তো”, ঠিক সেই কথা এবং সেই যৌক্তিকতা দেখিয়েই শয়তান বসার জায়গা তৈরি করে নেয়। নিজের সীমানায় শিকারি বাঘ এনে দিলেন। এখন আর ইসলামী স্ট্যাটাসে মন নেই। মন এখন শুধু প্রশংসা, মেনশন, ফান, দুঃখ-সুখের কাহিনীতে।
সালাতে এখন আর আল্লাহকে মনে হয় না। মনের কোনে সালাতেও আল্লাহর পরিবর্তে ফেসবুকে বা ক্লাসের সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিটির কথা মনে হতে থাকে। দু’জনের নিয়ত কলুষিত হয়। রিয়ার (লোক দেখানো) প্রকাশ ঘটতে থাকে। ইসলামী স্ট্যাটাসের আড়ালে বিপরীত লিঙ্গের লোকের সমাগম বাড়তে থাকে। তাদের ইসলামী স্ট্যাটাসও বাড়তে থাকে।
অনেক সময় ট্যাগ করেই বাড়তে থাকে এ গতি। অনলাইনে ইসলামী স্কলারদের শত শত দলীল ভিত্তিক সাইট থাকতেও আপনার কাছে ইসলাম সম্পর্কে জানতে মেসেজ করে। আর তখন আপনিও ভাবেন বাহ! ছেলে/মেয়েটা তো ইসলাম নিয়ে দারুন পড়াশুনা করে! ইসলাম নিয়ে তো দারুন অনুসন্ধিৎসু! চলতে থাকলো এভাবে। ইসলাম নিয়ে ইনবক্সে জ্ঞানগর্ভ টেক্সটিং।
এভাবেই শয়তান তার বসে থাকাকেও পরিকল্পনার আলোকে সফল করতে থাকে। ফলে ইসলামী জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার ভিখারীরা আজ ধ্বংসের পথে। তারা আল্লাহর সাথে সম্পর্কের পরিবর্তে শয়তানের পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মুখোমুখী। তারা এ পথেই চলছে। এখানেই ইসলামী জ্ঞানের চরম ঘাটতি। এখানেও ইসলামী জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা না থাকার কারণেই আল্লাহর সাথে সম্পর্কের ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং এটা তখনই হয় যখন ইসলাম নিয়ে সঠিক পড়াশুনা থাকে না।
শয়তান আমাদের কিভাবে পথভ্রষ্ট করবে তা নিয়ে তার পড়ালেখা পিএইচডি লেভেলের। আর আমরা শয়তানের ধোঁকা থেকে কিভাবে বাঁচবো তা নিয়ে আমাদের পড়াশুনা প্রাইমারি লেভেলের। তো কিভাবে আমরা আশা করতে পারি যে আমরা শয়তানের সাথে পেরে উঠব? ইসলামী একটা স্ট্যাটাস বা নোট বড় হলেই আমরা এড়িয়ে যাই। আর্টিকেল বড় হলে আর ঢু মারি না। ইসলামী বইয়ের কথা আর নাই বা বলি।
আমাদের ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করাটা চরম ঘাটতির মধ্যেই রয়েছে। আমি যখন দেখি একজন ইসলামী ভাই বা বোন পথভ্রষ্ট হচ্ছে-তখন আর অবাক হই না। আমাদের অনার্স পর্যন্ত হয়তো ১৫০ টা বড় বড় বই পড়ি। অথচ পরকালের জীবনের জন্য, অনন্তকালের সুখের জন্য বই পড়তে অনীহা লাগে। তো শয়তানের পথভ্রষ্টতার পিএইডি লেভেলের জ্ঞানের সাথে ইসলাম নিয়ে আপনার সর্বনিম্ন পড়াশুনা দিয়ে কিভাবে ইসলামে টিকে থাকতে চান?
জ্ঞানের ঘাটতি
ঝড়ের সাথে বালির ঘর দিয়ে কিভাবে টিকে থাকতে চান? বড় নোট দেখলেই পলায়ন করেন। তো কিভাবে শয়তানের মোকাবেলা করবেন? চার ঘণ্টার লেকচার দেখতে বললে-বড় করে “হা” করে বলেন, কয় ঘণ্টার লেকচার? আমার অত ধৈর্য নেই! আপনার ধৈর্য না থাকলেও শয়তানের ঠিকই ধৈর্য আছে। আপনাকে পথভ্রষ্ট করে জাহান্নামের গভীরে প্রবেশ করিয়েই ছাড়বে। ধৈর্যর ফল আপনি নিতে না চাইলেও শয়তান ঠিকই আপনাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে এর ফল নিবে।
আপনি হিজাবের আধুনিক Dimension (মাত্রা) জানেন না (ফেসবুক ও ক্লাসে)। রিয়া (লোক দেখানো ইবাদাত) কিভাবে হয় জানেন না। ইসলামী স্কলারদের হাজার হাজার রিসোর্স থাকতেও আপনি বিপরীতধর্মী একজন ছেলে/মেয়ের কাছে ইসলামের সাজেশন চান এবং আপনি সুরক্ষার (Protection) পদ্ধতি না নিয়ে; বরং মেসেজ চালিয়ে যান।
কিভাবে ও কতভাবে শয়তান পথভ্রষ্ট করে তা জানেন না, তা নিয়ে স্কলারদের লেখা বই পড়েন না; অথচ শয়তান থেকে বেঁচে থাকার ইচ্ছা করেন। যেন পা ভেঙ্গে গেলেও ডাক্তারের কাছে না গিয়েও সুস্থ হওয়ার প্রবল ইচ্ছা পোষণ করেন!
শয়তান ভালো করেই জানে আপনাকে একবারে ট্রাপে ফেলতে পারবে না। তাই সে ধীরে ধীরে ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথেই আপনাকে এমনভাবে পথভ্রষ্টের দিকে নিয়ে যাবে যে, তখন আপনি শয়তানকেই সাপোর্ট দিতে থাকবেন। আপনি তখন বাহানা দিতে থাকবেন- আরে মেয়েটা তো ইসলামী চেতনার (Islamic Minded), অনেক ভালো লেখে। শয়তান আপনার ক্ষেত্রে এই টোপই কাজে লাগাবে।
আপনার বুদ্ধিহীন ইসলামী জ্ঞান দিয়েই আপনার ইসলামকে ধ্বংস করে দিবে। কারণ আপনার ইসলাম নিয়ে জ্ঞান অনেক কম; কিন্তু শয়তানের রয়েছে অনেক বেশি। তাই শয়তান জানে কোন পদ্ধতিতে গেলে আপনাকে পথভ্রষ্ট করা যাবে।
শয়তান আপনার ইসলামী জ্ঞানের নগন্যতা খোঁজে। আপনার জ্ঞানহীন ইসলামের সুযোগ সে নেয় এবং এই জ্ঞানহীন দিক দিয়েই আপনাকে এমনভাবে আক্রমন করে যে, আপনি ধরতেও পারেন না- এটা অনৈসলামিক, শয়তান আপনাকে পথভ্রষ্ট করছে। কারণ আপনার ইসলাম নিয়ে জ্ঞান কম। এটা সে ধীরে ধীরে করেছে (কুয়ুদ/ফাঁদ) যে, আপনি টেরই পান নি (এটাও ইসলাম নিয়ে আপনার জ্ঞানের ঘাটতির কারণে)।
আমাদের ইসলামী জ্ঞানের ঘাটতির পাশাপাশি আমলেরও ঘাটতি রয়েছে। অনেকের আবার ইসলামী জ্ঞান প্রচুর; কিন্তু আমল নেই। অনেকের আবার ঠিক উল্টো। ইসলামী জ্ঞান কম; কিন্তু আমল ভালো। অনেকের আধ্যাত্মিক জ্ঞান বেশি; কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান কম। এসব লোকেরাই শয়তানের বসে থাকার (ফাঁদের) রাস্তায় চলছে।
আমাদের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের সমন্বয় করতে হবে। জ্ঞান ও আমল সমানভাবে চালাতে হবে। তবেই শয়তানকে পরাজিত করতে পারবো। তার পথভ্রষ্ট করার পরিকল্পনা ধরতে পারবো। জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে তাকে ছাড়িয়ে আল্লাহর অধিক নিকটে যেতে পারবো। শয়তানের ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকতে পারবো। আমাদের আদি নিবাস সেই জান্নাতই হবে আমাদের বাসস্থান। (আমীন)
(সূত্র: লেকচার সমগ্র: ওস্তাদ নুমান আলীখান; ইসলাম হাউজ পাবলিকেশন্স, এপ্রিল ২০১৬; পৃষ্ঠা-২০-২৪)





