২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এবং ২১ বছর পর যেকোনো প্রতিযোগিতায় দেখা হচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর। বাংলাদেশ সময় বুধবার দিবাগত রাত ১টায় আটলান্টায় দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে দু’দল। জয়ী দল ফাইনালে খেলবে স্পেনের বিপক্ষে।

ফুটবল দুনিয়ায় অনেক দ্বৈরথ থাকলেও ৬৪ বছরের ইতিহাস, তিক্ততা, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের কারণে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা লড়াই অন্য সব প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে আলাদা। একটু বেশিই রোমাঞ্চ ছড়ায়।

ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত, দিয়েগো ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অব গড', 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি', ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড কিংবা বিতর্কিত পেনাল্টি- প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দ্বৈরথ শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ আর গৌরবের প্রতীক হয়ে আছে।

এবার সেই ইতিহাসে যোগ হতে যাচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়। দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামতে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি। ম্যারাডোনার স্মৃতিতে মোড়া এই দ্বৈরথে নিজের ছাপ রাখার সুযোগ পাচ্ছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়কও।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের এই ম্যাচকে সামনে রেখে ফিরে দেখা যাক আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাসমূহ।

১৯৬৬ : যে ঘটনার পর ফুটবলে এলো হলুদ-লাল কার্ড:

এই বৈরিতার সবচেয়ে আলোচিত শুরুর অধ্যায় ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। ওয়েম্বলিতে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলাইনের সিদ্ধান্তে মাঠ ছাড়তে বলা হয় আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে।

স্প্যানিশ ভাষাভাষী রাত্তিন বুঝতেই পারেননি কেন তাকে বের করে দেয়া হচ্ছে। ব্যাখ্যা জানতে চাইলেও পাননি। মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে প্রায় ১০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ মাঠে নেমে তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে যায়।

তখন ফুটবলে হলুদ বা লাল কার্ডের প্রচলন ছিল না। এই ঘটনাই পরবর্তীতে কার্ড ব্যবস্থা চালুর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

১৯৭৭ : এক ঘুষিতে ভেঙে গিয়েছিল দুই দাঁত:

লা বোম্বোনেরায় অনুষ্ঠিত এক প্রীতিম্যাচেও উত্তেজনা ছড়ায় দু’দলের লড়াই। ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরির কঠিন ট্যাকলের জবাবে আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল বার্তোনি সরাসরি মুখে ঘুষি মারেন।

ঘটনাটিতে চেরির সামনের দু’টি দাঁত ভেঙে যায়। পরে দুজনই লাল কার্ড দেখেন। আন্তর্জাতিক প্রীতিম্যাচে প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে লাল কার্ড দেখার রেকর্ডও গড়েন চেরি।

ফকল্যান্ড যুদ্ধ এখন খেলার মাঠে:

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বৈরিতার শিকড় ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধ। দক্ষিণ আটলান্টিকের দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্য।

যুদ্ধে প্রাণ হারান প্রায় ৯০০ সেনা সদস্য। যুদ্ধ শেষ হলেও ক্ষত শুকায়নি, দ্বীপটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে দু’দেশের অবস্থান বিপরীত। সেই রাজনৈতিক বৈরিতা সময়ের সাথে সবচেয়ে বেশি জায়গা করে নিয়েছে ফুটবল মাঠে।

এরপর থেকে দু’দলের প্রতিটি ম্যাচই বাড়তি আবেগ ও মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই শুধু ৯০ মিনিটের লড়াই নয়; এটি ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ ও গৌরবের এক অনন্য লড়াই।

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের সবচেয়ে কিংবদন্তিতুল্য অধ্যায় নিঃসন্দেহে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর মাঠে নামে দু’দেশ। রাজনৈতিক উত্তেজনার রেশ তখনও তাজা।

সেই ম্যাচেই জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল, দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’। যা নিয়ে এখনো আলোচনা-সমালোচনা চলমান, চলতে থাকবে হয়তো ফুটবলের শেষ পর্যন্ত।

তবে সেই গোলটির মাত্র চার মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে একাই পাঁচজন ইংলিশ খেলোয়াড়কে কাটিয়ে গোল করেন ম্যারাডোনা। সেটিই পরে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে অমর হয়ে যায়।

২-১ ব্যবধানে ম্যাচ জিতে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় আবারো মুখোমুখি হয় দু’দল। নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় শেষে স্কোর ছিল ২-২। তবে ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড।

দিয়েগো সিমিওনের প্ররোচনায় পা তুলে লাথি মারায় লাল কার্ড দেখেন ইংলিশ মিডফিল্ডার। তবে ১০ জন নিয়েও ইংল্যান্ড ম্যাচ টাইব্রেকারে নেয়, কিন্তু সেখানে ৪-৩ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় আর্জেন্টিনা।

সেই বিদায় আজও ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম বড় আক্ষেপ। যদিও পরে ২০০২ বিশ্বকাপে সেই ঘটনার দারুণ প্রতিশোধ নেন ব্যাকহাম।

দু’দলের সর্বশেষ প্রতিযোগিতামূলক লড়াই হয়েছিল ২০০২ বিশ্বকাপে। প্রথমার্ধের শেষ দিকে মাইকেল ওভেনকে ফাউল করার দায়ে আর্জেন্টিনার মরিসিও পচেত্তিনোর বিরুদ্ধে পেনাল্টি দেন কিংবদন্তি রেফারি পিয়েরলুইজি কোলিনা।

সেই স্পট-কিক থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে জয় এনে দেন ডেভিড বেকহ্যাম। পরে অবশ্য পচেত্তিনো দাবি করেছিলেন, ওভেন ডাইভ দিয়েছিলেন এবং তিনি তাকে স্পর্শই করেননি। সেই বিতর্ক আজও পুরোপুরি থামেনি।

এই সেমিফাইনাল শুধু দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর আরেকটি লড়াই নয়, লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেও এক অনন্য মুহূর্ত। প্রায় দু’দশকের আন্তর্জাতিক ফুটবল জীবনে এবারই প্রথম ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামতে যাচ্ছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।

২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের সময় জাতীয় দলে অভিষেকই হয়নি মেসির। আর ২০০৫ সালে দু’দলের সর্বশেষ প্রীতিম্যাচেও ছিলেন না তিনি। ফলে কখনো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়নি তার।

তাই আটলান্টার সেমিফাইনাল মেসির জন্যও হতে যাচ্ছে বিশেষ এক উপলক্ষ। দুই দলের ঐতিহাসিক দ্বৈরথে এবার নিজের নাম লেখার সুযোগ পাচ্ছেন মেসি। তার নেতৃত্বেই টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছে আলবিসেলেস্তেরা।

উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে শেষবার একটি প্রীতি ম্যাচে দেখা হয়েছিল দুই দলের। এরপর কেটে গেছে ২১ বছর। আর বিশ্বকাপে শেষ দেখা হয়েছিল ২০০২ সালে—সেখান থেকে পেরিয়ে গেছে ২৪ বছর।

তাই এবার শুধু একটি সেমিফাইনাল নয়, ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন ফুটবল বৈরিতার আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ফুটবলবিশ্ব। এই লড়াইয়ে বিশ্বকাপের স্মরণীয় লড়াই হওয়ার সব উপকরণই বহন করছে।

এস