মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শাকিরার কণ্ঠে নতুন বিশ্বকাপ অ্যান্থেম ‘দাই দাই’ এবং ‘লেটস গো’ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ।
বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর ছিল আজতেকা স্টেডিয়ামের দিকে। সঙ্গীত, নৃত্য, আলোকসজ্জা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় সাজানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিশ্বকাপের আবহকে আরও উৎসবমুখর করে তোলে। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন শাকিরা এবং নাইজেরিয়ান সংগীতশিল্পী বার্না বয়। বিশাল বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপ ঘিরে তাদের পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
কলম্বিয়ার জাতীয় দলের জার্সির রঙের অনুপ্রেরণায় তৈরি পোশাকে মঞ্চে ওঠেন শাকিরা। তার উপস্থিতি অনেকের মনে ফিরিয়ে আনে ২০১০ বিশ্বকাপের স্মৃতি, যখন ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গানটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এবার নতুন গানের মাধ্যমে আবারও বিশ্বকাপের উন্মাদনায় নিজের ছাপ রাখলেন তিনি।
স্টেডিয়ামজুড়ে রঙিন আলো, আতশবাজি এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে এক অনন্য মাত্রা দেয়। শাকিরার প্রাণবন্ত পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
তারকাদের উপস্থিতিতে জমজমাট আয়োজন
শুধু শাকিরা ও বার্না বয়ই নন, অনুষ্ঠানে অংশ নেন লাতিন সঙ্গীত জগতের আরও কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পী। তাদের মধ্যে ছিলেন জে বালভিন ও রায়ান কাস্ত্রো। পাশাপাশি মেক্সিকোর কিংবদন্তি পপ-রক ব্যান্ড ‘মানা’ তাদের জনপ্রিয় গান পরিবেশন করে দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করে।
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে মেক্সিকোর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নানা দিক তুলে ধরা হয়। মাঠের কেন্দ্র থেকে উঠে আসে বিশাল বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিরূপ, আর শত শত নৃত্যশিল্পী ঐতিহ্যবাহী পোশাকে রঙিন পরিবেশনা উপস্থাপন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ অংশ ছিল অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পতাকা প্রদর্শন, যা বিশ্বকাপের বৈশ্বিক চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
তিন দেশে তিন আয়োজন
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ- মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা- যৌথভাবে আয়োজন করছে এই টুর্নামেন্ট। সেই কারণে মেক্সিকোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও আলাদা সাংস্কৃতিক আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুরো উদ্বোধনী আয়োজনের সৃজনশীল দায়িত্বে ছিলেন ইতালির খ্যাতিমান ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর মার্কো বালিচ। এর আগে তিনি কাতার বিশ্বকাপ এবং শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন।
তার পরিকল্পনায় প্রতিটি আয়োজক দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি আলাদাভাবে তুলে ধরা হলেও মূল বার্তা ছিল এক—ফুটবল বিশ্বজুড়ে মানুষকে একত্রিত করার শক্তি রাখে।
মেক্সিকোর অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘পাপেল পিকাদো’ শিল্পকর্ম। কানাডার আয়োজন বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটাবে, আর যুক্তরাষ্ট্রের অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পাবে আধুনিক নকশা ও বিশ্বকাপ ট্রফির ধাতব প্রতিরূপ।
ঐক্যের বার্তা
মার্কো বালিচের মতে, বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বজুড়ে মানুষের মিলনমেলা। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের সময়েও ফুটবল মানুষকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসে এবং আনন্দের বন্ধনে যুক্ত করে।
তার ভাষায়, তিনটি দেশের যৌথ আয়োজন বিশ্ববাসীর কাছে সহযোগিতা ও সম্প্রীতির ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
দর্শকদের উৎসব
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর অনেক আগ থেকেই আজতেকা স্টেডিয়ামে সমর্থকদের ঢল নামে। মেক্সিকোর সমর্থকদের কণ্ঠে ভেসে আসে ‘ভিভা মেক্সিকো’ এবং ‘ওলে, ওলে, ওলে’ ধ্বনি। রঙিন পোশাক, জাতীয় পতাকা এবং উৎসবমুখর পরিবেশ পুরো স্টেডিয়ামকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
দক্ষিণ আফ্রিকার সমর্থকরাও সমান উৎসাহে অংশ নেন। দুই দেশের ভক্তদের একসঙ্গে গান, নাচ এবং উদযাপন ফুটবলের বৈশ্বিক বন্ধনের এক সুন্দর উদাহরণ হয়ে ওঠে।
এরপর মাঠে লড়াই
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সবার নজর চলে যায় মাঠের খেলায়। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হয় দক্ষিণ আফ্রিকা।
৪৮ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংস্করণ। প্রায় ৪০ দিনের এই প্রতিযোগিতায় মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হবে ফাইনাল।
সঙ্গীত, সংস্কৃতি, উৎসব এবং ফুটবলের অনন্য সমন্বয়ে বিশ্বকাপ ২০২৬ যাত্রা শুরু করল এক বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে। আর সেই উদ্বোধনী মুহূর্তের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম ছিলেন শাকিরা, যার সুরে শুরু হলো ফুটবলের আরেকটি বিশ্বমঞ্চের গল্প।
এনএইচ