স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহেই সারাদেশে ৫২ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছর এক মাসে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ১,৫৬১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই নিয়ে ২০২৬ সালে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৯ জনে, এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যা পেরিয়ে গেছে ৫১ হাজার ৮৩৭ জন।

এদিকে, রাজধানী ঢাকার বাইরে জেলা ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর উপচে পড়া ভিড় সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু উপসর্গ ও জটিলতা নিয়ে আরও দুইজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে কেবল ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই চলতি মৌসুমে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।

ময়মনসিংহে দুইজনের প্রাণহানি ও হাসপাতালে তীব্র ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, মারা যাওয়া দুইজনের মধ্যে একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) এবং অন্যজন হাসপাতালের ডেঙ্গু আইসোলেশন ওয়ার্ডে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃতদের মধ্যে রাশিদা খাতুন (৪২) নামের এক নারী ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার নুর হোসেনের স্ত্রী।

তিনি গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, এবং গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় মারা যান। অন্য মৃত ব্যক্তি হলেন, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার জৈনা বাজার এলাকার মৃত আব্দুল হোসেনের ছেলে জাফর আলি (৭০)। ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর, তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং ১৪ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমের পাশাপাশি তার তীব্র শ্বাসকষ্ট, সেপটিক শক ও রক্ত জমাট বাঁধার জটিলতা (ডিআইসি) দেখা দিয়েছিল। ময়মনসিংহ মেডিকেলে বর্তমানে ১৩১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যার মধ্যে ৮৩ জন পুরুষ, ৪২ জন নারী এবং ৬ জন শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালটিতে নতুন করে ৫৫ জন ভর্তি হয়েছেন এবং ৫৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। চলতি বছর হাসপাতালটিতে মোট ২,১৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী সেবা নিয়েছেন।

ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন অধ্যাপক ডা. এমদাদুল্লাহ খান জানান, সময়মতো হাসপাতালে না আসা এবং শক সিনড্রোম নিয়ে দেরিতে ভর্তি হওয়াই মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সারাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি হলেও বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, ময়মনসিংহ ও গাজীপুর জেলায় দ্রুত বাড়ছে রোগীর সংখ্যা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মোট আক্রান্ত : চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে মোট আক্রান্ত ৫১,৮৩৭ জন।

মোট মৃত্যু : চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু ১৪৯ জন। মাসভিত্তিক মৃত্যুর গতিধারা : জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ২ জন করে, মে মাসে ১ জন, জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং কেবল সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে রেকর্ড ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরে ডেঙ্গু ভাইরাসের 'ডিইএনভি-৩' (DENV-3) ধরনটি বেশি সক্রিয় এবং ঢাকার বাইরে 'ডিইএনভি-২' (DENV-2) ধরনটি শনাক্ত হচ্ছে। ইতঃপূর্বে একবার আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য ধরনের ডেঙ্গুতে পুনরায় আক্রান্ত হলে তাদের ক্ষেত্রে প্লাজমা লিকেজ, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ও অর্গান ফেলিউরের মতো মারাত্মক জীবনঘাতী জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

আইইডিসিআরের সতর্কবার্তা ও জাতীয় পদক্ষেপ রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) এক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মহামারি-সংক্রান্তি মডেলিং অনুযায়ী আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ ডেঙ্গু সংক্রমণের গ্রাফ আরও ঊর্ধ্বমুখী থাকতে পারে।

বিশেষ করে ময়মনসিংহ, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ ১৫টি জেলায় আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে তিন মাসব্যাপী 'বিশেষ ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান' শুরু করেছে সরকার।

সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত মশক নিধন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, জ্বর দেখা দেওয়ার প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এনএস-১ (NS1) পরীক্ষা করানো এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ঘরে ঘরে জমানো পানি পরিষ্কার রাখা এবং মশার কামড় থেকে বাঁচার ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে, এই মহামারি থামানো কঠিন হবে।

এমএম