যে সরকারই আসুক কেউই আমাদের দিকে তাকায় না, আমাদের খোঁজ রাখে না। আর দেশের সরকার কিংবা জনগণ আমাদের মানুষ বলেই মনে করে না। এই দেশে আমরাই এখন বলির পাঠা।

টাইমনিউজ বিডির সাথে একান্ত আলাপকালে এ কথা বলেন বাংলাদেশ ট্রাক-কভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর ঢাকায় এসে গাড়ির ব্যাবসার সাথে জড়িত হই। তখন থেকেই দেখছি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীরা থেকে শুরু করে জিয়াউর রহমান নিজে, হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ নিজে, বিএনপি-আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা সবাই তেজগাঁওয়ের এই ট্রাক স্ট্যান্ডে এসেছেন। কিন্তু তাদের কারো আস্বাসেরই কোনো বাস্তবায়ন আজও হয়নি বলেও জানান তোফাজ্জল হোসেন।

তিনি আরোজানান, মালিক-শ্রমিকরাবলির পাঠা। সরকার বলছে গাড়ি নিয়ে বের হতে তাদের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে। আবার বিরোধী দল গাড়ি পোঁড়াচ্ছে। তাহলে আমরা কোন দিকে যাবো।

তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার জানান, যেহেতু এই দু'নেত্রী ছাড়া আর কোন বিকল্প কেউনেই,তাই আমরা চাই তারা মিলে মিশে সাধারণ মানুষদের জন্য দেশটা পরিচালনা করুক আমরা এটাই চাই।

তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডে দেখা গেছে, বিএনপির দেয়া টানা অবরোধেরাস্তায় পরিবহনবের না করতে পারায়গাড়ির জট বেঁধে গেছে। অতীতে কোন সময় এমন জট চোখে পড়েনি। অলস সময় কাটাচ্ছেনপরিবহন শ্রমিকরা। কেউজটলা বেঁধে আড্ডা দিচ্ছেন, কেরাম খেলছেন,আবার কেউ নিজেরগাড়ি মেরামত করছেন।

মালিক সমিতির তথ্য মতে,দেশে পণ্য পরিবহন করে এমন যানবাহনেরসংখ্যা ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৭০০ শত ২৭টি। চলমান সহিংসতায় এ পর্যন্ত অগ্নিসংযোগ হয়েছে ৩০০টির অধিক গাড়িতে। এতেনিহত হয়েছেনপরিবহনের ৩ শ্রমিক এবং অসংখ্য পরিবহন শ্রমিকআহত হয়েছেন।

এদিকে, এফবিসিসিআই'র তথ্যে এ বছর অবরোধে ৬২০ টি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়েছে। মারা গেছেন প্রায় ৪০ জন। এছাড়া গাড়ির সাথে জড়িত মোট ১ কোটি ২০ লাখ লোক বেকার হয়েছেন।

এদিকে স্ট্যান্ডে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় রাস্তার উপর গাড়ি পার্কিং করতে হয় মালিকদের। এ কারণে সাতরাস্তা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত চলাচলে যাত্রীরা পড়ছেন নানা ভোগান্তিতে।

এ বিষয়ে তোফাজ্জল হোসেন জানান, ৪১৯ নম্বর খতিয়ানের তেজগাঁওয়ের ট্রাক স্ট্যান্ড সরকারি রেজিস্ট্রারি করা নয়। আমরা অনেক দিন থেকে এটি ব্যবহার করে আসছি। এটি যদি সরকার টার্মিনাল করে দেন তাহলে এই সমস্যা থাকবে না।

তিনি আরো বলেন, সরকারি খরচ লাগবে না সরকার অনুমতি দিলেই হবে। আমরা নিজেদের টাকা দিয়েই টার্মিনাল তৈরী করে নেবো। তাহলে এ সমস্যা থাকবে না। এছাড়া আমাদের কিছু করার নাই।

অবরোধে নাশকাতার কারণে পরিবহনের যে ক্ষতি হচ্ছে তার ক্ষতিপূরণ সরকার দেয় কী না তা সম্পর্কে তিনি বলেন, তা খুবই অপর্যাপ্ত।

তিনি খুব আক্ষেপ করে বলেন, আমরা কোন দেশে বসবাস করি, এই দেশে কিছু হলেই সবার আগে যানবাহন ভাংচুর করা হয়। রাজনৈতিক কারণ, সামাজিক কিংবা স্কুল-কলেজের সমস্যা, সবার সমস্যা সমাধানের জন্য গাড়ি ভাংচুর করা বা আগুন দেয়া তাদের দাবি আদায়ের জন্য ফরজ বা নৈতিক দায়িত্ব বলে এদেশের মানুষ মনে করে।

পণ্য পরিবহনের এই বেহাল দশার কারণে হু হু করে বেড়ে চলেছে পণ্যের দাম। প্রত্যেক রুটে পণ্য পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের ভাড়া ছিল ৮ হাজার টাকা এখন তা ১২ হাজার টাকাও বেশি। ঢাকা-বগুড়ার ভাড়া ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এখন ২৬ হাজার।

কিন্তু জীবনের ঝুঁকির কারণে বেশী ভাড়া আদায় হলেওবেশির ভাগ মালিক এবং চালক রাস্তায় গাড়ি বের করেন না জীবনের ভয়ে।

ট্রাক চালক মো. কাজল জানান, যদি জীবনই না থাকে তাহলে টাকা দিয়ে কি করবো। আমাদের এখন চলতে খুবই কষ্ট হয়। ঘরের বাজার ঠিক মতো করতে পারি না। ছেলে মেয়েদের পড়ার খরচ চালাতে পারছি না এরপরও গাড়ি চালাই না জীবনের ভয়ে।

এদিকে গাড়ি বসা থাকার কারণে চালক এবং হেল্পাদেরকে তাদের দৈনিক খোরাকি বা মুজুরি দেন না মালিকরা।

এ বিষয়ে মালিক সমিতির সভাপতি বলেন, এক মাস ধরে গাড়ি বসা। আমরাই এখন চলতে পারছি না টাকা নাই, তাদেরকে কিভাবে দিবো। গাড়ি বসে থাকার কারণে সরকার কি গাড়ির ট্যাক্স মাফ করেছে না কোনো সুবিধা দিয়েছে। প্রত্যেকটি গাড়ি প্রতি এক বছরে সরকার, বিআরটিসি এবং বিভিন্ন খাতে ৩০ লাখ টাকা দেয়। তাহলে কেনো সরকার কেনো আমাদের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে না, এ পর্যন্ত শুধু আশ্বাসই শুনে আসলাম।

তোফাজ্জল হোসেন আরো বলেন, পণ্য পরিবহনের ভবিষ্যত নিয়ে আমরা খুবই চিন্তিত। কারণ এ বিভাগে এখন আর কেউ কাজ করতে চায় না। এ সেক্টরে শ্রমিকদের কোনো সম্মান নেই কেউ তাদের সম্মান করে না, তারা যে মানুষ এদেশের মানুষ তা মনেই করে না। এছাড়া যারা কাজ করছেন অবরোধকারীদের আগুন, ইট, পাটকেলের কারণে এ পেশা থেকে দিন দিন তাদের মন উঠে যাচ্ছে।

পরিবহন মালিক ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের একটাই দাবি দু’পক্ষই যেন আলোচনায় বসে একটি সুস্থ্য সমাধানে আসে। তা না হলে দিনকে দিন পরিবহন খাত ধ্বংসের মুখে পড়ে যাবে এবং বেকার হয়ে যাবে লাখো লাখো পরিবহন শ্রমিকের ভবিষ্যত।

ইআর