নাটোর সদরের শিবদুর গ্রামের সাধারণ কৃষক হজ্বযাত্রী আতাহার আলী (৬০)। অনেক দিনের লালিত স্বপ্ন স্ত্রী জাহানারা বেগমকে (৫০) নিয়ে হজে যাবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে অনেক কষ্টে অর্জিত ৫ লাখ টাকা তুলে দেন ঢাকার আজাদ ইয়ার কানেকশান হজ এজেন্সির মালিক মাজেদুল ইসলামের হাতে।
নাটোর সিভিল সার্জন অফিসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে টিকা দেয়াসহ আনুসঙ্গিক সকল কাজ শেষ করেন। পাসপোর্ট জমা দিয়ে অপেক্ষার দিন গুণতে থাকেন বিমানে ওঠার দিনক্ষণের জন্য। সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর বাড়িতে সকল আত্মীয় স্বজনকে দাওয়াত করে এনে সবার নিকট থেকে দোয়া চান। শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে গ্রামের মসজিদে মুসল্লিদের নিকটও জানা-অজানা ভুল ত্রু টির জন্য ক্ষমা চেয়ে বিদায় নেন।
তবে জানতে পারেন হজের নিবন্ধন তালিকায় অনলাইনে তাদের নাম দেখা যাচ্ছে না। আস্তে আস্তে জানতে পারেন তাদের মতোই প্রতারিত হয়েছেন নাটোরের ১৫ হজযাত্রী। প্রতারক এই এজেন্সি অফিস থেকে টাকা পরিশোধের প্রমাণপত্র পাওয়া গেলেও পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। নাটোরের ১৫ জনের মতো ঢাকার স্থানীয় প্রতিনিধি মুফতি খলিলুর রহমানের দেয়া ১৭ জনের সাথেও প্রতারণা করেছে এই এজেন্সি।
প্রতারিত হজযাত্রী ও স্থানীয় প্রতিনিধি নাটোর সুগার মিল মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. সলিম উল্লাহ জানান, তিনি গত ২২ বছর থেকে এলাকার মানুষকে হজে পাঠানোর কাজ করছেন। গত ছয় বছর আগে রাজশাহীর শাহমখদুম থানার নওদাপাড়া আমচত্বর এলাকার সাবেক মাদরাসা শিক্ষক মাওলানা মাজেদুল ইসলামের সাথে তার পরিচয় হয়। সেই থেকে মাজেদুল ইসলামের ঢাকার ৬৫ নয়া পল্টনের আজাদ ইয়ার কানেকশান হজ এজেন্সির মাধ্যমে তিনি এলাকার মানুষকে হজে পাঠান।
এবার তিনি নিজের স্ত্রীসহ ১৭ জনের জন্য ওই এজেন্সির ইসলামী ব্যাংক নিউমার্কেট শাখার চলতি হিসাব নম্বর ৯৫০ এ ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দেন এবং তার অফিসে গিয়ে নগদ ১৪ লাখ টাকা জমা দেন। ধর্ম মন্ত্রণালয় হজযাত্রী প্রতি ২৮ হাজার ৭৪ টাকা জমা দিয়ে ১ মার্চের মধ্যে নাম নিবন্ধন করার সময় নির্ধারণ করলে তিনি ৫ ফেব্রয়ারি ব্যাংকের মাধ্যমে ১৭ হজযাত্রীর নিবন্ধন বাবদ সাত লাখ টাকা জমা দেন। তারপরও ১৭ জনের মধ্যে ১৫ জনের নিবন্ধন করেনি এজেন্সি কর্তৃপক্ষ।
শেষ মুহুর্তে বিষয়টি জানতে পেরে তিনি ঢাকা এজেন্সি অফিসে গিয়ে অবস্থান করতে থাকলে ১২ সেপ্টেম্বর রাতে এজেন্সির মালিক মাজেদুল ইসলাম তাকে জানান, তার দেয়া ১৭ হজযাত্রীর ১৬ সেপ্টেম্বর হজে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরের দিন সকালে মাজেদুল ইসলামের কোন খবর না পেয়ে তার বাড়িতে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন মাজেদুল ইসলাম আগের রাতেই দুজন হজযাত্রীসহ সৌদি আরবে চলে গেছেন। এতে একদিকে যেমন ১৫ জন হজযাত্রীর এবার আর হজে যাওয়া সম্ভব হলো না তেমনি এজেন্সির প্রতারণায় তিনি ক্ষতিগ্রস্থ সাধারণ মানুষের চাপে রয়েছেন।
প্রতারিতরা হলেন, নাটোর সুগার মিল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে ফজলুল হক ও তার স্ত্রী মোছা. নূর জাহার পারভীন, নাটোর সুগার মিল মসজিদের ইমাম মাওলানা মো. সলিম উল্লাহ ও তার স্ত্রী মোছা. আয়েশা বেগম, নাটোর সদরের তেবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম সারোয়ার তার স্ত্রী স্থানীয় একটি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌস ও তাদের ছেলে ফাহিম ফয়সাল অভি, শহরের কান্দিভিটুয়ার মো. রহমত আলী কবিরাজ ও তার স্ত্রী মোছা. হাজেরা খাতুন ও তাদের আত্মীয় মোছা. রাজিয়া বেগম,
নিচাবাজারের ব্যবসায়ী মো. মোশারফ হোসেন, নাটোর সদরের শিবদুরগ্রামের আতাহার আলী ও তার স্ত্রী মোছা. জাহানারা বেগম এবং নলডাঙ্গা উপজেলার ধোপাপুকুর গ্রামের মো. নাছির উদ্দিন ও তার স্ত্রী মোছা. সিরাতুন নাহার। প্রতারিতরা দ্রুত এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। প্রতারিত রহমত আলী কবিরাজ ও তার স্ত্রী মোছা. হাজেরা খাতুন বলছেন, যেকোন মূল্যে এবারই তারা হজে যেতে চান এবং এমন প্রতারকের লাইসেন্স বাতিলসহ উপযুক্ত বিচার চান।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সরকার ও আটাব অনুমোদিত আজাদ ইয়ার কানেকশান হজ এজেন্সির (লাইসেন্স নম্বর-১৩১৭) মালিক মাওলানা মাজেদুল ইসলামের সৌদি আরবের দুটি মোবাইল নম্বর এবং এজেন্সির পরিচালক আবুল কাশেমের মোবাইলসহ তাদের সাতটি নম্বরে দফায় দফায় চেষ্টা করা হলেও নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। তাদের অফিসের টেলিফোন নম্বরে ফোন করা হলে নাম পরিচয় প্রকাশ না করে একজন অফিস স্টাফ মাজেদুল ইসলামের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এএস/ এআর





