গত জানুয়ারি মাস থেকে নতুন দিল্লির একটি হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসাধীন ছিলেন শাপুর। গত বছর অক্টোবর মাসে প্রথম অসুস্থ বোধ করার পর তাঁর ভাই ঘামাই জাদরান এবং সাবেক জাতীয় অধিনায়ক আসগর আফগান তাঁকে চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যান। ৩৯তম জন্মদিনের ঠিক এক দিন আগে তিনি চিরবিদায় নেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, শাপুর জাদরান এইচএলএইচ নামক একটি বিরল এবং জীবনঘাতী ইমিউন রেগুলেশন ব্যাধিতে ভুগছিলেন। এই রোগে শরীরের অতিরিক্ত সক্রিয় শ্বেত রক্তকণিকা নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গকেই আক্রমণ করা শুরু করে।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর শরীরে একটি মারাত্মক ও আগ্রাসী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, যা তাঁর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। তাঁর ভাই ঘামাই জাদরান পূর্বে ক্রিকেটইনফোকে জানিয়েছিলেন যে, শাপুরের পুরো শরীরে যক্ষ্মা সহ তীব্র ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়েছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর মস্তিষ্কেও আঘাত হানে। মাঝে কিছুটা সুস্থ হয়ে তিন সপ্তাহের জন্য হোটেল রুমে ফিরলেও, সংক্রমণটি আবারও ভয়াবহ আকারে ফিরে আসলে তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় এবং সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
শাপুরের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড তাদের অফিশিয়াল বিবৃতিতে বলেছে, "গভীর শোক ও বেদনার সাথে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড সাবেক ফাস্ট বোলার শাপুর জাদরানের প্রয়াণে শোক প্রকাশ করছে। শাপুর জাদরান ছিলেন আফগানিস্তান ক্রিকেটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী ব্যক্তিত্বদের একজন, যাঁর নিষ্ঠা, আবেগ এবং অবিচল প্রতিশ্রুতি আমাদের দেশের ক্রিকেটের উত্থান ও উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি ছিলেন সেই গর্বিত ক্রিকেটারদের অন্যতম, যাঁরা আফগান ক্রিকেটের প্রাথমিক যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চের পথ তৈরি করেছিলেন।"
ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে শাপুর জাদরান মানেই এক লম্বা চওড়া গড়ন, উইকেটের দিকে বাঘের মতো ক্ষিপ্র দৌড় আর বাতাসে ওড়া লম্বা কালো চুলের এক গতিময় প্রতিচ্ছবি। তিনি ছিলেন আফগান ক্রিকেটের আদিম ও খাঁটি আবেগের প্রতীক।
তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি এসেছিল ২০১৫ সালের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে। নিউজিল্যান্ডের ডানেডিনে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে এক চরম স্নায়ুচাপের ম্যাচে ব্যাটার হিসেবে মাঠে নেমে শেষ ওভারে জয়সূচক রানটি নিয়েছিলেন শাপুর। স্কোয়ার লেগের পেছনে বল ঠেলে দিয়েই দুই হাত পাখির ডানার মতো প্রসারিত করে সারা মাঠে তাঁর সেই চেনা বুনো দৌড় এবং আনন্দাশ্রুর দৃশ্যটি আজীবন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম রোমান্টিক মুহূর্ত হিসেবে অমর হয়ে থাকবে, যা ছিল বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের প্রথম ঐতিহাসিক জয়।
মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরেও শাপুর ছিলেন তরুণ আফগান প্রজন্মের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে কীভাবে বড় স্বপ্ন দেখতে হয়, তা তিনি শিখিয়েছিলেন। আফগান ক্রিকেটের এই নির্ভীক অগ্রদূতের অবদান ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল অক্ষুণ্ন থাকবে।
এমএম