কাঠমান্ডু, নেপাল: নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সিটি হলের রাষ্ট্রীয় সভাকক্ষে শেষ হলো ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হওয়া দক্ষিণ এশিয়ার এই সর্বোচ্চ ফোরামের সম্মেলন শেষ হলো ৩৬ দফা কাঠমান্ডু ঘোষণার মধ্য দিয়ে।
কী আছে এই ৩৬ দফায়? সম্মেলনে বহুল কাঙ্খিত তিনটি চুক্তির মধ্যে শুধুমাত্র বিদ্যুৎ সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। যোগাযোগ বা কানিকটিভিটি সম্পর্কিত অপর আকাঙ্খিত চুক্তি দুটি আলোর মুখ দেখেনি।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সভা কাউন্সিল অব মিনিসটারসে পাস না হওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সহযোগিতা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হলো। কারণ পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সভায় কোন বিষয় পাস না হলে সাধারণত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সে বিষয়ে চুক্তি হয় না। এতে বোঝা যায় শেষ মুহুর্তে শীর্ষ নেতারা একটা কিছু অর্জনে বেশ সচেষ্ট ছিলেন।
আর সে কারণেই রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ধুলিখেল শহরে অবকাশে গিয়ে শীর্ষ নেতারা একটা সমঝোতায় আসলেন। আর তারই ফল বিদ্যুৎ সহযোগিতা চুক্তি।
একইভাবে শেষ মুহুর্তের হৃদ্যতার ছোঁয়া পাওয়া গেল ৩৬ দফার কাঠমান্ডু ঘোষণার মধ্যেও। টাইমনিউজবিডির পাঠকদের জন্য ৩৬ দফার সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরা হলো:
প্রথম দফা (আঞ্চলিক সহযোগিতা)
সরকার প্রধানরা দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নতির জন্য আরও গভীর পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যাপারে জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থ, জ্বালানী, নিরাপত্তা, অবকাঠামো, সংযোগ এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আরও বাস্তবসম্মত, সময়োপযোগী এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে একমত হয়েছেন সার্ক শীর্ষ নেতারা।
দ্বিতীয় দফা (দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন)
শীর্ষ নেতারা দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন (South Asian Economic Union-SAEU) আরও পরিকল্পিতভাবে কার্যকর করার ব্যাপারে একমত হন। একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (Free Trade Area), একটি শুল্ক ইউনিয়ন (Customs Union), একটি যৌথ বাজার (Common Market) এবং একটি যৌথ অর্থনৈতিক ও মুদ্রাবিষয়ক ইউনিয়ন (Monetary Union) গঠনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নকে কার্যকর করার ব্যাপারেও তারা একমত হন।
তৃতীয় দফা (অবকাঠামো সহায়তা)
শীর্ষ নেতারা স্বীকার করেন যে সার্কভূক্ত দেশ বিশেষ করে স্বল্পন্নত ও ভূমি-পরিবেষ্টিত (Landlocked) দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদন অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ব্যাহত হচ্ছে। এরফলে তাদের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় এসব দেশ কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তাই অবকাঠামোগত উন্নয়নে সার্কভূক্ত দেশ একে অপরকে সহায়তার ব্যাপারে শীর্ষ নেতারা একমত পোষণ করেন।
চতুর্থ দফা্ (সাফটা ও বাণিজ্য সুবিধা)
দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চু্ক্তিকে (South Asian Free Trade Agreement-SAFTA) সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে মালামাল রপ্তানি ও অন্যান্য সেবাকে কিভাবে আরও সহজলভ্য করা যায়, তার কিছু সুনির্দিষ্ট উপায় বের করার ব্যাপারে একমত হন নেতারা। কারিগরি বাধাসহ মুক্ত বাণিজ্যকে কিভাবে সব দেশের জন্য আরও উপকারী করা যায় তারও ফর্মূলা বের করা হবে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ দফা (স্বল্পন্বত দেশে বিশেষ নজর)
সাফটা (SAFTA) মিনিস্টার’স কাউন্সিল ও সাফটা কমিটির বিশেষজ্ঞদের দিয়ে একটি সমন্বিত পুনর্গঠন নীতিমালা বের করা হবে যাতে স্বল্পন্নত, ভূমিবেষ্টিত ও ক্ষুদ্র ভূখন্ডের দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতির সাথে তালমিলিয়ে আগাতে পারে। এসব দেশের ভঙ্গুর পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করে তাদের টেকসই উন্নতির জন্য বিশেষ নজর দেয়ার ব্যাপারেও একমত হন শীর্ষ নেতারা।
সপ্তম দফা (সার্ক উন্নয়ন তহবীল)
দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পে প্রয়োজনমাফিক সার্ক উন্নয়ন তহবীলের (SAARC Development Fund)অর্থব্যয় করা হবে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক খাতের পাশাপাশি সামাজিক খাতকেও গুরুত্ব দেয়া হবে। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রাকে আমলে নিয়ে তাদের জন্য উপযোগী প্রকল্পগুলোতেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করা হবে।
অষ্টম দফা (যোগাযোগ/Connectivity)
সার্কভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ও রেল যোগাযোগ সংক্রান্ত দুটি চুক্তির ব্যাপারে আগামী তিন মাসের মধ্যে সার্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে সভা করার বিষয়ে শীর্ষ নেতারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ওই বৈঠকেই যেন এই চুক্তির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যায় সে ব্যাপারে তাগিদ দেয়া হয়েছে।
সার্কভূক্ত দেশের মানুষের অবাধ যাতায়াত এবং পণ্য পরিবহনের সুবিধার্থে অত্র অঞ্চলের সড়ক, রেল ও নৌ-পথের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইতিপূর্বে শীর্ষ নেতারা যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা কার্যকর করার ব্যাপারে নেতারা একমত হন।
এমনকী আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সহজীকরণের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার ব্যাপারেও একমত হন শীর্ষ নেতারা।
শুধু দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগই নয়, মধ্য এশিয়ার সাথেও কীভাবে আরও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করা যায় সে ব্যাপারেও শীর্ষ নেতারা গুরুত্বারোপ করেন।
নবম দফা (জ্বালানি)
নেতারা বিদ্যুৎ সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং এই চুক্তিকে স্বাগত জানান। তারা অত্র অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান চাহিদার আলোকে হাইড্রোলিক, সৌর, বায়ু এবং প্রাকৃতিক গ্যাসসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সব মাধ্যমকে আরও সফলভাবে কাজে লাগাতে কার্যকর পন্থা বের করতে সার্কের এই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বডিকে জোরালো নির্দেশ দেন।
দশম দফা (দারিদ্র বিমোচন)
২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা (Post-2015 Development Agenda)-এর আলোকে দক্ষিণ এশিয়াকে দারিদ্রমুক্ত করতে সার্ক পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও সচিব পর্যায়ে ইতিপূর্বে যত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা কার্যকর করতে সার্ক নেতারা তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
এছাড়াও ৩৬ দফা কাঠমান্ডু ঘোষণায় কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ, সমুদ্র অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যুবসমাজ, নারী ও শিশু, সামাজিক নিরাপত্তা, অভিবাসন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, টেলি-যোগাযোগ, পর্যটন, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, সুশাসন, সার্ক উন্নয়ন কর্মকান্ড জোরালকরণ এবং সার্ক পর্যবেক্ষক দেশের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
৩৬ দফা ঘোষণার ২৭ দফায় আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা এবং অপরাধকে অভিন্ন কন্ঠে নিব্দাবাদ জানানো হয়েছে। তারা সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় একযোগে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
শীর্ষ নেতারা নিজ নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে সন্ত্রাস নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। মাদক পাচার, অস্ত্র চোরাচালান এবং অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং)-সহ সব ধরনের অপরাধ নির্মূলে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে আরও শক্তিশালী করারও অঙ্গিকার করেন শীর্ষ নেতারা।
সবশেষ ৩৬ দফার শেষ দফায় শীর্ষ নেতারা ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের ঘোষণা দেয়ায় পাকিস্তানকে স্বাগত জানান এবং এতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
কাঠমান্ডুর সার্ক মিডিয়া সেন্টার থেকে





